বোগেনভিলিয়া একটা ফুলের নাম। আর বুগেনভিল স্বাধীনতার ফুল ফুটতে থাকা একটা হবু রাষ্ট্রের নাম। পাপুয়া নিউ গিনির পাশে সাগরের ভেতর আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে জন্ম ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটি আদিবাসী অধ্যুষিত। অস্ট্রেলিয়া থেকেও খুব দূরে নয়। এখনো পাপুয়া নিউ গিনির প্রদেশ হিসেবেই থাকা দ্বীপটির আছে দীর্ঘ সময় ধরে উপনিবেশের ইতিহাস। স্বাধীনতার জন্য সেখানে দফায় দফায় লড়াই হয়েছে। টানা ৯ বছর ধরে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ লড়েছে দ্বীপবাসী। এর মধ্যে চলেছে শান্তি আলোচনাও। বিবিসি বলছে, দফায় দফায় শান্তি আলোচনার ফলও মিলতে যাচ্ছে আসছে শনিবার। ওই দিন দ্বীপটির ইতিহাসে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। ওই দিন দ্বীপটির দুই লাখ সাত হাজার অধিবাসী ভোটের মাধ্যমে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন কিংবা স্বাধীনতা পছন্দ করবেন। তবে আরেক দফা ভোট হবে ডিসেম্বরের শুরুতে। আর ওই মাসের শেষের দিকে আসবে বুগেনভিলের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
তবে বিশ্লেষকদের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বুগেনভিলের মানুষ এখন পুরোপুরি স্বাধীনতার পক্ষেই ভোট দেবেন। প্রত্যাশা মতো ভোট হলে তারাই পৃথিবীর ‘নতুনতম রাষ্ট্রের’ অধিবাসী হতে যাচ্ছেন। সেখানে অবস্থান করা বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন, ৭৫ শতাংশ ভোটই পড়বে স্বাধীনতার পক্ষে।
ফরাসি অভিযাত্রী ও নৌ-কর্মকর্তা লুই অ্যান্টোনি কোঁৎ বুগেনভিলের নামানুসারে দ্বীপটির নামকরণ হয়েছে অষ্টাদশ
শতকে। এর পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে ছিল জার্মান উপনিবেশ। জার্মানরা এর নাম দেয় ‘জার্মান নিউ গিনি’। ঊনবিংশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত সেখানে ছিল জার্মানরা। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ট্রেলিয়ার অধীনে যায় দ্বীপটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অল্পকিছু দিন জাপানের অধীনে থাকলেও ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ছিল অস্ট্রেলিয়ারই। ওই বছরই পাপুয়া নিউ গিনির রাজ্য হয় বুগেনভিল। ১৯৮৮ সালে পাপুয়া নিউ গিনি অবশ্য রিপাবলিক অব দ্য নর্থ সলমন নামের স্বাধীনতা দিতে চেয়েছিল দ্বীপটিকে। তবে অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউ গিনির অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও দ্বীপের আদিবাসীদের বিরোধিতায় ভেস্তে যায় তা। শুরু হয় যুদ্ধ। টানা ৯ বছর যুদ্ধ শেষে ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় থামে সেই যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে প্রাণ হারায় প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ, যা সেই সময় দেশটির জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ।
যুদ্ধ শেষে হয় বুগেনভিল শান্তি চুক্তি। ওই চুক্তির ভিত্তিতেই ২০০৫ সালে দ্বীপটি স্বায়ত্তশাসন পায়। ওই চুক্তিতেই উল্লেখ ছিল এই গণভোটের। এই চুক্তি ছাড়াও ২০২০ সালের মধ্যে দ্বীপটির স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে দুই হাজারের বেশি চুক্তি হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। সেসব প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শনিবারের গণভোট। ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি অনুসারে গণভোটের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কাজ করবেন সাবেক আইরিশ প্রধানমন্ত্রী।
অস্ট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ড, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ অনেক দেশ গণভোট নিয়ে সক্রিয় রয়েছে। অনেক দেশই এই গণভোট আয়োজনের খরচও জুগিয়েছে।
শনিবারের গণভোটে ব্যালট পেপারে থাকবে দুটি অপশন। অধিকতর স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, স্বাধীনতার পক্ষেই ৭৫ শতাংশ ভোট পড়তে যাচ্ছে। তবে কোনো কারণে সেটি না হলে অর্থাৎ দ্বীপটির মানুষ অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ভোট দিলে থাকতে হবে পাপুয়া নিউ গিনির অধীনেই। সে সেক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনের ধরন কেমন হবে তা নিয়ে হবে অধিকতর আলোচনা। আর স্বাধীনতার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়ার পরও পাপুয়া নিউ গিনি তা মানতে না চাইলে জন্ম হবে নতুন এক সংকট ও সংঘাতের।
