নতুন সড়ক পরিবহন আইনের যেসব বিষয়ে মালিক-শ্রমিকরা আপত্তি তুলেছেন, সেসব বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, নতুন আইনের কয়েকটি বিষয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা আপত্তি তুলে আমাদের কাছে ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। তবে আইনের বাকি অংশগুলো ‘যুগোপযোগী’ হিসেবে তারা সমর্থন জানিয়েছেন। আমরা প্রস্তাব আকারে এসব দফা-দাবি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে ট্রাফিক সচেতনতামূলক পক্ষ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম ও মফিজউদ্দিন আহমেদ।
সড়কে চলাচলরত গাড়ির চালক, চালকের সহযোগী, পথচারীসহ সবার দায়িত্ব, করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে সচেতন করতে ডিএমপির উদ্যোগে শুরু হয়েছে ট্রাফিক সচেতনতামূলক পক্ষ। এ কর্মসূচি আগামী ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।
সড়কে চলাচলের সময় পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও পথচারী সবাই আইন মেনে চললে অনেকটা সফলতা আসবে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কেউ আইন মানতে চাই না, আইন মেনে চললে সম্মানবোধ হয় এবং সম্মানিত হওয়া যায়। ২০১৮ সালে আমরা সড়ক পরিবহন আইন পাস করেছিলাম, যেটা বাস্তবায়নের সময় কয়েকটি যৌক্তিক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। সমস্যা সমাধানে গত ২০ নভেম্বর মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেসব গাড়ির চালক হালকা যানবাহনের লাইসেন্স নিয়ে মাঝারি ও মাঝারি লাইসেন্স নিয়ে ভারী গাড়ি চালাচ্ছেন, তাদের ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে লাইসেন্স হালনাগাদের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে দূরপাল্লার ট্রাক, লরির চালকের জন্য মহাসড়কে বিশ্রামাগার স্থাপন করা হচ্ছে। আমরা চাই সবাই নিরাপদ থাকুন।’
ডিএমপি খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ট্রাফিক সচেতনতামূলক পক্ষ পালন করতে যাচ্ছে উল্লেখ করে আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে ট্রাফিক একটি অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক কারণে ঢাকা শহরে ট্রাফিক প্রকট আকার ধারণ করছে। যানজট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রধানত ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ট্রাফিক এডুকেশন, ট্রাফিক ইনভায়রনমেন্ট ও ট্রাফিক ইনফোর্সমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পুলিশ ট্রাফিক ইনফোর্সমেন্টের একটি অংশ পালন করে থাকে। সড়কে কোনো কিছু হলে আমরা ট্রাফিক পুলিশকে দোষারোপ করে থাকি। আমরা যারা রাস্তা ব্যবহার করি, আমাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের সবার মধ্যে যেন আইন না মানার সংস্কৃতি কাজ করে।’ তিনি বলেন, ‘সড়কে গেলেই আমরা সবাইকে ভিআইপি মনে করি। কাউকে আটকালে নিজের পরিচয় দেওয়ার আগেই বলেন উমুক আমার মামা, উমুক আমার চাচা, উমুক আমার খালু। রাতের মধ্যে বদলি করে দেওয়ারও হুমকি পাওয়া যায়। আমি বলতে চাই, আইন প্রয়োগের কারণে আমার কোনো পুলিশ সদস্য বদলি হবেন না। তবে আইন প্রয়োগের সময় অবশ্যই তাকে বিনয়ী হতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করতে হবে। চালক, মালিক-শ্রমিক ও পথচারী সবাইকে আইন মেনে চলতে হবে। বর্তমানে সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলোতে ‘নো হেলমেট, নো ফুয়েল’ নীতি পালন করা হচ্ছে। আমরা চাই সড়কে একটি জীবন যেন হানি না হয়, প্রতিটি জীবনই অমূল্য। আমাদের মনে রাখতে হবে একটি জাতিকে চেনা যায় তার ট্রাফিক শৃঙ্খলা দেখে। আসুন আমরা ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকাতে লরিচালকরা বেশি দুর্ঘটনা ঘটাতেন। তাদের বিশ্রামের পাশপাশি ড্যাশবোর্ডে সন্তানের ছবি বাধ্যতামূলকভাবে রাখা হয়, যার পজিটিভ ইম্প্যাক্ট পড়ে। এতে প্রাণহানি কমে।’
সভাপতির বক্তব্যে ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইনটি করা হয়েছে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য। জরিমানা আদায় করা সরকার বা পুলিশের উদ্দেশ্য নয়। সড়কে যদি শৃঙ্খলা থাকে তাহলে মামলা করার কোনো প্রয়োজন নেই। রাস্তায় যে গাড়িটি অচল হয়েছে, সেটি রেকারিং হবে অথবা যে গাড়িটি রাস্তায় ড্রাইভার ছাড়া দীর্ঘ সময় অবস্থান করে যানজটের কারণ হচ্ছে সেই গাড়িটি রেকারিং করা হবে। এর বাইরে কোনো রেকারিং করা হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এ আইনের কার্যকর আমাদের জন্য শেষ সুযোগ। কারণ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থতার জন্য যদি আমাদের সন্তান, কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা আবার রাস্তায় নামে তাহলে কারও পিঠে চামড়া থাকবে না। তাই আসুন সবাই আইন মেনে চলি। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনি।’
অনুষ্ঠানে খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গাড়ির চালকদের যার যার যে বৈধ লাইসেন্স আছে, সেটা দিয়ে গাড়ি চালাতে পারবেন। এ সময়ের মধ্যে নিজেদের ড্রাইভিং লাইসেন্স আপডেট করে নিতে হবে। এটাই শেষ সুযোগ, এরপর কোনো আপত্তি চলবে না।’ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সারা দেশে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক রাখার অনুরোধ জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী, ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
