কিছুদিন ধরে পেঁয়াজের পাশাপাশি চালের মূল্যও গণমাধ্যমের রসদ হিসেবে ভালো জায়গা করে নিয়েছে। কেউ কেউ উচ্চকিত কণ্ঠে ঘোষণা করছেন, প্রথমে পেঁয়াজ, তারপর চালের বাজারে আগুন লেগে গেছে। আবার অনেকে পেঁয়াজের পর চালের পালা বলে মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা খুঁজে পাচ্ছেন। তাদের সমর্থনে এরপর এলো লবণ। তবে চাল ও লবণ আর পেঁয়াজের মধ্যে বিস্তর ভিন্নতা রয়েছে; চাল ও লবণ অত্যাবশ্যকীয় পণ্য, কিন্তু পেঁয়াজ তা নয়। চাল ও লবণের দুর্মূল্য মানুষকে নানাভাবে ভোগায়, কিন্তু এ মুহূর্তে এই দুটির কোনো ঘাটতি নেই। অন্যদিকে পেঁয়াজের অগ্নিমূল্য তাকে সাময়িক অস্বস্তির মধ্যে ফেলে বটে, তবে মাঝেমধ্যে তা আবার হাসিঠাট্টারও উপাদান জোগায়। কিন্তু চালের আসল বিষয়টা কী, তা জানার চেষ্টা করলাম।
গত ২১ নভেম্বরে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রতি কেজি বোরো চিকন চাল ৪৬ থেকে ৫১ টাকা, মাঝারি চাল ৩৪ থেকে ৩৮ টাকা এবং মোটা চাল ৩১ থেকে ৩৩ টাকা দরে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেল। একসময় খাদ্য বিভাগে চাকরি করতাম। সেই সুবাদে মাঠপর্যায়ের কিছু পরিচিত কর্মকর্তা ও চালকল মালিক এবং ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বললাম। তারা যেটা জানালেন তাতে দেখা যায়, মাসখানেক হলো প্রতি কেজি মোটা চাল ২ টাকা এবং মাঝারি ও চিকন চাল ৩-৪ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে পাইকারি বাজারে মোটা চাল ২৭ থেকে ২৯ টাকা, মাঝারি চাল ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা এবং চিকন চাল ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে।
ধান কাটার প্রারম্ভে এভাবে দর বাড়ার কারণ সম্পর্কে তারা জানান, সরকার এ মৌসুমে ছয় লাখ টন ধান ও চার লাখ টন চাল সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে, যার কেজিপ্রতি দর নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ২৬ ও ৩৬ টাকা। এই হিসাবে ৪০ কেজির এক মণ ধানের দাম পড়ে ১০৪০ টাকা। সরকার কেনে মোটা ধান। মোটা ধানের দামই যদি প্রতি মনে হাজারের ওপর পাওয়া যায়, তবে মাঝারি ও চিকন ধানের দাম যে আরও বেশি হবে, তা বলাই বাহুল্য। এ জন্য ধানের দাম কিছুটা বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। সাইক্লোন বুলবুলের আক্রমণে উপকূলীয় অঞ্চলে ধানের ক্ষয়ক্ষতি এবং চাল রপ্তানির সংবাদও এ ক্ষেত্রে কিছু প্রভাবকের কাজ করেছে। তা ছাড়া আমন মৌসুম শুষ্ক হওয়ায় এ চালের বাজারজাতযোগ্য পরিমাণ কম এবং সব পর্যায়ে সংরক্ষণ প্রবণতাও বেশি।
এদিকে হঠাৎ চালের মূল্য বেড়ে যাওয়ার খবরে খাদ্য মন্ত্রণালয় তৎপরতা শুরু করেছে। খাদ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যে চালকল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে মূল্য যাতে আর না বাড়ে তার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি ভাণ্ডারে রেকর্ড পরিমাণ মজুদের কথা ওই সভায় তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। চালের যে পেঁয়াজের মতো উড়োজাহাজে ওঠার কোনো দরকার নেই, তিনি তারও জানান দিয়ে দিয়েছেন। চাল রপ্তানির সিদ্ধান্তও পাল্টাতে বলেছেন। আমি মনে করি মূল্যের আকস্মিক হ্রাস-বৃদ্ধির কারণ যেমন খুঁজে বের করতে হবে, তেমনি নিয়মিত নির্দোষ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবীক্ষণ জোরদার করতে হবে। কারণ, আগে চালের বাজার ছিল পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক, সেখানে ছিল অসংখ্য ক্ষুদ্র মিলার ও অসংখ্য ছোট ক্রেতা। কিন্তু এখন ছোট ছোট মিলারের স্থান গুটিকয়েক ধনকুবের মিলমালিক দখল করতে চলেছেন। তারা চালের এই প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিজেদের স্বার্থে বিকৃত করতে সক্ষম বলে অনেকের বিশ্বাস। এ জন্য তাদের ওপর নজরদারির ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে সরকার চালের দাম কোথায় রাখতে চায়, তা কারোর কাছেই স্পষ্ট নয়। কারণ, সরকার নিজেই দুরকম দর নির্ধারণ করে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযানের দুটি লক্ষ্য থাকে; প্রথমত. সরকারি ভাণ্ডারে নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তোলা, দ্বিতীয়ত. উৎপাদকদের ফসলের প্রণোদনা-মূল্য নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশকে চাল উৎপাদনে স্বয়ম্ভর করা। ১৯ দশমিক ৫ লাখ টন সরকারি ধারণক্ষমতার মধ্যে এখন ১৪ লাখ ৫০ হাজার টন চাল-গম মজুদ রয়েছে। ১০ লাখ টন নিরাপত্তা মজুদের ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা আছে। অর্থাৎ এ মৌসুমে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নতুন করে ধান-চাল সংগ্রহ করার গুরুত্ব কম। ফলে এবার সংগ্রহ অভিযানের প্রধান লক্ষ্য দ্বিতীয়টি; কৃষককে তার ফসলের প্রণোদনামূলক মূল্য দেওয়া। বিগত বোরো মৌসুমে এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। এবার তাই বেশি ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। স্বচ্ছতার তাগিদে এই লক্ষ্যমাত্রার একটা বড় অংশ এবার ডিজিটাল অ্যাপস ব্যবহার করে সংগ্রহ করা হবে। এটা অবশ্যই একটি উৎসাহব্যঞ্জক খবর। ডিজিটালাইজেশন সাধারণ মানুষকে দুরবস্থা থেকে মুক্ত করবে, তাকে স্মার্ট করে তুলবে। এটা একান্তভাবে কাম্য।
তবে ধানের যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে চালের দাম দাঁড়ায় প্রতি কেজি ৪০ দশমিক ৫০ টাকা। কারণ, ৬০ কেজি ধানের দাম ১৫৬০ টাকার সঙ্গে মিলিং কমিশন ও পরিবহন ব্যয় ৬০ টাকা যোগ করা হলে মোট খরচ দাঁড়ায় ১৬২০ টাকা। এ ধানে সর্বোচ্চ ৪০ কেজি চাল পাওয়া যায়। এতে দেখা যাচ্ছে, সরকারই পরোক্ষভাবে চালের দাম ৪০ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এটা ধানের উৎপাদন খরচের যৎসামান্য ওপরে; কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এবার ধান ও চালের উৎপাদন খরচ প্রাক্কলন করা হয় যথাক্রমে ২৬ ও ৩৯ টাকা। ধান-চালের মূল্য এই স্তরে থাকলে উৎপাদকের জন্য তা হতে পারে কিছুটা স্বস্তিদায়ক। এ মুহূর্তে মোটা চালের বাজারমূল্য অনেক নিচে। তাই সংগ্রহ অভিযান জোরদার করে এ চালের দাম বাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এ অবস্থায় এখনই দাম কমানোর এত তৎপরতা কেন, তা আদৌ বোধগম্য নয়।
আবার মিলারদের কাছ থেকে যে চার লাখ টন চাল সংগ্রহ করা হবে, তার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে অনেক নিচে; কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা। তিন বছর ধরে এই একই মূল্যে চাল কেনা হচ্ছে। ধানের অনুপাতে চালের মূল্য কমিয়ে নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য নাকি মিলারদের মুনাফা কমিয়ে ফেলা। তাতে মনে হচ্ছে মিলাররা বুঝি বেশি দামে ধান কিনে কম দামে সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করবেন এবং তাতে চাষি ও সরকার উভয়ই লাভবান হবেন। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। মিলমালিকরা তো কেউ দাতব্য প্রতিষ্ঠান খুলে বসেননি। তারা লাভ না হলে সে কাজ করবেন কেন?
চলতি আমন মৌসুমে চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে ১ কোটি ৫৩ লাখ টন, যা ধানের আকারে ২ কোটি ৩১ লাখ টন। উৎপাদনের শতকরা ৬০ ভাগ ধান বাজারে এলেও তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৮ লাখ টন। এই পরিমাণের কাছে ধান-চাল মিলে সরকারি যে সংগ্রহ-লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা সিন্ধুতে বিন্ধুসম। এ মুহূর্তে কোনো কোনো স্থানে ১০ ভাগ, আবার কোনো কোনো জায়গায় ২৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। দেশে আবাদ ভালো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও কোনো শঙ্কা দেখা যাচ্ছে না। বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতিও তেমন বড় কিছু নয়। ফলে পুরো ধান কাটা হলে ধান-চালের দাম কমে আসতে বাধ্য। তখন মূল্যের নিয়ামক হবেন মিলাররা। তারা তাদের সুবিধামতো মূল্যে ধান কিনে তার কিছু চাল সরকারি গুদামে দেবেন, আর বাকিটা লাভের আশায় সংরক্ষণ করে রাখবেন। সে ক্ষেত্রে এক টন করে যদি ছয় লাখ কৃষক সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করেন, তবে তারাই শুধু লাভবান হবেন; বাকি কৃষকরা হবেন মিলারদের লাভ-অভিঘাতের শিকার।
আসলে ধান-চালের দাম আমাদের মতো দেশে শাঁখের করাতের মতো। দাম কমে গেলে চাষি নিরুৎসাহিত হন, উৎপাদন ব্যাহত হয়, স্বয়ম্ভরতা অর্জন সুদূর পরাহত হয়। আবার দাম বেড়ে গেলে উৎপাদক উৎসাহিত হয়, কিন্তু ভোক্তা বেজার হন। দেশে উৎপাদকের চেয়ে ভোক্তার সংখ্যা বেশি। ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থই প্রাধান্য পায়; দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সেখানে গৌণ। কিন্তু উভয় স্বার্থের মধ্যে একটি সন্ধি না করতে পারলে দীর্ঘ মেয়াদে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই ও সুসংহত করতে পারব না। আমাদের অবস্থা অনেকটা সেই বিদেশি প্রবচনের মতো– ‘আমরা সবাই বেহেশতে যেতে চাই, কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগে যে মৃত্যুবরণ করতে হবে, সেটা কেউ চাই না। ’
দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চাল উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। চাল উৎপাদন এখন আগের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল। মাটির ভঙ্গুর স্বাস্থ্য বিবেচনায় ভবিষ্যতে বর্ধিত ফসল উৎপাদনে খরচ আরও বাড়াতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে সাশ্রয়ী উৎপাদন কৌশল প্রবর্তন না করা পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকবে। এজন্য এখন থেকেই উৎপাদক ও ভোক্তা– এ দুজনের মধ্যে উৎপাদককেই অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া শুরু করতে হবে। কারণ, পর্যাপ্ত উৎপাদন হলে তা অধিক দামে কিনে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব, কিন্তু উৎপাদন কমে গেলে আমদানি করে ঘাটতি মেটাতে যে কী জটিলতা তৈরি হয়, চলমান পেঁয়াজ সংকট তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। আশা করি নীতিনির্ধারক মহল বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নেবেন।
লেখক
খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক
