আর সব সমস্যার মতোই পেঁয়াজ-সংকটও ভোক্তার পকেট থেকে বণিকের পকেটে বিপুল পরিমাণ বাড়তি টাকার জোগান দেওয়ার কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করেই আলোচ্যসূচিতে নিচের দিকে ঠাঁই নিয়েছে। সরকারের বহু তোড়জোড়, হুমকি, ভ্রাম্যমাণ আদালত– কোনো কিছুই পেঁয়াজের আসল চক্রটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বরং পেঁয়াজ-সংকটের যে নিদানটির জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা, সেটি মৌসুমের নতুন পেঁয়াজ! দেখেশুনে বুড়োবুড়ির পুরনো গল্পটাই মনে পড়ল।
বুড়োবুড়ির টুটাফাটা ঘরে বর্ষায় রোজ পানি আসে। ‘ও বুড়োবুড়ি, চাল ঠিক করো না কেন?’ প্রতিবেশীরা বলে। বুড়োবুড়ির জবাব, ‘বর্ষাতে চাল ঠিক করব কী করে?’ বর্ষা শেষ। ‘বুড়োবুড়ি এবার তো চালটা ধরতে পারো?’ ‘পানি তো আর আসছে না বাপু, এখন তো বর্ষা নেই, চাল ঠিক করার দরকারটা কী!’ –বুড়োবুড়ির হাসিখুশি উত্তর।
তো এই বছরও আমরা দেখলাম ডেঙ্গু প্রতিরোধ কিংবা পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি অথবা ঢাকার রাস্তায় জলাবদ্ধতা– অধিকাংশ মহাসংকটের সরকার যে প্রাকৃতিক সমাধানটি আবিষ্কার করেছে, সেটি ওই গল্পের বুড়োবুড়ির সমাধানের মতোই। ‘ডেঙ্গু মৌসুম শেষ হলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসবে’, ‘বর্ষা শেষ হলেই বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা থাকবে না’; ‘নতুন পেঁয়াজ এলেই পেঁয়াজের দাম নিয়ে আর এই চক্র সক্রিয় থাকবে না’। এমনিতে বিরোধীদের দমন-পীড়নে যথেষ্ট কার্যকর এ সরকার জনগণের কোনো বাস্তব সমস্যারই সমাধান করতে পারেনি, বরং দেখা যাচ্ছে সেগুলোকে প্রাকৃতিক নিদানের ওপরই ছেড়ে দিয়েছে। বায়ুদূষণ নিয়েও নিশ্চিত করেই এই একই সমাধান মিলবে : শুষ্ক মৌসুম শেষেই বাতাস আবার পরিষ্কার হয়ে আসবে।
২. খুব অল্প কয়েকটা খাদ্যবস্তুতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক মানদণ্ডে ভদ্রস্থ জায়গাতে আছে, সেটা পেঁয়াজ। এর প্রধান কারণটা আবার একদিকে সাফল্যের, অন্যদিকে বাঙালি খাদ্যাভ্যাসের একটা সকরুণ দিকেরও প্রতিনিধিত্ব করে। সাফল্য এই যে, পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশের কৃষকরা দৃষ্টান্তস্থানীয়। প্রতি বছর এর উৎপাদন বাড়ছে, একরপ্রতি ফলনে অনেকদূর পিছিয়ে থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণ সুবিধার দিক দিয়ে বাংলাদেশের স্থানীয় জাতগুলো অনেক বেশি চাহিদাসম্পন্ন, স্বাদের কারণেও এর আকর্ষণ কম নয়। দ্রুত পচে যায় বলেই দুনিয়া জুড়ে অধিকাংশ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চলেই ভোগ করা হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের খাদ্যবিলাসে সবজি, সালাদ ইত্যাদি হিসেবে পেঁয়াজের নিত্যব্যবহার বেশ কম। এর প্রধান প্রয়োগ ঝোল তৈরিতে, মসলা হিসেবে। এটা আসলে আমাদের খাদ্যবাস্তবতার একটা সংকটের দিকেই ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের মানুষের ভাতের ওপর নির্ভরশীলতার পরিমাণটা বেশ খানিকটা কমে এলেও এখনো এটা বৈশ্বিকভাবেই অনেক বেশি, এমনকি মধ্যবিত্তের মধ্যেও এটা সত্যি। গড়ে আমরা যে পরিমাণ মাছ-মাংস-ডিম থেকে আমিষ গ্রহণ করি, তা বেশ কম, বৈশ্বিক স্তরে প্রায় তলানিতে। সবজির পরিমাণ একটু বেশি হলেও খুব আহামরি বেশি কিছু নয়। কিন্তু এই কম তরকারি দিয়ে বেশি বেশি ভাত খেয়ে পেট ভরানোর কাজটি করার জন্যই আরও কিছু মসলার পাশাপাশি পেঁয়াজের এত কদর। বহু ছাত্রাবাসে দেখতাম, একটি মাত্র ডিম বা নামমাত্র মাছ-মাংস দিয়ে কয়েক থালা ভাত খাবার কাজটি সম্পন্ন করতে পেঁয়াজের ঝোলটি বিপুল ভূমিকা রাখত। মসলাপ্রধান ঝোলে তাই শুধু ‘ঐতিহ্যিক রন্ধন-সংস্কৃতি’ নেই, আমিষের দাম আর সামর্থ্যের বাস্তবতাটিও আছে।
ফলে, মসলা যারা কম খেতে উপদেশ দিচ্ছেন, তারা বাঙালি খাবারের এই বিশেষ অর্থনৈতিক বাস্তবতাটি ভুলে যান। হোটেলগুলোতেও পেঁয়াজের বিপুল চাহিদা এই ঝোলেরই কল্যাণে। এভাবে আমাদের রন্ধনের যে ঐতিহ্যটা তৈরি হয়েছে, সেটাও অনেক বেশি পেঁয়াজ দাবি করে, মুখে তোলার উপযুক্ত হতে। বিপদে পড়লে বা বাধ্য হলে সেটাতে বদল নিশ্চয়ই আনা যাবে, কিন্তু সেটা তো একেবারে মানিয়ে নেওয়া স্বভাবের পরিচয় হলো, নাগরিকের তো কর্তব্য পরিস্থিতিটা কার ব্যর্থতায় তৈরি হলো, সেই প্রশ্ন করা। সবজি এবং আমিষের পরিমাণ বহু গুণ বৃদ্ধি করেও যদি পেঁয়াজের ব্যবহার স্থির কিংবা বৃদ্ধি করা যায়, সেটাকেই বলব ইতিবাচক বদল। নিতান্ত টিকে থাকার জন্য স্বভাবের যে বদল, তা আরও হীনবল হওয়ার আরও নতজানু এবং ক্রীতদাস হওয়ার অপর নাম মাত্র।
৩. এখনকার ছেলেমেয়েরা কী মোল্লা দোপেঁয়াজাকে চেনে? একটা কাল্পনিক চরিত্র, যার নামের মধ্যেই আছে পেঁয়াজের ঝাঁজ!
মোল্লা দোপেঁয়াজার নামটার একটা গভীর তাৎপর্য উদ্ধার করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী। সম্রাট আকবরের সভার বীরবল নামে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বটির একটা মুসলিম কাল্পনিক প্রতিচরিত্র মোল্লা দোপেঁয়াজা, তার মুসলমানিত্বের প্রতীক ওই দ্বিগুণ-পেঁয়াজসংবলিত নাম– দোপেঁয়াজা।
উত্তর প্রদেশ, বিহার হয়ে বাংলা পর্যন্ত মোল্লাজির গল্পগুলো মুসলমান সমাজে জনপ্রিয় তার ওই বিশিষ্ট পরিচয়ের জন্য। অন্যদিকে, পেঁয়াজের সঙ্গে মুসলমানিত্বের সম্পর্কের বিষয়টিও আবার ভারতবর্ষ জুড়ে স্থান-কাল-সময়ের ঊর্ধ্বে কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। যেমন– পাঞ্জাবের হিন্দু সংস্কৃতিতে পেঁয়াজ যে আগেও জনপ্রিয় ছিল, তার কথা বঙ্কিমচন্দ্রের বড় ভাই সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন পালামৌ নামের বাংলাসাহিত্যের প্রথম ভ্রমণ কাহিনীটিতে। সেখানে পাঞ্জাবি এক বৃদ্ধ মহারাজা তার রন্ধনশালায় ‘পলাণ্ডু’র উপস্থিতি বিষয়ে প্রশ্ন শুনে হতবাক, সেখানে জানা গেল বাঙালি হিন্দু নিষিদ্ধ পলাণ্ডু হিসেবে পেঁয়াজকে বর্জন করেন, পাঞ্জাবি সংস্কৃতিতে পলাণ্ডু আবার অন্য একটি বিষাক্ত বুনো উদ্ভিদ। এই স্মৃতিচারণা করেও খানিকটা রসিকতার ছলে সঞ্জীবচন্দ্র পালামৌতে প্রবাসী বাঙালি ভদ্রলোকের বাড়ির রসনাপূর্তি করা পেঁয়াজপ্রধান খাবারের বিবরণেও পেঁয়াজের বদলে পলাণ্ডু শব্দটা ব্যবহার করছেন : পাকসমন্ধে পলাণ্ডুর উল্লেখ করিয়াছি, কিন্তু পেঁয়াজ উল্লেখ করাই আমার ইচ্ছা ছিল।
জগতে কোনো কিছুই শেষপর্যন্ত অনড়-অচল থাকে না, রন্ধনের সংস্কৃতিতেও না। পর্তুগিজরা আসার আগে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতিতে ছানার মিষ্টি অশুদ্ধ ছিল বলে জেনেছি বিনয় ঘোষের গ্রন্থে, বার্নিয়ের ভ্রমণকাহিনীর পাদটীকায়। অন্যদিকে মুসলমানের মুরগিপ্রীতি নিয়ে জনপ্রিয় ছড়া মিলবে মাত্র এক শ বছর আগেও, আর দেশভাগ বিষয়ে বিখ্যাত উপন্যাস সংশপ্তকেও মিলবে হিন্দু মেসে আশ্রয় নেওয়া মুসলিম মালুর ধরা খাবার কাহিনী, রান্নায় পেঁয়াজ ব্যবহার করেই বিপদটা ডেকে এনেছিল সে। বাঙালি রন্ধনশিল্পে হিন্দু-মুসলিম স্বাতন্ত্র্য এখনো স্পষ্ট করে চেনা গেলেও পেঁয়াজসহ বহু বিষয়েই সংশেস্নষও বহুদূর ঘটেছে, অন্যদিকে মুসলমানের রান্নাতেও হিন্দুয়ানি বলে ভাবা পাঁচফোড়নের গন্ধ এখন ভালোই মেলে।
৪. খাদ্য হিসেবেও পেঁয়াজ নিতান্তই উপকারী– কাঁচা কিংবা রান্না উভয়ই। যদিও পেঁয়াজ নিয়ে নেতিবাচক বেশ কিছু উপমার একটা হলো পেঁয়াজের খোসার মতো, ছাড়িয়ে শেষমেশ কিছু মেলে না। উপমাটি যথাযথ না পুরোপুরি। ঘটনার গ্রন্থি ছড়িয়ে যাওয়াও তো একটা জরুরি কাজ হতে পারে, দার্শনিকরা যেমন ঘটনার খোসা ছাড়িয়ে সত্যরূপী একটা চ‚ড়ান্ত পরম-অঁাটি খোঁজেন না, ছাড়িয়ে যাওয়াটাকেই একটা কাজ হিসেবে নেন। পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো তাই ইতিবাচক অর্থে সত্য অনুসন্ধান, পেয়ে যাওয়া সত্য অঁাকড়ে বসে থাকার রক্ষণশীলতা নয়। যে ঝাঁজ-স্বাদ-গন্ধটা সেই প্রক্রিয়ায় যতখানি মিলবে, ততটুকুই সন্ধানী জীবনের সাফল্য। পদার্থবিদদের কেউ কেউ মহাবিশ্বের তুলনাও করেন অনন্ত এক পেঁয়াজের সঙ্গে, সত্যের প্রতিটা উন্মোচনই যেখানে নতুন সত্যই নিয়ে আসে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার উদাহরণও যেন পেঁয়াজের সঙ্গেই মেলে, নেতিবাচকভাবে। গণতন্ত্রের একরৈখিক কোনো বিকাশ বা বিস্তার নয়, বরং পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতোই একটি থেকে অন্য একটি অজানা স্তরে গিয়ে পৌঁছাচ্ছি আমরা। এত স্বল্প সময়ে এতগুলো রাজনৈতিক ধরন আমাদের দেখতে হয়েছে, যার তুলনা হয়তো জগতে বিরল। ওয়েস্ট মিনিস্টার গণতন্ত্র, রাষ্ট্রপতি ধরনের শাসন, একদলীয় শাসন বা বাকশাল, সামরিক শাসন, অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বিনাভোটের গণতান্ত্রিক সরকার কিংবা নিশিভোটের সরকার রাজনৈতিকভাবেও আমাদের জাতিকে নতুন নতুন সত্য এবং বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু বলাই বাহুল্য, একটা জাতির জন্য পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো নিত্যনতুন ব্যবস্থার ঝাঁজ ছড়ানো নয়, প্রয়োজন ছিল গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহির অধীনে মানুষের জীবনের একটা বিকাশের নিশ্চয়তা।
শেষে বুড়োবুড়ির ঘরের চাল ঠিক করার গল্পটার পৌনঃপুনিকতা আবারও মনে করিয়ে দিই, ২৩ লাখ টন নজিরবিহীন ফলন এবং ২৮০ টাকা পর্যন্ত নজিরবিহীন দর ওঠা ২০১৯ সালটির শুরুতে কৃষক মাঠে পেঁয়াজ বিক্রি করেছিলেন ২০ টাকা দরে। কান্নারত কৃষকের ছবি এবং সংবাদ সব গণমাধ্যমেই এসেছিল। আবারও কৃষকের মাঠ থেকে পেঁয়াজ তোলার মৌসুম চলে এসেছে– কী হয়, কী হয়! কেননা, পেঁয়াজের খোসা নিয়ে প্রবাদের মতোই রসুনের গোড়া নিয়েও একটি প্রবাদ আছে। কথায় বলে, রসুনের সব কোয়ারই গোড়া এক। তেমনি বলতে হয় এদেশেও সব সংকটেরই উৎস এক।
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
