মৃতপ্রায় তিস্তা

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ১১:১৬ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অনাবৃষ্টি, অকালবন্যা, অসময়ে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর পানির নাব্যও এখন অনেক কম। ফলে উত্তরাঞ্চলের প্রমত্তা নদী পদ্মা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ নদ-নদীগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বিশেষ করে উজান থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় খরস্রোতা তিস্তা এখন নামেই নদী। তিস্তায় এখন পানি না থাকায় চোখে পড়ে শুধু ধু-ধু বালুচর।

চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর মাসে টানা বর্ষণ আর উজানের ঢলে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল তিস্তা নদী। এ সময় লালমনিরহাটে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারাজ’ রক্ষায় খুলে দেওয়া হয় ৫২টি গেট। কারণ উজানের পানির চাপ এতই বেশি ছিল, সব গেট খুলে দেওয়া না হলে ব্যারাজকে রক্ষা করাই কঠিন ছিল। এতে ভাটিতে থাকা লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এমনকি হঠাৎ পানির স্রোতে নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয় প্রায় ৩০ হাজার পরিবার। একসময়ের প্রমত্তা তিস্তা নদীটি এখন পানির অভাবে মরা খালে পরিণত হয়েছে। এমন একসময় ছিল যখন নদী পারাপারে নৌকাই ছিল একমাত্র অবলম্বন। অনেকেই বলতেন, এক নদী মানে হাজার ক্রোশ, অর্থাৎ নৌকা ছাড়া অন্য কোনো গত্যন্তর ছিল না। সে নদীতে এখন হাঁটুপানি। মানুষ এখন নৌকা ছাড়াই নির্বিঘেœই হেঁটে নদী পারাপার করছে।

মূলত ভারত তিস্তার উজানে জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় ব্যারাজ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ অংশে ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী পানির অভাবে এখন মৃতপ্রায়। তিস্তার পানির নাব্য এতটাই হ্রাস পেয়েছে, আসন্ন বোরো মৌসুমে ব্যারাজের সেচকার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। উল্লেখ্য, ভারত এখন তিস্তা নদীর উজানে ব্যারাজ তৈরি করে সংযোগ থালের মাধ্যমে তিস্তায় প্রবাহিত পানি ভারতের মহানন্দা নদীতে এবং জলপাইগুড়ি জেলার দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুরের মালদহ ও কুচবিহার জেলায় সেচ সুবিধা নিচ্ছে।

যেখানে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ আটক কিংবা পরিবর্তন করার বৈধতা আন্তর্জাতিক আইনে নেই, সেখানে ভারত সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে তিস্তার পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ আটকে দিয়ে বাংলাদেশের খাদ্য ভা-ারখ্যাতি উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা অর্থনৈতিক এবং বাংলাদেশের মানুষের ওপর এক ধরনের অবিচার। এ নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে বাংলাদেশের তরফে পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালালেও আশ্বাস ছাড়া কার্যকর কোনো সাফল্য মেলেনি। একসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসে বলেছিলেন, নদীর গতি, পানি ও বাতাসের নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা নেই। প্রকারান্তরে তিনি স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের জনগণের তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার যে অধিকার তা পাওয়া উচিত। আমরাও আশা করেছিলাম, সে দফায় হয়তো তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার একটা সমাধান হবে। কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। নীতিবাক্য শোনা ছাড়া তেমন কিছুই অর্জন হয়নি।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গিয়ে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য ভারত সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করেও সফল হননি। উল্টো সে সফরে ভারত অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা করলেও তিস্তা নিয়ে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেননি। উল্টো ভারতের অনুরোধে ফেনি নদীর পানি প্রত্যাহারের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী মানবিক কারণে রাজি হয়েছেন মর্মেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

চলছে আমনের কাটা-মাড়াই। ভরা মৌসুম আমন ধান কাটা-মাড়াইয়ের। আগামী সেচভিত্তিক বোরো চাষাবাদ অত্যাসন্ন। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠী। যাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেচভিত্তিক চাষাবাদের সূতিকাগার এখন উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলা। এই অঞ্চলের উৎপাদিত ধানে দেশের মোট চাহিদার খাদ্যের একটি বড় অংশ পূরণ হয়। আর সেচভিত্তিক এই চাষাবাদে তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের বুক চিরে প্রবাহিত নদীগুলোর পানির অবদান অনেক বেশি। কিন্তু সেচের জন্য যে পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়, তা তিস্তা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্রে সে অর্থে থাকে না। মাত্র এক মাস আগেও তিস্তায় ছিল অথই পানি। এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুকিয়ে খাঁ-খাঁ করছে তিস্তা। দেখলে মনে হয়, নদী নয় যেন মরা খাল। বিশাল বিশাল বালুর স্তূপে মূল গতিপথ হারাতে বসেছে তিস্তা।

সূত্র মতে, বর্তমানে তিস্তা ব্যারাজের ৫২টি গেটের মধ্যে ৪৫টি বন্ধ রেখে উজানে পানি আটকে রাখার চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ। এ কারণে আসন্ন বোরো মৌসুমে সেচকার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ধরনের সংকট শুধু এ বছরই নয়, প্রতি বছরেই ঘটে থাকে। ফলে সেচভিত্তিক চাষাবাদের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানিই হয়ে যায় একমাত্র ভরসা। ফলে প্রতিনিয়তই ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির স্তর হুহু করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করায় মানুষের নানা ধরনের চর্ম রোগও দেখা দিচ্ছে। ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া প্রসঙ্গে বরেন্দ্র অঞ্চল গবেষণা সংস্থা ডামকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কর্মকর্তা জাহাঙ্গির আলম খান বলেছিলেন, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁর ১০০টি পয়েন্টে বোরিং করে দেখা গেছে, গত তিন-চার বছরে এসব অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ৮ ফুট থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এ তথ্য যে উদ্বেগের, যা সচেতন মানুষ মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন। যেখানে মাত্র তিন-চার বছরের মধ্যে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ১২ ফুট পর্যন্ত নেমে গেছে, সেখানে আগামী দিনগুলোতে ভূ-গর্ভস্থ পানির যে তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে; যা বলার অপেক্ষা রাখে না।

উল্লেখ্য, প্রতিবেশী ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আশ্রয়, খাদ্য দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে। সেই দেশের কাছ থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের মতো অনৈতিক আচরণ আমরা কোনোভাবেই আশা করি না। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, সেই ভারত যুগের পর যুগ ধরে তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করছে। এমনকি ১৯৯৬ সালে পদ্মার পানি চুক্তি করেও শর্ত অনুযায়ী পানি দিচ্ছে না। ত্রিশ বছর মেয়াদের চুক্তির এখন প্রায় সাত বছর বাকি আছে। ইতিমধ্যেই ভারত সরকার পদ্মার উজানে গঙ্গার পানি আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে অন্যান্য রাজ্যে সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে পানির অভাবে আমাদের কৃষি, মৎস্য চাষ, জীববৈচিত্র্য, নৌ-যোগাযোগÑ সবই এখন হুমকির মুখে পড়েছে। নৌ-যোগাযোগ, মৎস্য চাষ, কৃষি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন যেখানে পানি, সেখানে পানির অভাবে এই অঞ্চলের মানুষের রুটি-রুজির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক।

পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের আদায় করতেই হবে। তা না হলে তিস্তার অববাহিকায় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কৃষি চাষাবাদ, মৎস্য চাষ কিংবা বেঁচে থাকার জন্য সুপেয় পানির অভাবে যে সংকটাপন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তা নিকট ভবিষ্যতে সামাল দেওয়া অনেকাংশেই কঠিন হবে।

লেখক : কৃষি ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত