জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভা গতকাল রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দুর্বলতার কারণে সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন কিছু কিছু ড়্গেত্রে শিথিল করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি সাংসদ শাজাহান খান বলেন, জামিন অযোগ্য ধারাটি বাতিল হলে নতুন সড়ক আইনে বিচার মেনে নিতে শ্রমিকরা পুরোপুরি প্রস্তুত। গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রথম সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়ন করতে নতুন করে চার সচিবের নেতৃত্বে চারটি সাব-কমিটি করা হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে তারা সুপারিশ ও অ্যাকশন প্ল্যানসহ প্রতিবেদন জমা দেবে।
সভায় জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীসহ পরিবহন নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এতে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, তথ্য সচিব আবদুল মালেক এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদকে প্রধান করে চারটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের চার মন্ত্রণালয়ের চারজন সচিবের নেতৃত্বে গঠিত সাব-কমিটিগুলো সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণ চিহ্নিত করবে, পাশাপাশি শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে। গত বছর সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি ১১১ দফা সুপারিশ করে। সেগুলো বাস্তবায়নেও নতুন সাব-কমিটি কাজ করবে।
আসাদুজ্জামান খান বলেন, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব সড়ক সংক্রান্ত বিষয়ে বেশি নজর দেবেন। পাশাপাশি বিআরটিএকে শক্তিশালী করতে এবং অসংগতি দূর করতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকেও সঙ্গে নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব সড়ক-মহাসড়কের ট্রাাফিক ব্যবস্থাপনা দেখবেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে জেলা ও উপজেলায় সড়কের অসংগতি দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করবেন তথ্য সচিব।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সড়ক আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। সর্বোচ্চ ও সর্বনিমœ কত বছরের সাজা হবে এবং সর্বোচ্চ ও সর্বনিমœ কত টাকা জরিমানা হবে, সেটি লেখা রয়েছে। অপপ্রচারে চালকদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল। বিআরটিএ এখনো অনেক লাইসেন্স নবায়ন করতে পারেনি। আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে লাইসেন্স নবায়নের কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। যারা নির্ধারিত মেয়াদে গাড়ির ফিটনেস ট্যাক্স দেননি, তাদের জরিমানা মাফ করার আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সুপারিশসহ আবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিলে ট্যাক্স মাফ করে দেওয়া হবে। তবে একবারই মাফ করা হবে, পরে আর সুযোগ দেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পর সাংবাদিকরা বক্তব্য জানতে চাইলে প্রথমে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান শাজাহান খান। পরে সড়ক দুর্ঘটনার পর চালকের জামিনের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে দাবি করেছি, একজন ড্রাইভার যদি দুর্ঘটনা ঘটান, তিনি যদি দীর্ঘদিন জামিন না পান, তবে ড্রাইভারের ঘাটতি পড়ে যাবে। এক বছরে সারা দেশে ৩ থেকে ৪ হাজার দুর্ঘটনা হয়, তাহলে ৩ থেকে ৪ হাজার ড্রাইভারের ঘাটতি পড়ে যাচ্ছে। আমরা এখনো কিন্তু ৩ থেকে ৪ হাজার ড্রাইভার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে পারছি না, আমাদের সেই ক্যাপাসিটি নেই। এই কারণেই বলেছি, দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত করে বিচার হবে, সেই বিচারে যা হওয়ার হবে, কিন্তু তিনি যেন জামিনটা পান। এতে ঘাটতির জায়গাটা পূরণ হবে। জেল যা আছে, সেটা নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘দাবিটা ছিল এ কারণে যে, আপনারা কিন্তু পত্রপত্রিকায় লেখেন এখনো যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। বাস্তবতাটা আপনারা উপলব্ধি করতে পারছেন কি না আমি জানি না। বাস্তবতাটা হলো, লাইসেন্সের কথা মন্ত্রী মহোদয় বলছেন, অনেক ঘাটতি আছে, লাইসেন্স দিতে পারছে না বিআরটিএ। ভুয়া ও ফেক লাইসেন্স নিয়ে যদি কেউ গাড়ি চালায় তার তো জরিমানা হবে, জেল হবে। সে স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালাতে পারছে না।’
অপরাধ জামিনযোগ্য করা হলে দুর্ঘটনা আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হবে কি না– জানতে চাইলে শাজাহান খান বলেন, ‘এটা ঠিক নয়। কেউ যদি একবার অপরাধ করে, সে কিন্তু অপরাধ ইচ্ছাকৃত করে না, করতে চায় না।’
নানা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পরিবহন শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করলেও কোনো ধর্মঘট ডাকা হয়নি বলে দাবি করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান।
সড়কে গাড়ি কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো নামছে না বলে তা মনে হচ্ছে। ওই আইনের কারণে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম। এই বাস্তবতাটা আপনারা (সাংবাদিকরা) লেখেন না, লেখেন স্বাভাবিক হয়নি। আমি মনে করি, সবই স্বাভাবিক চলছে।’
সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তে পুলিশের সঙ্গে আপনারা বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (এআরআই) সংযুক্ত করার কথা বলেছেন; তবে কী পুলিশের ওপর আপনাদের আস্থা নেই– শাজাহান খানকে করা এ প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইনভেস্টিগেশন পুলিশই করবে, এটাই আইন। তবে যখনই প্রয়োজন হবে সিরিয়াস কোনো অ্যাকসিডেন্ট হলে তখন এক্সপার্ট অপিনিয়নের জন্য এআরআইর পরামর্শ নেওয়া হবে। জটিল ও স্পর্শকাতর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আমাদের পুলিশরাই এআরআইর পরামর্শ নিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও সেগুলো নেবেন। এটাই সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
