পেঁয়াজের চাহিদা মেটাতে সরকারের উদ্যোগের কমতি নেই, কিন্তু তার ফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। ব্যবসায়ীদের ওপর সরকারের অতিমাত্রার নির্ভরশীলতায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে চাহিদা মেটাতে গত আগস্ট থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ৮৮৮ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন দেয় সরকার, যা সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে দেশে পৌঁছানোর কথা। তবে এ সময়ে আমদানি হয় মাত্র ১ লাখ ৬১ হাজার ৪৯২ টন। মিসর ও তুরস্ক থেকে ৬০ হাজার টন পেঁয়াজ নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আসতে শুরু করবে প্রতিশ্রুতি দেয় এস আলম গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ। তবে তারাও কথা রাখেনি। এছাড়া আমদানিকারকদের অনেকে অনুমোদন নিয়েও পেঁয়াজ আনেনি। অনেকে অনুমোদন নিয়ে ঋণপত্রও (এলসি) খোলেনি। বাধ্য হয়ে পেঁয়াজ আমদানিতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হয়েছে, এতে গচ্ছা দিতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। প্রতি মাসে পেঁয়াজের গড় চাহিদা দুই লাখ টন হলেও বর্তমানে ৬০ হাজার টনে নেমেছে। কিন্তু এ চাহিদাও মিটছে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফরউদ্দিন গত ৩ নভেম্বর দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘মিসর ও তুরস্কের বড় তিনটি চালান পথে রয়েছে। এ সপ্তাহের মধ্যেই এগুলো বাজারে পৌঁছবে। আগামী সপ্তাহে আর কোনো সংকট থাকবে না।’ আর ১ নভেম্বর এস আলম গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) আকতার হাসান বলেছিলেন, ‘আমাদের পেঁয়াজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছবে। মিসর থেকে এখানে আসতে সময় লাগবে ১৩-১৫ দিন। সম্ভবত ২৮-২৯ সেপ্টেম্বর প্রায় ১৫ হাজার টন পেঁয়াজ নিয়ে মিসর ত্যাগ করেছে। সেই হিসাবে মধ্য নভেম্বরে আমরা এগুলো বাজারে ছাড়তে পারব।’ সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা বলেছিলেন, ‘আমরা যে জাহাজে করে পেঁয়াজ আনছি সেটি সিঙ্গাপুর বন্দর হয়ে চট্টগ্রামে আসবে। এতে অন্তত ১৮-২০ দিন সময় লাগবে। সেই হিসাবে আগামী ২০ নভেম্বরের মধ্যে বাজারে আমাদের পেঁয়াজ বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে।’
তবে সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা গতকাল বলেন, ‘তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আসতে একটু দেরি হয়েছে। গত ২২ নভেম্বর সিঙ্গাপুর বন্দরে পৌঁছেছে। এখন সেখানে আটকে থাকলে তার দায়িত্ব কে নেবে? দেশের বন্দরে পৌঁছতে অন্তত ৪ ডিসেম্বর লেগে যাবে।’ এস আলম গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক আরিফ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই বিষয়ে গ্রুপের আরেক মহাব্যবস্থাপক আকতার হাসানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। আকতার হাসান দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাকে ইমেইল পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দেননি। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আগস্টে ৮২টি কোম্পানি ৬৮ হাজার ১৯৮ টন, সেপ্টেম্বরে ১৩৭টি কোম্পানি ১ লাখ ৩২ হাজার ৩২২ টন, অক্টোবরে ১০৩টি কোম্পানি ৭০ হাজার ১৫৮ টন ও নভেম্বরের ১৮ তারিখ পর্যন্ত ১০৮টি কোম্পানি ৩০ হাজার ২১০ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নেয়। ভারত সরকার ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রাখলেও অনেকে ভারত থেকেও পণ্যটির আমদানির অনুমতি নিয়েছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, পেঁয়াজ আমদানির জন্য যে দেশ থেকে যে পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি চাওয়া হোক না কেন, তা অনুমোদন দিতে। এজন্য যাচাই ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়। এত বিশাল পরিমাণ আমদানির অনুমোদন নেওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি থাকবে না। বিশেষ করে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ২ লাখ টনেরও বেশি পেঁয়াজের অনুমোদন নেন ব্যবসায়ীরা, যা এ সময়ে আমদানি পেঁয়াজের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। গত ১৬ নভেম্বর কৃষি অধিদপ্তরের নজরে আসে ব্যবসায়ীরা অনুমোদন নিয়েও সেই পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করেননি। এমনকি অনেক আমদানিকারক ঋণপত্রও (এলসি) খোলেননি।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৪৬১ টন। এর মধ্যে জুলাইয়ে ৭১ হাজার ৭৪১ টন, আগস্টে ৫৮ হাজার ৪৪৫ টন, সেপ্টেম্বরে ৬৬ হাজার ৪১২ টন ও অক্টোবরে ৩০ হাজার ১৩৫ টন। এছাড়া নভেম্বরের ১৮ তারিখ পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে সাড়ে ৬ হাজার টন। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ২ লাখ টনেরও বেশি পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিলেও সেপ্টেম্বর-নভেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টন। বাজারে পেঁয়াজের সংকট তৈরি হওয়ার এটাই সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এ বছরের ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হয়ে যেভাবে পেঁয়াজ আমদানি অনুমতি নিয়েছিলেন তাতে ধরেই নেওয়া হয়েছিল, পেঁয়াজের কোনো সংকট পড়বে না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা অনুমতি নিয়েও পেঁয়াজ আমদানি করবেন না সেটা কল্পনার বাইরে ছিল। আর এস আলম গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে সরকার পেঁয়াজের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছে। তাদের কথার ওপর ভিত্তি করেই প্রধানমন্ত্রীও দ্রুত পেঁয়াজ সমস্যা সমাধান হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু দাম যখন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে তখন সরকার খোঁজ নিয়ে দেখে, অনুমোদনের মাত্র অর্ধেক আমদানি হয়েছে। এটা ব্যবসায়ীদের জোটবদ্ধ কারসাজি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মকর্তারা জানান, পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীদের এ জোটবদ্ধ কারসাজি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তাই যদি না হতো তাহলে নভেম্বর মাসের ১৮ তারিখ পর্যন্ত মাত্র সাড়ে ৬ হাজার টন পেঁয়াজ আসত না। অক্টোবর-নভেম্বর ১৮ তারিখ পর্যন্ত তারা এক লাখ টনেরও বেশি আমদানির বিপরীতে এ সামান্য পরিমাণ আমদানিই প্রমাণ করে এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র ছিল। বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করে তারা মুনাফা করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখানে সরকারেরও ভুল ছিল। তারা ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত বিশ্বাস করেছে। আমদানির অনুমোদন দেখে সরকার পেঁয়াজ সরবরাহের হিসাব করেছে। কিন্তু কতটুকু আমদানি হচ্ছে সেই বিষয়ে নজর দেয়নি। এ কারণেই সমস্যার তৈরি হয়েছে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ভোক্তা সমিতির (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের চিন্তাই হলো যেকোনো উপায়ে ব্যবসা করা। অথচ সরকার নিজে উদ্যোগ না নিয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করেছে। তাদের বিশ্বাস করেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সরকারকে সহায়তা না করে সিন্ডিকেট করেছে। এ সুযোগটা সরকারই ব্যবসায়ীদের করে দিয়েছে। আমাদের মন্ত্রীও নতুন, ওনাকে দোষ দিয়েও লাভ নেই। তবে সরকার যদি নিজে উদ্যোগী হয়ে পেঁয়াজ আমদানি করত তাহলে আর এ সমস্যা তৈরি হতো না।’
কৃষি সরেজমিন বিভাগের পরিচালক চণ্ডি দাস কুণ্ডু বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম বাড়ার একমাত্র কারণ সিন্ডিকেট (মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের জোট)। এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে কৃষকও লাভবান হবে, বাজারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’
শ্যামবাজার বণিক সমিতির সহসভাপতি ও পেঁয়াজ আড়তদার আবদুল মাজেদ বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই বলেছি, সরকার আমদানির যে তথ্য দিচ্ছে বাস্তবের সঙ্গে তার গরমিল রয়েছে। আমদানিকারকরা যদি বাকি দেড় লাখ টন পেঁয়াজ আনত তাহলে বাজারে আর সংকট তৈরি হতো না।’
