১.
দেশ কাবু হয়ে আছে। না। ঝড়ের কাছে নয়। পেঁয়াজের কাছে। পথের ধারের রেস্তোরাঁতে গিয়ে আটপৌরে যে বাঙালি ‘পেঁয়াজ মরিচ বাড়াইয়া একটা ডিমের ভাজি দেন’ বলে হাঁক দিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে বসে ভাজা ডিম-পরোটার অপেক্ষা করতেন, তার এখন রোজ সকালে মেজাজ সপ্তমীতে গিয়ে ঠেকে। ডিমে পেঁয়াজ নেই! খালি মরিচ! পেঁয়াজ ছাড়া ডিম ভাজি হয় কী করে! কোটি টাকার প্রশ্নই বটে। কিন্তু পেঁয়াজের যে দাম, তাতে পেঁয়াজ দিয়ে ডিম ভাজি না করে বরং অনেকগুলো ডিম দিয়ে একটা কি দুইটা পেঁয়াজ ভাজি খাওয়ার দিন সমাগত।
সম্প্রতি পথের পাশে ঝালমুড়ি খেয়েছেন? না খেয়ে থাকলে চেখে দেখবেন। পেঁয়াজ নেই। পেঁয়াজ ছাড়া ঝালমুড়ি। পেঁয়াজের বদলে কেউ-কেউ ঝালমুড়িতে পেঁপে কুচি মাখিয়ে বিক্রি করছেন। বাঙালির জিভে এ যদি দুর্দিন না হয় তবে আর দুর্দিন কাকে বলে! এখন কি পেঁয়াজ ছাড়া ঝালমুড়ি খাবার পরামর্শ নিয়ে হাজির হবেন স্বাস্থ্য-সচেতন উপকারী কোনো বন্ধু? তা পরামর্শ কেউ দিতেই পারে। কিন্তু পেঁয়াজ আমাদের আশৈশব খাদ্য-স্মৃতির অংশ। তরকারিতে পেঁয়াজ না থাকুক। কিন্তু ভর্তায় আমার পেঁয়াজ চাই। মাছের ভাজি, এমনকি মামুলি সস্তা মুরগির মাংসের তরকারি খাবার সময়েও প্লেটের মধ্যে এক-দুই টুকরা কাঁচা পেঁয়াজ আমার চাই। চাই-ই। প্রায় মাসখানেক আগে, সকালে মাকে নিয়ে ঢাকাই মধ্যবিত্তের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য স্টার রেস্তোরাঁয় গেলাম। নাশতায় নেহারি আর ডাল-গোশত দিয়ে পরোটা খেতে। কিন্তু দেখলাম, সালাদে শুধু কাঁচামরিচ আর লেবু। পেঁয়াজ নেই। বেঁকে বসলাম। পেঁয়াজ ছাড়া নেহারি আমার চলবে না। বহু হুজ্জত করে পেঁয়াজ মিলল। কিন্তু এর সপ্তাহ দুয়েক পর ধানম-িতে অবস্থিত ‘সুলতান’স ডাইন’ নামের কাচ্চির জন্য বিশেষ খ্যাত একটি খাবারের দোকানে গেলাম। কাচ্চি এলো। সঙ্গে আরও নানান কিছু। সালাদও এলো। কিন্তু সালাদে পেঁয়াজ নেই। পেঁয়াজ দিতে বিনীত অনুরোধ জানানো হলো। তারপরও পাওয়া গেল না। খাবারের অন্যান্য আইটেমের মতন পেঁয়াজও একটি ‘আইটেম’ হিসেবে বিক্রি করতে তাদের অনুরোধ জানালাম। প্রয়োজনে প্রতি পেঁয়াজ দশ-বিশ টাকা করে নিক। তবু, কাচ্চি খেতে গিয়ে পেঁয়াজ না হলে যার চলবেই না, তার কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করা হোক। এই প্রস্তাবেও কাজ হলো না। পেঁয়াজের দেখা মিলল না। এবারে ভাবুন যে, ‘মামুলি’ পেঁয়াজও কত গভীর সংকট তৈরি করতে পারে। সমাজের নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে এই সংকটের প্রভাব কতটা তীব্র সেটা নিয়ে ভাবুন। সামর্থ্যে পোষায় না বলে, মানুষ পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দিলেই তার ক্ষোভ ও বিরক্তি শেষ হয়ে যাবে না। পেঁয়াজ আমাদের স্মৃতির অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে খাদ্যাভ্যাসের অংশ। পেঁয়াজ বাঙালি জীবন ও খাদ্যের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। পেঁয়াজের সরবরাহ ঠিক রাখতে না পেরে বাঙালিকে পেঁয়াজ না খেতে পরামর্শ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে ব্যর্থতা ঢাকার হাস্যকর রাস্তা খোঁজা। দেশে কোনো যুদ্ধ লাগেনি বা মহামারী বা বিপর্যয় দেখা দেয়নি। অতএব, জনগণকে পেঁয়াজ না খেতে বলা প্রহসনের নামান্তর। বাজারে পেঁয়াজ থাকার পরেও কে খাবে আর কে খাবে না সেই বাছাইয়ের সুযোগ থাকলে সেখানে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু এর সঙ্গে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ নেই বলে ‘পাই না তাই খাই না’ পরিস্থিতির তুলনা চলে না। এটি স্পষ্টতই সংকট মোকাবিলার ব্যর্থতা।
২.
পেঁয়াজ! এহেন পেঁয়াজ! সংকট যখন দেখা দেয়, তখন বলা হয়েছিল, পেঁয়াজ আছে। ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু মানুষ যখন দেখল, ‘আছে’ বললেও আস্থা রাখা যায় না তখন লবণ নিয়ে কেউ আর ঝুঁকি নিতে চায়নি। তাই, লবণের গুজবকে তারা গুজব ভাবেনি। সত্য ভেবেছে। তখন গুজব আর সত্যকে আলাদা করা মুশকিল হয়ে উঠেছিল। তাই, পেঁয়াজের আগুনে ‘ঘর পোড়া গরু’ লবণের ‘সিঁদুরে মেঘ দেখে’ ভয় পেয়েছে।
গুজবে কান দেওয়ার কারণে জনগণকে দোষ দেওয়াটা অন্যায়। গণমানস বা জনতার মনস্তত্ত্ব এরকমই। সংকট আসছে জেনে তা ঘনীভূত হওয়ার আগেই প্রতিটি মানুষ নিজের এবং তার প্রিয়জনদের জন্য নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে চায়। মানুষের এই প্রবণতাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নিয়ন্ত্রণ করতে গেলেই উল্টো গণমানুষের মধ্যে উন্মত্ততা ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। উন্মত্ততা নিয়ন্ত্রণ কঠিন। কিন্তু সহজ হচ্ছে, উন্মত্ততার পরিবেশ যাতে তৈরি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ওয়াল্টার ডি. এসটি. জন গুজব বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। পাবলিক রিলেশন্স বা জনসংযোগের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যয়নের বিষয় হচ্ছে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বা সংকট মোকাবিলা। গুজবের কারণেও সংকট দেখা দিতে পারে। আবার সংকটকালেও গুজব রটতে পারে। তাই, গুজবকে হাল্কাভাবে না দেখে একে মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়াই কার্যকর পন্থা।
গুজব ছড়াতে পারে এমন পরিবেশ যাতে তৈরি না হয় সেই দিকে আগে খেয়াল দেওয়া দরকার। অর্থাৎ, গুজব কখনোই এমনি-এমনি রটে না। তিল থাকলে সেটা থেকে তালের জন্ম হতে পারে। পথের ওপর পড়ে থাকা প্যাঁচানো দড়িকে পথচারী রাতের অন্ধকারে সাপ ভেবে ভয় পেতে পারে। তাই, কর্র্তৃপক্ষের কর্তব্য হচ্ছে, যাতে পথের ওপর দড়ি পড়ে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা। এছাড়া পথের ওপর পর্যাপ্ত সড়কবাতির ব্যবস্থা রাখা উচিত যাতে দড়িকে দড়ি বলে চেনা যায়। অর্থাৎ গুজব-সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে না দেওয়াই সর্বোত্তম পন্থা।
শুধু লবণ বা পেঁয়াজ নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে গুজব একটি নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্মা সেতু সম্পন্ন করতে ‘কাটা মাথার’ গুজবটা শুধু মামুলি গুজবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মানুষ হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতন আচরণ করেছে তখন। রোজ গণপিটুনির খবর বেরিয়েছে। রেণুর মতন অনেকগুলো প্রাণ ঝরে গেছে গুজবের অপঘাতে।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সময়েও গুজব মাথাচাড়া দিয়েছিল। ধানম-ির রাস্তায় কী চলছে তা জানতে না পেরে, ফেইসবুকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ না পেয়ে গুজব ডালপালা মেলেছিল। আর রামু বা নাসিরনগর বা ভোলার বোরহানুদ্দিনে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষদের বাড়িঘর-ধর্মালয় ও জানমালের ওপর যে হামলা হলো এর পেছনেও কি আদতে গুজবের প্রশ্রয় নেই? আপাত অর্থে, ফেইসবুকে ভুয়া বা মিথ্যে তথ্য ছড়ানোর পর হামলাগুলো সংঘটিত হয়। অন্য অর্থে, এগুলোও গুজবেরই নামান্তর। হয়তো ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ধর্মাবমাননার অভিযোগ উঠলেই কি সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে? অন্যের বাড়িঘর-ধর্মালয় ভেঙেচুরে জ্বালিয়ে দিতে পারে? পারে না। তাহলে যারা জ্বালিয়ে দেয়, তাদের তো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা উচিত। কিন্তু তাদের শাস্তির কোনো খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। সাধারণ মানুষের কাছে, শুধু ঘরবাড়ি-ধর্মালয় ভেঙে দেওয়ার খবরগুলো আসে। বিচারের ক্ষেত্রে এই যে শৈথিল্য, এই শৈথিল্যের পথ ধরেই নিঃশব্দে গুজবের আগমন।
অর্থাৎ গুজবের জন্ম ও বিস্তারের পেছনে কিছু নিয়ামক রয়েছে। ‘দিস ইজ পিআর’ গ্রন্থে সেই নিয়ামকগুলোর একটি তালিকা রয়েছে। এখানে দু’একটি উল্লেখ করছি। যদি ভয়, শঙ্কা বা অনিশ্চয়তার পরিবেশ বিরাজ করে তবে সেখানে গুজব সহজে ছড়ায়। যদি নির্ভরযোগ্য তথ্য যথার্থ কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে যথাসময়ে না আসে তবে সেই সুযোগেও গুজবের বিস্তার হতে পারে। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যদি দোনামনা বা সিদ্ধান্তহীনতায় লম্বা সময় ক্ষেপণ হয়, তাহলেও গুজব রটতে পারে। এখন এই কারণগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন পেঁয়াজ, লবণ, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন বা ধর্মাবমাননার গুজবের ঘটনাগুলো।
এক মামুলি পেঁয়াজের জেরে দেশ কাবু হয়ে আছে। যদি চাল-ডাল-তেল-নুনের মতন দৈনন্দিন জীবনের অতি জরুরি ও অপরিহার্য দ্রব্য নিয়ে কোনো ‘কুচক্রী মহল’ ষড়যন্ত্র করে গুজব রটাতে চায় তাহলে কী ঘটনাটাই না ঘটতে পারে! তেমন উত্তাল পরিস্থিতি তৈরি হলে স্বয়ং সরকারই বেসামাল দশায় পড়তে পারে। তাই, গুজব মোকাবিলায় আগে থেকেই কিছু ভাবনা ভেবে রাখা দরকার। ‘দিস ইজ পিআর’ গ্রন্থে গুজব মোকাবিলার ক্ষেত্রে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে দু’একটি তুলে ধরছি।
গুজবের পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটিকে বাড়তে না দিয়ে ত্বরিতগতিতে এটিকে ‘অ্যাড্রেস’ বা চিহ্নিত করা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। গুজবটা কতখানি গুরুতর এবং এর প্রভাব কতদূর হতে পারে সেটিকে আগেই গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। গুজব রটনার নির্দিষ্ট কারণগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে এবং গুজব কারা, কেন রটিয়েছে সেই উৎসগুলো চিহ্নিত করতে হবে। আসল ও সত্য তথ্যটা মানুষকে জানাতে হবে এবং প্রয়োজনে জনগণের সঙ্গে বৈঠক করে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের দ্বিধাটা কাটিয়ে দিতে হবে। এই কাজগুলো করা গেলে গুজব প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
গুজব দাবানলের মতন। কার থেকে রটেছে, কীভাবে রটেছে, কেন রটেছে সাধারণ মানুষের অত ভাবনা করার ফুরসত নেই। সাধারণের এই মনস্তত্ত্বের সুযোগ অসাধুরা নিতেই পারে। কিন্তু কর্র্তৃপক্ষকে সজাগ থাকতে হবে। নইলে, সাধারণ মানুষকেই ভোগান্তি পোহাতে হয়। যে মানুষ সকালে নাশতা খেতে গিয়ে দেখে ডিম ভাজিতে পেঁয়াজ নেই, বিকেলে ৫ টাকার ঝালমুড়ি খেতে গিয়ে দেখে পেঁয়াজ নেই, রাতে আলু ভর্তায় যদি দেখে পেঁয়াজ নেই সেই মানুষ যদি ক্ষুব্ধ হয় তার ক্ষোভটা কি খুব বেশি অযৌক্তিক হবে?
লেখক
কবি ও সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ
