ভোল পাল্টানো সম্রাটঘনিষ্ঠ পপি পল্টনের আতঙ্ক

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৫৩ এএম

‘বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় ২০০২ সালে সেগুনবাগিচা হাই স্কুলের মাঠে চলছিল আওয়ামী লীগের এক কর্মিসভা। ক্ষমতায় থাকা বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ভয়ে অনেকটা গোপনেই চলছিল ওই সভা। কিন্তু খবর পেয়ে হঠাৎ সেখানে হামলা চালায় ছাত্রদল ও যুবদলের একটি গ্রুপ। এ হামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বেশকিছু নেতাকর্মী আহত হন। ওই হামলায় নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিল মোস্তবা জামান পপি। সেই পপিই এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের  

 শেষদিকে এসে ভিড়ে যায় আওয়ামী লীগে। বর্তমানে সে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পল্টন থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। শুধু তাই নয়, নৌকার টিকিট নিয়ে ২০১৫ সালে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও হয়েছে।’ গতকাল সোমবার দুপুরে এভাবেই বিএনপি কর্মী থেকে আওয়ামী লীগ নেতা বনে যাওয়া কাউন্সিলর মোস্তবা জামান পপির রাজনৈতিক খোলস পাল্টানোর ইতিহাস বর্ণনা করছিলেন সেগুনবাগিচা স্কুলের সেই হামলায় আহত হওয়া ২০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি কালাম হোসেন।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিতর্কিত কাউন্সিলর মোস্তবা জামান পপি ১০-১২ বছর আগেও বিএনপির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তার আপন বড় ভাই বিএনপির পদধারী নেতা। চতুর প্রকৃতির পপি নিজের খোলস পাল্টে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের শেষদিকে এসে আওয়ামী লীগে ভেড়েন। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে ২০১০ সালে পল্টন থানার ১৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ পান তিনি। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা পপি এর দুই বছরের মধ্যে বাগিয়ে নেন পল্টন থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদটিও। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার পর থেকেই পল্টন এলাকার ফুটপাত আর জনশক্তি রপ্তানিকারকসহ বিভিন্ন অফিস থেকে চাঁদা আদায় শুরু করেন পপি ও তার লোকজন। পরে থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ পদটি তার ক্ষমতার সিঁড়িতে যোগ করে নতুন ধাপ। আর ২০১৫ সালের এপ্রিলে ডিএসসিসির ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হওয়ার পর পুরো পল্টন থানা এলাকায় শুরু হয় পপির একচ্ছত্র আধিপত্য। নিজের পছন্দের লোকজন দিয়ে ক্যাসিনো ও মাদকের কারবার, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল, ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় এবং পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকার সড়কে অবৈধ পার্কিং থেকে টাকা তোলার কাজটিও এখন তার নিয়ন্ত্রণে। তবে সম্প্রতি সরকার শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর থেকেই এলাকাছাড়া কাউন্সিলর পপি। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শুদ্ধি অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পপিও গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপন আছেন। আর নিজেদের কাউন্সিলর পপিকে এলাকায় না পেয়ে নাগরিক ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা পেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডবাসীকে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও জমি দখলের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে পপির বিরুদ্ধে। আদালতে বিচারাধীন এসব মামলার প্রতিটিতেই জামিনে আছেন তিনি। কাকরাইলের ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে মোস্তবা জামান পপির কেনা ফ্ল্যাটেই প্রথম ব্যক্তিগত কার্যালয় খোলেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর ৬ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন সম্রাট। আর তার গ্রেপ্তারের পর থেকেই কাউন্সিলর পপিকে এলাকায় দেখা যায়নি। পল্টন কমিউনিটি সেন্টার ও চামেলীবাগে নিজ বাড়ির নিচতলায় আলাদা দুটি কার্যালয় আছে পপির। পল্টনের কার্যালয়টি বর্তমানে তালাবদ্ধ থাকলেও চামেলীবাগের কার্যালয়টি খোলা থাকে। কিন্তু সেখানেও আসছেন না তিনি।

ডিএসসিসি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের এপ্রিলে পপি কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর গত ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএসসিসির ২০টি বোর্ড সভা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি বোর্ড সভাতেই অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। এ অপরাধে তাকে সম্প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছেন ডিএসসিসির সচিব মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল মজুমদার।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, পল্টন থানা এলাকায় মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ দখল সবই চলে পপির ইশরায়। তার বিরুদ্ধে মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে সরকারের কাছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে একাধিকবার প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছে। পপির হয়ে সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন পল্টন থানা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ইফতেখার রহমান জয়, ছাত্রদলের সাবেক নেতা শরিফুল ইসলাম শরিফ (ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত), সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কাজী আল জাহিদ, মেহেদী হাসান এবং ১৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিএম পিয়াল হাসান। এছাড়া বায়তুল মোকাররম ও স্টেডিয়াম এলাকার ফুটপাত এবং অবৈধ পার্কিং থেকে চাঁদা তোলার দায়িত্ব পালন করেন ১৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি দুলাল। পুরানা পল্টন এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলার বিষয়টি কাউন্সিলর পপির হয়ে দেখভাল করেন ১৩ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি শাহীন লতিফ টিটু। আর ডিজে সানি হিসেবে এলাকায় পরিচিত এক যুবলীগ নেতা তার হয়ে এলাকার ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন।

কয়েক বছর আগে পল্টনে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যৌথ মালিকানার একটি বাড়ি বিক্রির সময় ওই সম্পত্তির অংশীদার এক নারীর স্বামীর কাছে চাঁদা দাবি করেন পপি। চাঁদার টাকা না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি ওই নারীর সন্তানকে স্থানীয় একটি মুদি দোকান থেকে চাঁদা দাবির মিথ্যা নাটক সাজিয়ে নিজের লোকজন দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন। এ সময় সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে মারধরের শিকার হন ওই নারী ও তার মেয়ে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ওই নারী মামলা করতে চাইলেও পপি পল্টন থানা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতার মাধ্যমে তাকে সমঝোতা করতে বাধ্য করেন।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, বছর দুয়েক আগে পপির ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে কক্সবাজারে দুই দফায় ইয়াবার চালান নিয়ে ধরা পড়েন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইফতেখার রহমান জয়। এ ঘটনায় জয়কে পরে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া কাকরাইলের গ্যারেজপট্টিতে নাইটিঙ্গেল বার লাগোয়া চারতলা একটি ভবন অবৈধভাবে দখল করেছেন পপি। ওই ভবনটির নিচতলায় রয়েছে ডায়মন্ড রেস্টুরেন্ট নামে একটি খাবার হোটেল। অভিযোগ রয়েছে, ভবনটির তৃতীয় তলায় পুল ক্লাবের আড়ালে মাদকের কারবার চলে এলাকায় পপির ডানহাত বলে পরিচিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কাজী আল জাহিদের নেতৃত্বে। আর একই ভবনের চতুর্থ তলায় জাহিদের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে জুয়ার আসর বসে বলেও এলাকায় জনশ্রুতি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কাজী আল জাহিদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আগে ওই ভবনে ক্লাব ছিল, তা ডিজে সানি চালাত। কিন্তু এখন ওই ক্লাব বন্ধ আছে। যদিও ওই ক্লাবের সঙ্গে কখনই আমি জড়িত ছিলাম না। আর আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তবা জামান পপির সঙ্গে আমার শুধু রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, এর বাইরে কোনো কিছু নয়।’

কাকরাইলের গ্যারেজপট্টিতে পপির ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত ছাত্রদলের সাবেক নেতা শরিফুল ইসলাম শরিফ তিন-চারটি গ্যারেজ দখল করে রেখে ভাড়া আদায় করছেন। আর পপির পক্ষে শরিফ ও জাহিদ এলাকার নির্মাণাধীন ভবনগুলো থেকে চাঁদা আদায় করেন। এলাকার একাধিক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের মোটা অঙ্কের চাঁদা না দিলে এলাকায় নতুন কোনো ভবন বা স্থাপনার নির্মাণকাজ শুরু করাই সম্ভব হয় না।

এ অভিযোগ সম্পর্কে জানতে শরিফুল ইসলাম শরিফের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা ধরেননি।

এদিকে পপি ও তার সহযোগীদের অপকর্মের প্রতিবাদ করলেই প্রতিবাদকারীকে মাদকের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করা হয় বলেও এলাকাবাসীর অভিযোগ। এ ক্ষেত্রে আগে হয়রানির শিকার লোকজনের দুর্ভোগকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে টার্গেট করা ব্যক্তিকে দেওয়া হয় নানা হুমকি-ধমকি।

পপির ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) পরিচয় দিয়ে তৌফিকুর রহমান তৌফিক নামে এক ব্যক্তি ভিকারুননিসা নূন ও আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজের তদবিরের কথা বলে এলাকার বেশকিছু বাসিন্দার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে মোস্তবা জামান পপির চামেলীবাগের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত