সমগ্র বিশ্বে উদারনৈতিক গণতন্ত্রবাদীদের ব্যর্থতা, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মন্দার ফলে ডানপন্থি উগ্র-জাতীয়তাবাদী ও উগ্র-ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থান লক্ষণীয় হারে বাড়তে শুরু করেছে। এসব শক্তির উত্থান ঘটছে জাতি-বিদ্বেষ, বর্ণবাদ, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের বিনাশ করে। আর ডানপন্থি শক্তিগুলো এর পেছনে নিয়মিত রসদ জোগাচ্ছে। ফলত বিশ্বব্যাপী আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে জাতি-বিদ্বেষ এবং হুমকির মুখে পড়েছে পরমতসহিষ্ণুতা,
পরসংস্কৃতি-সহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় সম্পªীতি। বর্ণবাদ, জাতি-বিদ্বেষ ও ধর্মীয় বিভেদের এই চিত্র তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র ও শিক্ষা-সমস্যা কবলিত দেশগুলোতে যেমন রয়েছে তেমনি শিড়্গিত, ধর্মনিরপেক্ষ, উদার গণতন্ত্রবাদী ও বহুজনবাদী সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী সমাজেও বাড়ছে। সম্পªতি বেশ কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের দাবিদার আধুনিক ইউরোপ জুড়ে– বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে– ডানপন্থি উগ্র-জাতীয়তাবাদী এবং ধর্ম ও বর্ণবিদ্বেষী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উত্থানের বাড়ন্ত দশার চিত্র উঠে এসেছে।
ইউরোপে জাতি-বিদ্বেষের শিকার হচ্ছে, আফ্রিকার যুদ্ধ ও দারিদ্র্যকবলিত দেশগুলো থেকে আগত কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসী এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকবলিত দেশগুলোর মুসলিম অভিবাসীরা, স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং ইহুদিরা। ইউরোপের দেশগুলোতে সব জনগোষ্ঠীর সমঅধিকারের কথা থাকলেও জরিপে দেখাচ্ছে, অভিবাসী বা মুসলিম হওয়ার কারণে সংখ্যালঘুরা শিক্ষার ড়্গেত্রে, কর্মসংস্থানের ড়্গেত্রে, ধর্মপালনে এমনকি পোশাকের জন্যও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সম্পªতি আঙ্কারাভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে ইউরোপে জাতি-বিদ্বেষের একটি চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর পলিটিক্যাল ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ’ (এসইটিএ) ‘ইউরোপীয় ইসলামোফোবিয়া : রিপোর্ট ২০১৮’ শীর্ষক জরিপের তথ্যমতে, গত বছর ফ্রান্সে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ৬৭৬টি জাতি-বিদ্বেষী হামলার ঘটনা ঘটেছে। যা ২০১৭ সালে ছিল ৩০৯টি। ৬৭৬টি ঘটনার মধ্যে ২০ জন শারীরিক আক্রমণের শিকার, ৫৬৪ জন বৈষম্য এবং ৮৮ জন মৌখিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে জার্মানিতে মুসলিমদের ওপর ৬৭৮টি লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪০টি ঘটনা মসজিদে ঘটেছে। অস্ট্রিয়ায় ইসলামোফোবিয়া ঘটেছে ৫৪০টি। যা ২০১৭ সালে ছিল ৩০৯টি। বেলজিয়ামে ঘটেছে ৭০টি। এর মধ্যে ৭৬ শতাংশ ঘটনার ভিকটিম হচ্ছে নারী। এসইটিএ’র তথ্যমতে, গত বছর ইউরোপে শরণার্থীদের ওপর ১৭৭৫টি আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১৭৩টি আক্রমণ হয় শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রে এবং ৯৫টি আক্রমণ হয় কাজের আশায় জার্মানিতে আগত অভিবাসীদের ওপর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেদারল্যান্ডসে পুলিশের কাছে ১৫১৫টি দায়ের করা ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অভিযোগের মধ্যে ৯১ শতাংশ ঘটনা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘটেছে।
ইউরোপে ইসলামোফোবিয়া বিষয়ক সংস্থা ‘প্যান-ইউরোপিয়ান প্রোগ্রাম ফর ইসলামোফোবিয়া ইন ইউরোপ’ সম্পªতি একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি বলছে, ইউরোপের বিশেষ করে পশ্চিম ইয়োরোপীয় দেশগুলোতে ইসলামোফোবিয়া ও অভিবাসন-বিদ্বেষী মনোভাব চাঙ্গা হচ্ছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ফ্রান্স, ইতালি, ব্রিটেন, স্পেন, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোতে অভিবাসী, মুসলিম ও ইহুদি বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে ব্যাপক হারে। এসবের সঙ্গে জড়িত বেশির ভাগই উগ্র-জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী চরম ডানপন্থি অভিবাসীবিরোধী, মুসলিমবিদ্বেষী শক্তিগুলোর সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে সম্পªতি ইউরোপে ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা বা ইহুদি-বিদ্বেষ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউরোপে ইহুদিরা অধিক হারে কর্মস্থানে প্রবেশ করছে। যার ফলে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ হুমকির মুখে পড়তে পারে এই মনোভাব থেকে। এছাড়াও বর্তমানে ইউরোপের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্যও ইহুদিদের দায়ী করার মানসিকতাও কাজ করছে বলে সংগঠনটির ভাষ্য।
জার্মানিতে বিদেশি বিদ্বেষ বৃদ্ধি নিয়ে লাইপজিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর স্টাডি’র দুই প্রফেসরের গবেষণায় দেশটিতে বিদেশি বিদ্বেষের বাড়ন্ত অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রফেসর অলিভার ডেকার ও প্রফেসর এলমার ব্রালারের ‘কর্ত„ত্ববাদী ও ডানপন্থিদের উত্থান’ শীর্ষক গবেষণা তথ্যমতে, জার্মানির প্রতি তিনজনের একজন বিদেশি বিদ্বেষ মনোভাব পোষণ করে। তবে অঞ্চলভেদে এই বিদ্বেষী মনোভাবের তারতম্যও রয়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলে এই বিদ্বেষ মনোভাব বেশি। তথ্যমতে, জার্মানির ৩৬ শতাংশ মানুষ মনে করে বিদেশিরা তাদের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নাগরিক সুবিধা নেওয়ার জন্য আসছে। অভিবাসীদের এই ঢলের ফলে ভবিষ্যতে জার্মানিতে যদি বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সমস্যা বৃদ্ধি পায় তাহলে এই অভিবাসীদের বের করে দেওয়ার পক্ষে ৩৬ শতাংশ মানুষের অবস্থান। গবেষক প্রফেসরদ্বয় বলছেন, জার্মানিতে আগের চেয়ে ইহুদি-বিদ্বেষ কিছুটা কমলেও মুসলিম-বিদ্বেষ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। যা গত দু বছর আগেও এমন ছিল না। মুসলিম-বিদ্বেষ বাড়ার কারণ হিসেবে প্রফেসরদ্বয় বলছেন, ২০১৩ সালে পর থেকে জার্মানিতে অভিবাসন ইস্যু ও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক মন্দাকে কেন্দ্র করে ডানপন্থি কট্টরবাদী শক্তিগুলোর উত্থান ঘটেছে। এখন এই শক্তিগুলো রাজনীতিতে প্রভাব বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় জনগণের মধ্যে অভিবাসী ও মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ছড়াচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক গবেষণায় ইউরোপের পাঁচটি দেশে– বেলজিয়াম, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড ও স্পেন– বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ঘৃণা, কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্য, ধর্মপালনে বাধা, নারীদের হিজাবে নিষেধাজ্ঞা ও নিজস্ব সংস্কৃতি লালনে বাধার তথ্য ও কারণ উঠে এসেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, স্পেনে মুসলিমরা ধর্মপালনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। সম্পªতি দেশটিতে উগ্র-ডানপন্থি দলের উত্থানের ফলে দেশটিতে মুসলিমরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সুইজারল্যান্ডে সংবিধান সংশোধন করে মসজিদের মিনার তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে মুসলিমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিগ্রহের শিকার, কর্মস্থলে ঘৃণার মনোভাব ও কর্মসংস্থানের ড়্গেত্রে বৈষম্যের শিকার এবং নারীরা পোশাকের ড়্গেত্রে স্বাধীনতা হরণের শিকার হচ্ছে। অ্যামনেস্টির তথ্যের সম্পূরক তথ্য মিলেছে সম্পªতি ‘ইফপ’ নামে একটি সংস্থার জরিপে। সংস্থাটি বলছে, ফ্রান্সের ৪০ শতাংশের বেশি মুসলিম তাদের ধর্মপালনে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, ইউরোপের দেশগুলোর সংবিধানে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর ধর্মপালনের অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারগুলোর নীতি অনেক সময় ধর্ম বৈষম্য সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
সম্পªতি ইউরোপে মুসলিম অভিবাসনবিরোধী প্রচারণা বৃদ্ধি নিয়ে সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায় জার্মানির ১২.৫ শতাংশ, স্পেনের ১৫ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসের ১৩ শতাংশ, ডেনমার্কের ২১ শতাংশ ও বেলজিয়ামের ২০ শতাংশ নাগরিক মুসলিম অভিবাসনবিরোধী। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোটারদের অধিকাংশই মুসলিম অভিবাসনবিরোধী। মুসলিম অভিবাসন বিদ্বেষ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যম হাফিংটনপোস্ট ইউরোপীয় ধর্ম বিষয়ে গবেষণা কেন্দ্র (আইইআরএস) এর বরাত দিয়ে জানাচ্ছে, গত এক দশক ধরে ইউরোপ মন্দা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভিবাসনবিরোধীরা এজন্য অভিবাসীদের দায়ী করছে।
অভিবাসনবিরোধী চাঙ্গা মনোভাব কাজে লাগিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোতে অভিবাসনবিরোধী ডানপন্থি উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলো শক্তি বৃদ্ধি করছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সুইডেনের নির্বাচনে ১৮ শতাংশ ভোট পেয়ে অভিবাসনবিরোধী দল ‘খ্রিস্টান ডেমোক্রেস’ তৃতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। অস্ট্রিয়াতে অভিবাসনবিরোধী ‘ফ্রিডম পার্টি’ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অভিবাসনবিরোধী মিলোস জামান চেক রিপাবলিকে গত বছর পুনরায় ক্ষমতায় আসে। হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরভান অভিবাসীবিরোধী নীতি খাটিয়ে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় রয়েছে। অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির ফলে চাঙ্গা অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট, পোল্যান্ডের ল’ অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি, ইতালির লেইগা নর্দের মতো ডানপন্থি দলগুলো। এসব রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার কাজের অন্যতম এজেন্ডা হচ্ছে, অভিবাসন বিরোধিতা করা এবং জাতীয়তাবাদের নাম করে মানুষের মধ্যে অভিবাসী মনোভাব চাঙ্গা করা।
গবেষণা সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে যে হারে জাতি-বিদ্বেষ, বর্ণবাদ ও মুসলিম অভিবাসনবিরোধী মনোভাব বাড়ছে– যদি এর লাগাম না ধরা যায় তাহলে সমগ্র মহাদেশে গণতন্ত্র চরমভাবে ব্যাহত হবে এবং উগ্রপন্থার মারাত্মক উত্থান ঘটবে। জাতি-বিদ্বেষ, বর্ণবাদ ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি এবং এ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের বিপদ শুধু ইউরোপেরই নয় গোটা বিশ্বের জন্যই হুমকি। এমনকি উপমহাদেশের রাজনীতির জন্যও– যা এখনই দৃশ্যমান হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে উদারনৈতিক গণতন্ত্রবাদী শক্তিগুলো কতটা সফল হয় এখন সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
[email protected]
