হিরণ মিয়া এলাকায় লন্ডনি হিসেবেই বেশি পরিচিত। রয়েছে অঢেল ধন-সম্পদ। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে থেকেছেন তিনি। এখনো আসা-যাওয়া করেন। যুক্তরাজ্যে হিরণ মিয়ার পরিচিতি বিএনপির সামনের সারির নেতা হিসেবে। কয়েক বছর আগেও দেশটির ক্রয়ডন রাজ্যে বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। কিন্তু দেশে হিরণ মিয়া এখন নৌকার ‘কাণ্ডারি’।
গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সিলেট সদর উপজেলার মোগলগাঁও ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে চেয়ারম্যান হন হিরণ মিয়া। এটি ছিল তার প্রথম চমক। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী থাকলেও অন্যদের টেক্কা দিয়ে তিনি নৌকা প্রতীকটি বাগিয়ে নেন। আর তা টাকার জোরেই সম্ভব হয় বলে এলাকায় জনশ্রুতি। এ নিয়ে তখন দলে তোলপাড়ও হয়। আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা এর প্রতিবাদ করলেও হিরণ মিয়ার কিছুই হয়নি। এবার দ্বিতীয় এবং আরও বড় চমক দেখিয়েছেন তিনি। সিলেট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে তিনি সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হয়েছেন। গত সোমবার রাতে কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজামউদ্দিনকে সভাপতি ও হিরণ মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। গত রবিবার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচনের দাবি উঠলেও কেন্দ্রীয় ও জেলার শীর্ষ নেতারা সমঝোতার প্রস্তাব দেন। কিন্তু এতে সম্মত হননি কাউন্সিলররা। পরে নেতারা কমিটি ঘোষণা না করেই সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। এর পরদিনই গণমাধ্যমে বিবৃতির মাধ্যমে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে হিরণ মিয়ার নাম ঘোষণার পর থেকে সিলেট আওয়ামী লীগে তোলপাড় চলছে। স্থানীয়দের মধ্যে ফেইসবুকেও তাকে নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। অনেকে ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘কপালি হিরণ মিয়া, লন্ডনে বিএনপির আর সিলেটে নৌকার কাণ্ডারি।’
এদিকে হিরণ মিয়াকে অনুপ্রবেশকারী আখ্যায়িত করে তাকে আওয়ামী লীগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবিতে মাঠে নেমেছেন সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতারা। গত মঙ্গলবার তারা ঢাকায় গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ (সদর) আসনের সাংসদ ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আহমদ হোসেন ও সিলেট জেলা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বেলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিরণ মিয়া লন্ডনে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি যুক্তরাজ্যে বিএনপির একটি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তৃণমূলের দাবি ছিল, সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন। কিন্তু তা না করে অনুপ্রবেশকারী হিরণ মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এটা মেনে নেওয়া হবে না। প্রয়োজনে কঠোর প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আপাতত আমরা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাসের দিকে তাকিয়ে আছি।’
নাম প্রকাশে না করার অনুরোধ জানিয়ে সিলেট নগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহউদ্দিন সিরাজের সঙ্গে হিরণ মিয়ার ঘনিষ্ঠতা খুবই গভীর। মিসবাহর ছায়ায় থেকে হিরণ একের পর এক চমক দেখাচ্ছেন। আর এ চমক দেখাতে গিয়ে তিনি অনেক টাকা-পয়সা খরচ করছেন বলেও এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হিরণ মিয়া লন্ডনে বিএনপি করেন কি না সেটা আমার জানা নেই। এটা পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন। তবে অভিযোগ ওঠার পর সিলেট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের ওই কমিটি স্থগিত করা হয়েছে।’
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে হিরণ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লন্ডনে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছিল। এরপরও নৌকা প্রতীক নিয়ে আমি চেয়ারম্যান হয়েছি।’
