যৌন হয়রানির অভিযোগ জানাতে থানায় গিয়ে বিপদগ্রস্ত অল্পবয়সী মেয়ে নুসরাত জাহান রাফি দায়িত্বশীল পদে থাকা ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের মাধ্যমে অপরাধের শিকার হয়েছিলেন বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন তার সংক্ষিপ্ত রায়ের পর্যবেক্ষণে এ মন্তব্য করেন।
নুসরাতের জবানবন্দি ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়ে গতকাল বৃহস্পতিবার মোয়াজ্জেমকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় আট বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন বিচারক। আলোচিত নুসরাত হত্যাকাণ্ডের সাত মাসের মাথায় এ মামলার রায় হলো।
রায়ে বিচারক বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম খুবই দায়িত্বশীল কার্যালয়ে (থানায়) দায়িত্বরত ছিলেন। ১৮ বছর বয়সী বিপদগ্রস্ত একটি মেয়ে তার অধ্যক্ষের (ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলা) হাতে শ্লীলতাহানির অভিযোগে আইনি সহায়তা পেতে থানায় গিয়েছিল। সোনাগাজী
থানার ওসি হিসেবে মোয়াজ্জেম হোসেনের কর্তব্য ছিল বিষয়টি দায়িত্বশীলভাবে দেখা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।’
সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত গত ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন। সে সময় সোনাগাজী থানায় তার জবানবন্দি নেন তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। তার কয়েক দিন পর মাদ্রাসার ছাদে নুসরাতের গায়ে আগুন দিলে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। তখন নুসরাতের ওই জবানবন্দি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়।
এরপর নুসরাতের জবানবন্দির ভিডিও ধারণ ও তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গত ১৫ এপ্রিল সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। বিচারক মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেয়। পিবিআইর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রিমা সুলতানা গত ২৭ মে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মোয়াজ্জেম হোসেন তার অফিস কক্ষে উপস্থিত ভিকটিমের অপরিচিত কিছু পুরুষের সামনে যৌন নিপীড়নের বক্তব্য শোনেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। ভিডিওতে নুসরাতকে বিভিন্ন ধরনের বিব্রতকর প্রশ্ন করতেও দেখা যায়। এতে আরও বলা হয়, ‘যেহেতু নারী ও শিশুরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বিপর্যস্ত ও বিপদগ্রস্ত অবস্থায় থানায় আসে, সেহেতু নারী ও শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ সদস্যদের আরও বেশি সহনশীল হওয়া প্রয়োজন। বিবাদী মোয়াজ্জেম হোসেন ওসি হিসেবে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও নিয়মবহির্ভূতভাবে ভিকটিম নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ এবং প্রচার করে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।’
পিবিআইর প্রতিবেদনে বাদীসহ ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়। এর মধ্যে সোনাগাজী থানার চারজন পুলিশ সদস্যও ছিলেন।
গতকাল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সেই মামলার রায় ঘোষণা করেন বিচারক। শুরুতেই তিনি দুইপক্ষের বক্তব্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং যুক্তি ও যুক্তিখণ্ডনের সারসংক্ষেপ পড়ে শোনান। এছাড়া এ মামলার বাদী হিসেবে আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন কীভাবে যথার্থ ব্যক্তি (লোকাস স্ট্যান্ডি) তার ব্যাখ্যাও দেন বিচারক। সবশেষে তিনি এ মামলায় ওসি মোয়াজ্জেমের দায় ও দণ্ড ঘোষণা করেন।
রায়ে বিচারক বলেন, ‘ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযুক্ত বারবার নুসরাতকে মুখ থেকে তার হাত সরাতে বলছেন। এর মাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ দিতে গিয়ে তিনি (নুসরাত) আরেক দফা ভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন।’
