বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের সোপান নির্মাণ করেছেন তারা। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের অমর স্বাধীনতা সংগ্রামী তারা। স্বাধীন দেশে একের পর হত্যাযজ্ঞে জাতিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বশূন্য করে সামরিক স্বৈরশাসনের জিঞ্জিরে শৃঙ্খলিত করার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন তারা। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পেরিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রাম আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন তারা।
পঞ্চাশের দশকের যে শিল্পী-লেখক-কবি-বুদ্ধিজীবীরা আজীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অঙ্গনকে নিয়ত এগিয়ে নিয়ে গেছেন শিল্পী ইমদাদ হোসেন তাদের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। এ দীর্ঘ পরিক্রমায় সৃজনশীলতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে উদ্যমী ভূমিকা পালন করে অনুসরণীয় পদচ্ছাপ রেখে গেছেন আজীবন সংগ্রামী এই শিল্পী।
শিল্পী ইমদাদ হোসেন জন্মেছিলেন এক নভেম্বরে। কর্মময় জীবন শেষে চিরবিদায়ও নেন আরেক নভেম্বরে। চলতি নভেম্বরের ২১ তারিখ ছিল শিল্পী ইমদাদ হোসেনের জন্মদিন, আর ১৩ ছিল তার ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী।
এ কারণে এই নভেম্বরেই তাকে স্মরণ করার উদ্যোগ নিয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা গবেষণা ও প্রসার কেন্দ্র। শনিবার সন্ধ্যা ৫টায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে (বাড়ি নম্বর: ৪, রোড নম্বর: ৬) গ্যালারি চিত্রক প্রাঙ্গণে শিল্পীর ৯৩তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করবে সংগঠনটি। সবার জন্য উন্মুক্ত এ আয়োজনে শিল্পী ইমদাদ হোসেনের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করবেন দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী ও বিশিষ্ট নাগরিকেরা।
মঙ্গল শোভাযাত্রা গবেষণা ও প্রসার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও কোষাধ্যক্ষ ভাস্কর আমিনুল হাসান লিটু এ আয়োজন সম্পর্কে দেশ রূপান্তরকে বলেন, “ভাষাসৈনিক ও স্বাধীনতাসংগ্রামী শিল্পী ইমদাদ হোসেন সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে আজীবন সংগ্রামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি দেশে লোকশিল্প ও সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের কারণেই মঙ্গল শোভাযাত্রা গবেষণা ও প্রসার কেন্দ্র তার জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করছে।”
তিনি আরও জানান, শনিবার সন্ধ্যার এ আয়োজনে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ড. শামসুজ্জামান খান, বরেণ্য চিত্রশিল্পী অধ্যাপক রফিকুন নবী, নাট্যজন মাসুদ আলী খান ও অভিনেতা কেরামত মাওলা সহ অন্যান্যরা কথা বলবেন। একই সঙ্গে ইমদাদ হোসেনের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণাকারী অধ্যাপক মামুন কায়সার আলোকপাত করবেন শিল্পীকে নিয়ে।
ইমদাদ হোসেন ১৯২৬ সালের ২১ নভেম্বর চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মজিদ বক্স, মাতা সাবেদুন নেসা। চাঁদপুরে জন্মালেও তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকার কেরানীগঞ্জে রোহিতপুরের পৈতৃক বাড়িতে। স্কুলের লেখাপড়াও সেখানেই। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে শিল্পী জয়নুল আবেদিন ঢাকায় আর্ট স্কুল (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করলে সেখানকার প্রথম ব্যাচে ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন ইমদাদ হোসেন।
১৯৫০ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে চারুকলার ছাত্র ইমদাদ হোসেন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে কেরানীগঞ্জে দাঙ্গা প্রতিরোধে অনন্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ইমদাদ হোসেন ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বায়ান্নের ২০ ফেব্রুয়ারি সারা রাত তিনি সংগ্রাম পরিষদের কার্যালয়ে থেকে পোস্টার-ব্যানার লেখার কাজ করে পরদিন সমাবেশে অংশ নেন। ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ রফিকের রক্তমাখা শার্ট হাতে নিয়ে শিল্পীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন তিনি।
ভাষা আন্দোলনের পরও নানা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ চালিয়ে যান তিনি। ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই শিল্পী ইমদাদ হোসেন ছিলেন সংগঠনটির একজন সক্রিয় সদস্য। ১৯৬৯ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে তুমুল ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে শিল্পী কামরুল হাসানকে সভাপতি এবং শিল্পী ইমদাদ হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় ‘চারু শিল্পী সংস্থা’।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কেরানীগঞ্জে তার বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল। ইমদাদ হোসেন নিজে সরাসরি বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না হলেও বাম রাজনীতিকদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল ঘনিষ্ঠ। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে তার বাড়িতে পার্টির গোপন সভা হতো এবং আত্মগোপনকারী নেতারা তার ঢাকার ভাড়া বাসায় বা গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিতেন।
১৯৬০ সালে ইস্ট পাকিস্তান ডিজাইন সেন্টারে নকশাবিদ হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন এই কর্মবীর। পরের বছরই শিল্প নির্দেশক হিসেবে যোগ দেন ‘ইউএসএআইডি মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন সেন্টার’-এ। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতায় যোগ দেন তিনি। ১৯৬৬ সালে নকশাবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান টেলিভিশন ঢাকা কেন্দ্রে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোগো নকশা করেন শিল্পী ইমদাদ হোসেন। ১৯৭৬ সালে প্রধান নকশাবিদ হিসেবে অবসর নেন বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে। ১৯৭৬ সালেই যোগ দেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন ‘বিসিক’-এ। বিসিকে কাজ করার সময় তিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প মেলাকে শহরাঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ঢাকায় বৈশাখী মেলা, বসন্ত মেলা ও যশোরে মধুমেলার আয়োজন করেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের থেকে তাঁতিদের বাঁচাতে বিসিকের উদ্যোগে তাঁতবস্ত্রের মেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজনের উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালে সংস্থাটির প্রধান নকশাবিদ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। পরে তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কালার স্ক্যান লিমিটেডের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।
শিল্পী ইমদাদ হোসেন সারা জীবনই যুক্ত ছিলেন সৃষ্টিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। স্বাধীনতার পর ভাষা আন্দোলনের স্মারক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগে ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৭৪ সালে শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভের পেছনে বিশালাকৃতির লাল সূর্যটি যোগ করা হয় এই ভাষা সৈনিকের প্রস্তাব ও নকশা অনুসারেই।
আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শেষদিকে তৎকালীন চারুকলা ইনস্টিটিউটের সাবেক ও তৎকালীন শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের উদ্যোগে পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষের র্যালি শুরুর সময়েও অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন প্রবীণ এই শিল্পী। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া এ আয়োজনের প্রথমে নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। ১৯৯০ সালে শিল্পী ইমদাদ হোসেন বর্ষবরণের অভিনব এ আয়োজনের নামকরণ করেন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গঠিত গণ-আদালত এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সামাজিক আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
ইমদাদ হোসেন ১৯৫৪ সালের ২১ নভেম্বর বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম মনোয়ারা বেগম বকুলি। চার ছেলে ও দুই মেয়ের জনক এই শিল্পী নিজের পরিবারকেও গড়ে তুলেছেন যথার্থই শিল্পী পরিবার হিসেবে। তার তিন ছেলেই চারুকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণকারী শিল্পী। মেজ ছেলে শিল্পী নিসার হোসেন বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের অধ্যাপক এবং ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিল্পী ইমদাদ হোসেন চারুশিল্পে বিশেষ অবদান রাখায় ২০১০ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো, দৈনিক জনকণ্ঠ আজীবন সম্মাননা, চারুশিল্পী সংসদের সম্মাননাসহ বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন।
শিল্পী ইমদাদ হোসেনের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন
৩০ নভেম্বর ২০১৯, শনিবার, সন্ধ্যা ৫টা
গ্যালারি চিত্রক, বাড়ি নম্বর: ৪, রোড নম্বর: ৬, ধানমণ্ডি, ঢাকা
আয়োজনে: মঙ্গল শোভাযাত্রা গবেষণা ও প্রসার কেন্দ্র।
