গাইবান্ধা জেলা কারাগারে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের রাখার জন্য নেই কোনো কনডেম সেল। এ পরিস্থিতিতে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৬ জনকে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে একই সেলে রাখা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রায় ঘোষণার পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর থেকে গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত তারা সাধারণ সেলেই ছিলেন।
এদিকে লিটন হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড পাওয়া সাবেক সাংসদ কর্নেল (অব.) আবদুল কাদের খানসহ মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৬ জনের সঙ্গে গতকাল পর্যন্ত কোনো স্বজন কারাগারে দেখা করতে যাননি বলে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেলা কারাগারের জেলার আবু নূর মো. রেজা দেশ রূপান্তরকে গতকাল বিকেলে বলেন, ‘কনডেম সেল ২৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকে এবং সাধারণ সেলের বন্দিদের হাঁটা-চলাফেরার জন্য আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। পার্থক্য শুধু এটাই। আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এসব আসামিকে কোথায় পাঠানো হবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় তাদের সাধারণ সেলেই রাখা হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত পেলে তাদের অন্য কোথাও পাঠানো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রায় ঘোষণা শেষে কারাগারে পৌঁছার পর এবং শুক্রবারও আসামিদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা বেশিরভাগ সময়ই নিশ্চুপ থাকেন। মাঝেমধ্যে কান্নাকাটি করেন। আজ বিকেল (গতকাল) পর্যন্ত কেউ আসামিদের সঙ্গে দেখা করতে আসেনি।’
এদিকে গাইবান্ধা জেলা কারাগারে কোনো ফাঁসির মঞ্চ নেই বলেও জানা গেছে। এ ব্যাপারে জেলার আবু নূর মো. রেজা বলেন, ‘এই মামলার আসামিপক্ষ যদি হাইকোর্টে আপিল করেন তারপরও যদি মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকে, তাহলে সেই রায় কার্যকরের সুযোগ গাইবান্ধা জেলা কারাগারে নেই। কেননা এখানে কোনো ফাঁসির মঞ্চ নেই। কোথায় এই রায় কার্যকর করা হবে তা সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ সিদ্ধান্ত নেবে।’
জেলা কারাগারে বন্দি থাকা মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৬ আসামি হলেন সুন্দরগঞ্জ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক সাংসদ কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খান, গৃহকর্মী রাশেদুল ইসলাম ওরফে মেহেদী হাসান, শাহীন মিয়া ওরফে শান্ত, আনোয়ারুল ইসলাম ওরফে রানা, গাড়িচালক মো. আবদুল হান্নান, আবদুল কাদের খানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) এ জে এম শামসুজ্জোহা ওরফে জোহা। এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামি চন্দন কুমার রায় বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। বৃহস্পতিবার গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক দিলীপ কুমার ভৌমিক সাংসদ মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যা মামলায় এই ৭ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।
এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. শফিকুল ইসলাম শফিক গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গাইবান্ধা জেলা কারাগারে কনডেম সেল না থাকায় দু-এক দিনের মধ্যেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এসব আসামিকে রংপুর কারাগারে পাঠানো হবে। তাদের রায় কার্যকর করা হবে ঢাকায়। পরে আসামিদের সেখানে পাঠানো হবে।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী মঞ্জুর মোর্শেদ বাবু বলেন, ‘রবিবার সকালে গাইবান্ধা আদালত থেকে রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খানের পক্ষে হাইকোর্টে আপিল করার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। অন্য আসামিদের হাইকোর্টে আপিল করার আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তারা জেল আপিল করবেন। এ বিষয়ে রবিবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
রায় ঘোষণার সময় আবদুল কাদের খানের স্ত্রী আদালতে ছিলেন না। তিনি আজ শনিবার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে যাবেন বলেও জানান এই আইনজীবী।
২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নের উত্তর সাহাবাজ মাস্টারপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে তিন দুর্বৃত্তের হাতে গুলিবিদ্ধ হন তৎকালীন সাংসদ মনজুরুল ইসলাম লিটন। পরে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাতেই চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন ১ জানুয়ারি মনজুরুল ইসলাম লিটনের ছোট বোন ফাহমিদা বুলবুল কাকলী বাদী হয়ে ৪ থেকে ৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ২০১৬ সালের ২ ডিসেম্বর উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের দক্ষিণ ধোপাডাঙ্গা গ্রামে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ফেলে যাওয়া পিস্তলের একটি ম্যাগাজিনের সূত্র ধরে হত্যার রহস্য উন্মোচন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই হত্যা মামলার তদন্তে জাতীয় পার্টির (জাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান ও একই আসনের সাবেক সাংসদ কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খানকে মূল হোতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খানসহ ৬ আসামিকে।
