একজন ছাত্র ফাস্টফুডের দোকান দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা পৃথিবীতে। নিজেই বাবুর্চি, কর্মচারীর মতো খাটেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র মনু মোহন বাপ্পার এখন দুটি দোকান। লিখেছেন শাহীন আলম। ছবি তুলেছেন আসিফ আহমেদ দিগন্ত
এই বছরের বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের কথা। ১৪ এপ্রিল বিকেলে কয়েক বন্ধু মিলে ঘুরতে গেলাম পশ্চিম পাড়াতে। সেখানেই আছে বেগম খালেদা জিয়া হল। মেয়েরা থাকে। আমাদেরই ক্যাম্পাস। পড়ি সবাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। হলের সামনে গিয়ে দেখি এক খাবারের দোকান। ক্যাম্পাসে তো এ ধরনের খাবারের দোকান তেমন চোখে পড়ে না। দোকানে ফাস্টফুড (খাদ্য বিজ্ঞানে এই ধরনের খাবার সেগুলোই– যেগুলো বাণিজ্যিকভাবে আবার সেখানে তৈরির উপযোগী, গণমানুষ খান) বিক্রি হচ্ছে। আগ্রহে তাই এগিয়ে গেলাম। দূর থেকে দোকানিকে দেখে কেমন যেন পরিচিত লাগছে। আশ্চর্য তো এক ছাত্র দোকানে খাবার বিক্রি করছে, তাও আবার বাংলাদেশে; মানসম্মান ফেলে নিজের ক্যাম্পাসে! কাছে গেলাম তাই দ্রুত। দেখলাম তিনি আমাদের বাপ্পাদা– মনু মোহন বাপ্পা। চারুকলা বিভাগের ২০১৪-’১৫ শিক্ষাবর্ষের একজন ছাত্র। ভাই করছেন কী? হেসে ফেললেন, ‘আর বলিস না, পড়ালেখা করতে করতে স্বাবলম্বী হতে চাই। তাই দোকানদারিতে নেমেছি।’ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় পড়ি, ফলে কৌতূহলী মন নেচে উঠল– ‘দারুণ এক লেখা হবে। আলাপ করতে হবে ভাই।’
‘বস আগে খেয়ে নে।’ খুব মজার, খেতে খেতেই গল্প হলো– ‘বছর তিন আগের কথা, ২০১৬ সাল। অন্যদের মতো টিউশনি করি আমি। আঁকা শেখাই না, চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী পড়াই। কুষ্টিয়াতে একজন দিদির বিয়ে। খুব করে ধরেছে, যেতেই হবে। ঘুরতে তো আমারও ভালো লাগে খুব; আঁকার ক্যানভাস মনে জমে। ফলে ছুটি চাইলাম। বিধি বাম। ছাত্রের মা কঠিন স্বরে বললেন, আমার ছেলের ১৫ দিন পরে পরীক্ষা; আর আপনি কিনা ছুটি চাইছেন? কোন আক্কেলে? কিন্তু মনকে ঠেকাবে কে? ফলে দিলাম ছেড়ে। আমার আর কতই বা খরচ, ছাত্র মানুষ। চলেফিরে খেতে পারব। এটা সেটা কিনতে পারি না, তাতে তো আর বন্ধুদের জীবন থেমে থাকে না। আবার কুষ্টিয়া ঘোরা হয়েছে, বিয়ে খেতে পেরেছি দিদির। মনটাও ভালো। পরে মনে হলো– এবার নিজে কিছু করতে হবে। অন্যের কথা আর শুনব না। ছবি আঁকতে বসে যাই যেখানে-সেখানে; গল্প, আড্ডা জমে ক্যাম্পাসের যেকোনো কোণে; ফলে শুরু করে দিলাম।’
টি-শার্টে বেড়াই সবাই। চকচকে, বাহারি টি-শার্ট দেখলেই ছেলেমেয়েরা লাফিয়ে পড়বেন। আর আমারও রং বিলক্ষণ চেনা; ফলে গায়ে ফুঁ দিয়ে সামান্য সম্বল নিয়ে টি-শার্টের ব্যবসাই শুরু করে দিলাম। শিল্পীর রাগ থাকতে নেই, লোভও। ফলে ক্যাম্পাসে কোনো অনুষ্ঠান হবে জানলেই স্যারদের সঙ্গে দেখা করি। স্যার আমার টি-শার্ট সরবরাহের ব্যবসা আছে। নেবেন? যত পিস লাগে দিতে পারব। আচ্ছা, মুখের দিকে তাকিয়ে আর মানা করতে পারেন না কোনো শিক্ষক। অমুক দিন আসো–বলে অভয় দেন। বন্ধুরাও অনেকগুলো কাজ এনে দিয়েছে। খুব করেছে তখন এবং এখনো– না বললে অন্যায় হবে। অল্প কটি টাকা মোটে, ফলে গায়ের খাটুনিই সম্বল; রাজশাহী শহর ঘুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জও গিয়েছি; ঢাকায় তো যেতেই হয়েছে।
একটি কাজে কোনোদিন ফাঁকি দিইনি– সময় মতো আমার অর্ডার মিস হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজের সততার সুনাম রাখতে পেরেছি বলে এখনো ভালো লাগে। কাজ এলে করেছি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানগুলোতে। পুরনো ছাত্রছাত্রীরা টি-শার্ট পরেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় লেখা ও লোগো রেখে, বিভাগের নাম বুকে নিয়ে ঘুরতে খুব ভালোবাসেন। এ তো তাদেরও ক্যাম্পাস। ফলে কাজ করেছি মন দিয়ে। এখনো আছে আমার টি-শার্টের ব্যবসা। সেই থেকে ধীরে ধীরে আজকের পুঁজি, অবস্থান। তাই ছাড়তে পারিনি, ক্যাম্পাসের সঙ্গ কে না চায়! তবে বিক্রি কমেছে আগের চেয়ে। জুনিয়ররা এসেছে, আমিও অন্য দিকে বেশি ছড়িয়েছি বলে। শিক্ষকদের বরাবরের আপ্তবাক্য ছিল, এখনো আছে, যাই করো মন দিয়ে করো। আর লেখাপড়ায় ভালো করতেই হবে। সে কথা মানি। শিল্পীর সৃজনশীলতা ছড়িয়েছে আমার সব কাজে। পহেলা বৈশাখ কী পহেলা ফাল্গুনে প্যারিস রোড, ক্যাম্পাসের প্রতিটি মোড় থাকে জমজমাট। তখন বাপ্পার ডিজাইনে ছেলেমেয়েরা দারুণ ফুর্তিতে রাজশাহী দাপিয়ে বেড়ায়। ডিজাইন খুব ভালো হয়। তারা বলেন, আমি বিশ্বাস করি। ঈদে, পূজাতে অনেক ছাত্রছাত্রী এমনকি শিক্ষকরাও তাদের প্রিয়জনের, বাড়িতে ছোটদের জন্য টি-শার্ট অর্ডার দিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এ মোর অক্ষয় স্মৃতি। তারাই আমাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন সারা দেশে।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, নওগাঁর সরকারি কলেজ মেয়েদের কলেজগুলো আর মেডিকেল কলেজগুলোতে কয়েক বছর চলেছে আমার পোশাক। অনেক অর্ডার এসেছে; বিক্রি, পুঁজি জমেছে। বন্ধুরা এই তোর টি-শার্ট দে তো– বলে যেমন দেদার পরেছে, তেমনি উৎসাহ দিয়েছে ব্যবসা ছাড়িস না, এখন চা খাওয়া। মনে মনে খুশি হয়েছি। খাইয়েছিও। অনেকে লেখাপড়ায় মন দিতে অনুরোধ করেছে– অল্প কটি টাকার জন্য এসব কী করছিস। কেনার পর টাকা দিতে গড়িমসি করলে তাগাদা দিতে হয়েছে, ছাত্রদের তো আবার পয়সা থাকে না। ফলে উল্টো শুনতে হয়েছে, কী রে, অন্যদের মতো পাকা ব্যবসায়ী হলি কেন? পরে অবশ্য শোধ করেছে সব।
একবার লম্বা এক বন্ধে চলে গেলাম বাড়িতে। আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ। আমের রাজধানী। বাড়ির বাজারে একটি ফাস্টফুডের দোকান দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। আরে লোকটি তো ভয়ংকর স্মার্ট, আগামী দিনের ব্যবসা ফেঁদেছেন এখানে। পরে ভালো করে ভাবলাম। ব্যবসা হবে, কাজের ব্যবস্থা হবে লোকের; আমারও ঠিকানা গাড়বে। ফলে ক্যাম্পাসেই খাবারের দোকান করব বলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলো না। আর কে না জানে, এমন দোকানের বিক্রি হবে বেশ। গল্প জমবে ছাত্রছাত্রীদের। সঞ্জয়ের কাছে খুব ঋণী। সে তার স্পেশাল ফাস্টফুডের দোকানটি আমাকে ভাড়া দিয়েছিল। প্রতিদিন ২শ হিসেবে মাসে ছয় হাজার চুক্তিতে নেমে পড়লাম। আছে আমার বার্গার, স্যান্ডউইচ, চিকেন রোল, চিকেন বার্গার। ফলে জমতে সময় লাগল না। বিক্রি করি, নিজে খাবার বানাই, আবার দোকান চালাই। কিন্তু লাভ থাকে না। আয়ের পয়সা, ব্যয়েই প্রায় শেষ। তবে চাহিদা বেশ। ফলে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। সেই ভাইটিকে কোনোদিন ভুলব না, নামটি বলতে মানা; নয়তো বলেই দিতাম; একসঙ্গে নিজের পুরো ৩৫ হাজার জমানো সব দিয়ে দিলেন– ‘নে বাপ্পা ব্যবসা কর। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হ।’ নিজে ডিজাইন করে, কাঠ কিনে, মিস্ত্রি দিয়ে দোকান তৈরি করলাম। গায়ে খেটেছি সেখানেও। পরে যখন পথে নামল আমার এই ফুডকোর্ট–পরিচিতরাই অবাক! চারুকলার ছেলে, মেয়েদের চক্ষু চড়কগাছ। ওই টাকাতে আবার একটি গ্যাস সিলিন্ডারও কিনতে হয়েছে, খাবার তৈরির অনেক উপকরণও লেগেছে। এই দোকানটিই এখন আছে। এক বছর বয়স প্রায়। আমি তো বটেই, আরও দুটি মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস আমার এই রোজগারের সম্বল। বাড়িতে হাত পাতি না, অলস বসে থাকি না; নিজে ব্যবসা করি ও ব্যবসা শিখি। মানব জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা হয়। খাবার সম্পর্কে আমার আগ্রহ অনেক বেড়েছে কাজের সূত্রে। তবে ব্যস্ততা অনেক। সেই ভোরে ক্লাস ধরতে ছুটে যাই। বেলা পর্যন্ত ক্লাস সেরে হলে ফিরে খেয়ে, সামান্য বিশ্রামের পর চারটা থেকে টানা খাটুনি। রাত ৮টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ব্যবসা করি। একমাত্র পরীক্ষার আগের দুদিন দোকান সামলায় বিশ্বস্ত কর্মচারীরা। অন্যদের চেয়ে আমার খাবারের মান ভালো, দামও কম। শুরু থেকেই চেয়েছি, আমার মতো ছাত্রছাত্রীরা যেন কম দামে, ভালো মানের খাবার খেতে পারেন। আমরা নিজেরাই তৈরি করি। আমিও পাচক, সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ী। উদ্যোক্তার নতুন এই জীবন খুব ভালো লাগে। আবার অনেকের বাহবা কুড়িয়েছি– রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্র দোকানদার বাপ্পাদা। ফলে অনেক ছাত্রছাত্রীর সাহসের উৎস হয়েছি। জীবনকে অন্যভাবে দেখার হাতিয়ার ও প্রেরণা হয়েছি। তাদের সবার ভালোবাসায় আমি ভালো আছি।
খাবারের উপকরণের দাম ওঠানামা করে। আবার আগের ধারদেনা শোধ করতে হয়েছে, নতুন ব্যবসা শিখতে সময় লেগেছে– ফলে পুরোপুরি সার্থক বলতে পারি না এখনো। তবে হয়ে যাব কয়েক মাসেই। বিশ্বাস জুগিয়েছে রাজশাহীর এই প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। নাম ছড়িয়েছে ছাত্র-শিক্ষকের কল্যাণে। এখন প্রতিদিন বিক্রি হয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। কর্মচারীর খরচ, অন্যসব প্রয়োজনীয় খরচ বাদে আমার দিনে গড়ে ৪. ৫শ আয়। মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার রোজগার বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীর জন্যই অনেক। তাই পেছন ফিরে আর তাকাই না। নতুন খাদ্যও যোগ করতে হয়েছে ক্রেতাদের রুচি, চাহিদা ও পছন্দ মেনে। পাকা ব্যবসায়ীর মতো চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, শাসলিক (এটি হলো ঘন মাংসের পোড়ানো পদ) যোগ করেছি। আগের চেয়েও বেশি আসছেন ছাত্রছাত্রীরা। তাদের উৎসাহে, ভালোবাসায় ও খাবার খাওয়ার দৌলতে শহরের আলুপট্টির মোড়ে আরও একটি ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে আমার। সেখানেও কর্মচারী, বাবুর্চি রাখতে হয়েছে। মনে মনে হেসে বলছি, একা আর কত সামলাব। সামনের বিজয়ের মাসে আরও একটি দোকান হবে খাবারের আমার নিজের।
আমার দেশে আয়ের ব্যবস্থা করছি, ভালো খাবার ছড়িয়ে চলেছি–এই হলো শান্তি। আর ছাত্রজীবনের চাকরির মালিক, অবিশ্বাস্য এই অনুভূতি খুব আনন্দ দেয়। চাকরির পেছনে ছোটা ছাত্রছাত্রীর দল আমার কাছ থেকে নিজেরা ব্যবসার বুদ্ধি নেয়। অনেক তো আছে। ফলে অভিজ্ঞতা থেকে উপায় বাতলাতে সমস্যা হয় না কোনো। লেখাপড়াও শেষ করব।
আরও কিছু জমিয়ে বড় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যাকে বলে রেস্তোরাঁ দেব। সরকারি বা বেসরকারি ঋণ আমার জীবন গড়ায় সহায় হবে। চেষ্টা করছি। ফলে পরিশ্রম কমবে।’ এবার আমাদের চোখ কপালে ওঠার পালা!
