চারটি বিভাগে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় আসরে চ্যাম্পিয়ন করলেন। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়ার অনেক শাখায় অসাধারণ সাফল্যের নায়ক হাবিব উদ্দিনের কথা জেনেছেন রানা মিত্র
খেলাই আমাকে গড়ে দিয়েছে। খেলোয়াড় কোটাতে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ হয়েছে। এইচএসসি একবার ফেল, পরের বার টেনেটুনে পাস। এরপর ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চলে এলাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়াতে। পড়ার বিষয় কিন্তু খুব ভালো– ‘লোক প্রশাসন’। বিরাট মাঠ, খেলার নানা উপকরণ আর শেখ মুস্তাফিজুর রহমান স্যারের হাত ধরে গড়ে ওঠা হলো আমার। স্যারের ভালোবাসার কথা কোনোদিনও ভুলব না। কী করেননি আমার জন্য? টানা পাঁচটি বছর আমাদের ইসলামী ইউনিভার্সিটি ক্রিকেট দল, কুষ্টিয়ার হয়ে বিভিন্ন আসরে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের মাঠে খেলেছি। ফুটবল খেলেছি অনেক। ম্যাচসেরা হয়েছি, দল কীভাবে খেলাতে হয়, নিজে ভালো খেলতে হয়, ম্যাচ বঁাচাতে হয় দারুণভাবে শেখা হলো। ভালো করেছি খুব, খারাপও। তবে আগামীর পাথেয় হয়েছে সব। এখন বুঝি।
আগামীতে কী করে খাব– সেজন্য বুদ্ধি করে ২০০৭ ও ’০৯ সালে ‘পে অ্যান্ড সার্ভিস’ নামের লিগে খেলতে গেলাম। ভালো খেলোয়াড় বলে লুফে নিলেন তারা। শেখা হলো, খেলাও পেশা হয়। এরপর ২০০৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি দিল। পাস করার পর কী করব_মাস্টার্সের ভালো বিষয়ের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট আছে; কিন্তু খেলা ছাড়া তো আর কিছু শিখতে ভালো লাগে না। পারিও না ভালো করে। মন বসে না। তখন খেলাকেই অবলম্বন করলাম। হতে হবে কোচ–জীবন জানাল। ২০০৯ সালে ঢাকায় চলে এলাম। মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজ থেকে বিপিএড (ব্যাচেলর অব ফিজিক্যাল এডুকেশন)’র অনার্স ও আর বেসরকারি উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএড (মাস্টার্স অব ফিজিক্যাল এডুকেশন) ডিগ্রি নেওয়া হলো। ক্রীড়া লেখাপড়া, খেলোয়াড়ের অভিজ্ঞতা–জীবনের ঠিকানা দিল গড়ে। ২০১২ সালেই ঢাকার সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বারিধারা শাখাতে ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলাম পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে। মেয়েদের খেলা শেখানো, শিশু থেকে কিশোরদের খেলার ভুবনে আনা, গড়ে দেওয়া ও তাদের আগ্রহকে বিকশিত করার পাঠ নেওয়া হলো হাতে-কলমে। সেই অভিজ্ঞতা সারা জীবন কাজে লাগছে।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের সুযোগ হলো সেই বছরেই। চলে এলাম তাই ভালো বেতন ও বিরাট জায়গাতে কাজের অনুপ্রেরণাতে। বিজ্ঞাপনেই যোগ দিলাম মনোনীত হওয়ার পর বছরের ১৬ জুন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে। আগেই জানতাম, তারাও খেলাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। বিরাট খেলার মাঠের ভালোবাসায় পড়লাম। ফিরে এলো শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্য। এই মাঠ আমার প্রথম বন্ধু হয়ে আছে। জায়গা না থাকলে ছেলে-মেয়েরা খেলবে কোথায়? শিখবে কীভাবে? তবে আরেকটি মাঠ পড়ে আছে অবহেলায়, নামা যায় না খেলার জন্য। সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দেলোয়ার হোসেন স্যারের সাহায্যে তৈরি হলো।
এবার গড়ব দল। এই ক্যাম্পাসের ছেলে-মেয়েরা খেলা পাগল। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসে বলে খেলা তাদের প্রাণে বাঁধা। তবে খেলায় তাদের আনতে বেগ পেতে হলো। কারণ মাঠে নয়, তারা বেড়ায় এখানে, সেখানে। আড্ডায় পড়ে থাকে। চায়ের দোকানে ঠিকানা গাড়ে। খুঁজে খুঁজে ভালো খেলোয়াড় নিয়ে আসতে হলো। ছেলে-মেয়েদের খেলার জন্য ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে বলতে হলো। কাজটি করতে খুব ভালো লেগেছে। আমিই তো কোচ– কে করবেন আমার কাজ? এরপর ওরা আসতে থাকল, আজও চলছে সেই ধারা। হয়ে গেল তাদের মাধ্যমে আমাদের গণ বিশ্ববিদ্যালয় খেলার ভুবন। আর আমাকে পায় কে? আমি তাদের আগে মাঠে বসে থাকি, বিকেলের আলো গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেট ব্যাট-বল ও ফুটবল নিয়ে চলে আসি। আমার দুয়ার সবার জন্য খোলা–সারা জীবন। এসো খেলো, শেখো; বড় হও। মেয়েরা খেলায় চলে এলো ভালো করে। গ্রামের মেয়ে, লম্বা-চওড়া; খেলার নেশা আছে; জীবনটিও সরল পথে, সাধারণ স্বাভাবিক, মনোযোগ দিয়ে ভাবে। ফলে তাদের গড়তে সময় লাগল না। যা শেখাই শিখে ফেলে। খেলতে, খেলতেই খেলা শিখেছে ওরা আমার সঙ্গে। তাদের আচরণ, মানবিক, ভালো ব্যবহারের মানুষ; অন্য দলের খেলোয়াড়দের সম্মান করা এবং খেলা ছাড়া অন্যকিছুকে মাঠে না নিয়ে আসা; জীবনের সঙ্গে না বাঁধা–এসবই বেশি করে শিখিয়ে চলেছি। তাতে ভালো খেলোয়াড় হয়েছে তারা সবচেয়ে ভালোভাবে। কারণ খেলোয়াড় তো পূর্ণ বিষয়, সবের সম্মিলন। তাদের শেখাতে, শেখাতে গড়ে উঠল আমার ভালো খেলোয়াড়ের দল। একটি বছর পর ২০১৩ সালে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতা শুরু হলো। সব বিভাগের ছেলেমেয়েরা সব ধরনের খেলা শুরু করল। পরে এলো ফুটবল। ২০১৪ সাল থেকে ক্রিকেট এলো। সবগুলো খেলায় খেলোয়াড় তৈরিতে কাজ করেছি। ফলে ভালো খেলোয়াড় তৈরি হতে লাগল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্ষেত্রে। তাদের মধ্যে ক্রিকেট দল নিয়ে ২০১৫ সালে আমরা গেলাম ক্লেমন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ইনডোর ক্রিকেট টুর্নামেন্টে। এই আমার প্রথম পরীক্ষা। চারটি খেলার দুটিতে আমরা জয়ী, প্রথম রাউন্ড পেরুতে না পারলেও এই হলো আমাদের দারুণ অর্জন। ফলে ফিরে এসে নবউৎসাহে নেমে গেলাম সবাই। তারপর থেকে আমরা কোনোবার কোয়ার্টার ফাইনালের নিচে নামিনি। ভালো দল হিসেবে সম্মান পাই সবার কাছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আসরেও যাই। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতা খেলি। ২০১৮ সালে সেরা সাফল্য পেলাম আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয়ে আইইউবি (ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ)’র কাছে একেবারে অল্প রানের ব্যবধানে সেমিফাইনালে হারার মাধ্যমে। না হলে আমরা চ্যাম্পিয়নই হতাম। এভাবে ধারাবাহিক ভালো খেলা, নিয়মিত অনুশীলন, খেলাকে গুরুত্ব দেওয়া, খেলোয়াড়দের নানা সমস্যার সমাধান, তাদের প্রচেষ্টা ও আমার আন্তরিকতায় এখন আমরা গণ বিশ্ববিদ্যালয় নামকরা দল। ২০১৮ সালেই বঙ্গবন্ধু আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতাতে আমরা ছিলাম ছয়টি বিভাগে– ছেলে ও মেয়েদের ফুটবল, মেয়েদের ক্রিকেট, ছেলেদের ভলিবল, মেয়েদের হ্যান্ডবল আর ছেলেদের ব্যাডমিন্টনে। আলাদা আলাদা কোচ, ভালো খেলোয়াড় আছে সবগুলো দলেই। মেয়েদের ক্রিকেটে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ও জাতীয় দলের খেলোয়াড় সাবিনা আক্তার আমার ছাত্রী, এই দলেরই খেলোয়াড়। সে আমাদের অন্যতম সেরা শক্তি। বঙ্গবন্ধু আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয়ের আসরে নারী ক্রিকেট, পুরুষ ক্রিকেট, নারী হ্যান্ডবল, পুরুষ বাস্কেটবল–এই চার চারটি আলাদা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবাই চমকে দিয়েছি আমরা। গণ বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। এই অসাধারণ অর্জন খেলোয়াড়দের অবিশ্বাস্য পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার ফলাফল। তাদের প্রেরণার জন্য ধন্যবাদ দিই আমাদের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. লায়লা পারভীন বানু ও রেজিস্ট্রার দেলোয়ার হোসেনকে আলাদা করে। অন্য সবাই খুব করেছেন। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ মানুষও খেলোয়াড়দের পাশে থেকেছেন সব আগ্রহ নিয়ে। আসরের আগে থেকে তারা আমাদের প্রশিক্ষণের দিনগুলো থেকে খেলোয়াড়দের দুপুরের ভালো লাঞ্চ, ভালো উপকরণসহ– সব ধরনের সাহায্য করেছেন। তাদের নিয়ে অসাধারণ শ্রম দিয়েছি। নিজে পরিশ্রম করেছি, তাদের পরিশ্রম করতে বাধ্য করেছি; বারবার একটি কথাই বলেছি– ‘সেরা চেষ্টা করো, সাফল্য আসবেই।’
দলগুলো আমার হাতে গড়া, কোনো ধরনের সামান্য বাধাও পাইনি। নিয়মিত আন্তঃবিভাগের খেলার আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় আমার জন্য সামর্থ্যের সবটুকু করেছেন। সে সবের ফলাফল পেয়েছি আমরা।টানা পাঁচটি বছর এই অসাধারণ সাফল্যের জন্য প্রাণপণে, পুরো প্রচেষ্টা দিয়ে কাজ করেছি আমি। ফলে সাফল্য আমাকে ছাত্র-ছাত্রীদের মতোই খুশিতে ভাসিয়েছে। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী কোচ সোহেল খান আছেন বলেই আমাদের এই অর্জন। আমার চেয়েও চেষ্টা এবং পরিশ্রম তার বেশি। এই অক্টোবরে আমরা ফায়াজ হোসেন গোল্ডকাপেও চ্যাম্পিয়ন। খেলেছি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল অ্যাস্ট্রোটার্ফে। ছেলেদের আগের শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণ এই অর্জন। এই দলগুলোই জাতীয় দলে খেলোয়াড় দেবে–আমি জানি।
×
