ব্যাংক চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বৈঠক

খেলাপি ঋণ ও সুদহার কমাতে কমিটি

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:১৫ এএম

উৎপাদনশীল খাতের ব্যাংকঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋণ কমাতে সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাবে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১ জানুয়ারি থেকে শিল্প খাতের সুদহার হ্রাস এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু হবে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম ফোনে এ তথ্য জাানিয়েছেন। 

কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামানকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম হোসেন, রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহাবুবুর রহমান, আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সরওয়ার ও এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মেহমুদ হোসেন।

সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে গতকাল বৈঠকে বসেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠকে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা ও  ব্যাংকঋণের সুদ হার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনতে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে অবহিত করা হয়। এর চার ঘণ্টার মধ্যেই কমিটির সদস্যদের নাম গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম।

বর্তমান সরকার টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগে সুদের হার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তবে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এর পেছনে খেলাপি ঋণকে দায়ী করে আসছিল ব্যাংকাররা। এই খেলাপি ঋণের হার ক্রমেই বাড়ছে, এর মধ্যেই উৎপাদনশীল খাতে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আর এটি কীভাবে করা যাবে, তা সেজন্যই এই কমিটি গঠন করল বাংলাদেশ ব্যাংক। গঠিত সাত সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি পরবর্তী সাত দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। সেই প্রতিবেদনের সুপারিশ জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। একই সঙ্গে তিনি ঋণখেলাপিদের সুযোগ দিয়ে তিনি কোনো অন্যায় ও অনৈতিক কিছু করেননি বলেও দাবি করেন। গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সম্মেলন কক্ষে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ নন-পারফর্মিং লোন বা ঋণখেলাপি। আমি বলেছিলাম ঋণখেলাপি আর ১ টাকাও বাড়বে না, সামনে ধীরে ধীরে এর হার কমবে। কিন্তু খেলাপি বাড়ছে। এর মূল কারণ সুদের হার। বাংলাদেশের মতো এত বেশি সুদ বিশ্বের আর কোথাও নেই।

অর্থমন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়ছে এটা সত্য, কিন্তু কেন বাড়ল এটা দেখতে হবে। সুদের হার বাড়লে খেলাপি ঋণ বাড়বেই। ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদহার হলে এটা দিয়ে ঋণ গ্রহীতারা কুলাতে পারে না। সুতরাং সুদহার ৯ শতাংশ হলে ঋণখেলাপি বাড়বে না। আশা করি ১০ বছর পরে ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার হবে।

সভায় আলোচনার বিষয় নিয়ে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, অর্থনীতির অন্যান্য জায়গায় ভালো করতে পারলেও একটি জায়গায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারিনি, সেটা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। এটি বাড়ার কারণ হলো সুদহার অনেক বেশি। আমাদের মতো এত ‘হাই ইন্টারেস্ট রেট’ পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই। ঋণখেলাপি কমাতে পৃথিবীর অন্য দেশের মতো সুদহার কমাতে হবে। আমরা সবাই বসেছিলাম কীভাবে সুদহার কমানো যায়, কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেবেশে আনা যায়। সবাই আমরা একবাক্যে স্বীকার করেছি যে, সুদহার কমাতেই হবে। সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে হবে। সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনলে ঋণখেলাপি অনেক কমে যাবে। বিদেশিরা ব্যবসা করে শান্তি পাবে, কোনো প্রশ্ন করবে না। বিদেশিরা আমাদের এলসিগুলো গ্রহণ করবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উৎপাদনশীল খাতে সিঙ্গেল জিডিটে সুদহার নিশ্চিত করতে পারলে শিল্পায়ন হবে।  কর্মসংস্থান বাড়বে। আমরা এ বিষয়টি এখন গুরুত্ব দিচ্ছি। পরবর্তী সময়ে অন্য খাতগুলো দেখা হবে। 

কমিটি গঠন প্রসঙ্গে মুস্তফা কামাল বলেন, সুদহার কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এই কমিটি গঠন করবেন। যারা প্রতিনিধিত্ব করবে ব্যাংককে, প্রতিনিধিত্ব করবে প্রাইভেট-পাবলিক খাতকে।  গঠিত ওই কমিটি খেলাপি ঋণের কারণ খুঁজে বের করে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেবে। আগামী সাত দিনের মধ্যেই তারা এই কাজ করবেন, প্রতিবেদন জমা দেবেন। প্রতিবেদনে কীভাবে আমরা সুদহার কমাব, এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য থাকবে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের সুদহার কমবে, পাশাপাশি খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়বে না।

পরে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির বলেন, কমিটি হবে ৭ সদস্যবিশিষ্ট। এই কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা থাকবেন। আজকের  (সোমবার) মধ্যেই নোটিস জারি হবে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে তারা প্রতিবেদন জমা দেবেন। তিনি বলেন, গঠিত কমিটির কাজ হবে, কিভাবে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা যায়, সে ব্যবস্থা করা। ব্যাংক মালিকরা ঋণের সুদহার এক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনতে গত বছরের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ওই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে ব্যাংক মালিকরা সরকারের কাছ থেকে একের পর এক সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু ঋণে সিঙ্গেল ডিজিট বা এক অঙ্কের সুদহার বাস্তবায়ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৬ মাসে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে সরকারি-বেসরকারি মিলে মাত্র ১১টি ব্যাংক। এখনো বেসরকারি খাতের ৩৭টি ব্যাংকের ঋণের সুদহার ১২-২০ শতাংশের ঘরে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত