বিদ্যুতের বিতরণ ব্যয় ২০২০ সালে ৪১ পয়সা বাড়িয়ে ১ টাকা ২৪ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), যার শতকরা হার ৪৯ শতাংশেরও বেশি। গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের টিসিবি অডিটরিয়ামে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ওপর গণশুনানিতে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বিতরণ ব্যয় ৮৩ পয়সা থেকে ৪ পয়সা বাড়িয়ে ৮৭ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। শুনানিতে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বালিশ ও পর্দাকাণ্ডের মতো বিদ্যুতের মিটারেও দুর্নীতি হচ্ছে।
ডিপিডিসির পক্ষে প্রস্তাব উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান। বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য মিজানুর রহমান, রহমান মুরশেদ ও মাহমুদ-উল হক ভূঁইয়া শুনানি পরিচালনা করেন। শুনানিতে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, সিপিবির সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, মুঠোফোন গ্রাহক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন ভোক্তা দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।
বিতরণ ব্যয় বাড়ানোর কারণ হিসেবে ডিপিডিসি জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় কিছুটা বৃদ্ধি বিবেচনা করা হয়েছে। বৈদেশিক ঋণ ও সরকার থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ায় ফিন্যান্সিং চার্জের পরিমাণ বাড়বে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। গ্রাহক সংখ্যা বাড়তে থাকায় নতুন কর্মচারী নিয়োগ এবং নতুন নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণের কারণে অপারেশন কস্ট বাড়বে বলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়, ২০২০ পঞ্জিকা বছরের জন্য রিটার্ন অন রেট বেজ বিবেচনায় বর্তমান খুচরা মূল্য সমন্বয় করে ৪২৭ দশমিক ৭৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব চাহিদা পূরণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে প্রিপেইড মিটারে ১ শতাংশ হারে রিবেট দেওয়ায় ৭ দশমিক ২২ কোটি টাকা আয় কম হচ্ছে। তাই এই হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ডিপিডিসির উপস্থাপনায় দেখানো হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিপিডিসির সিস্টেম লসের টার্গেট ৮ দশমিক ১ শতাংশের বিপরীতে ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ অর্জন করায় ৬১ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
বিইআরসির নিরীক্ষায় বলা হয়, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরে প্রাক্কলিত ব্যয়ের ভিত্তিতে বিতরণ ব্যয় প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২৪ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ১ টাকা ২ পয়সা। বিইআরসির কারিগরি কমিটির বিবেচনা হচ্ছে, রেট বেজের ওপর গড়ে ৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ রিটার্ন বিবেচনায় ২০২০ পঞ্জিকা বছরে ডিপিডিসির নিট বিতরণ রাজস্ব চাহিদা প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক ৮৭ পয়সা। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বরের দেওয়া মূল্যহার আদেশে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিতরণ ব্যয় ছিল প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক ৮৩ পয়সা। বিদ্যমান পাইকারি ও সঞ্চালন মূল্যহারের ভিত্তিতে ডিপিডিসি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এনার্জি রেট ছিল ৬ টাকা ৬৩ পয়সা। এছাড়া ভোক্তা নিরাপত্তা খাতের ৪৮৩ কোটি টাকা ও এর মুনাফার পৃথক হিসাব সংরক্ষণ করতে ডিপিডিসিকে নির্দেশ দিয়েছে বিইআরসি।
শুনানিতে দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘যে অবচয়ের কারণে খরচ বাড়ছে সেটা অনেকাংশে মিটারিং সিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা আগেও বলেছি এখনো বলছি মিটারের দাম নিয়ে বিইআরসিকে নজর দিতে। এখন ডাবল লাইনের যে সিস্টেম চালু করা হচ্ছে এটাও খরচ বৃদ্ধির কারণ। ডাবল লাইনের পরও মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।’
এ সময় দুই সিটি করপোরেশনের কাছে কত টাকা বকেয়া আছেÑ ক্যাবের উপদেষ্টার এ প্রশ্নের জবাবে ডিপিডিসি জানায়, উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছে ৬৪ কোটি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে ৯৪ কোটি টাকা বকেয়া আছে। বিপুল পরিমাণ বকেয়া থাকার পরও কেন লাইন কাটা হচ্ছে না, জানতে চাইলে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন্স) এ টি এম হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমরা দুই সিটি করপোরেশনকে বকেয়া পরিশোধের জন্য চিঠি দিয়েছি। ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে যদি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা না হয়, তাহলে আগামী জানুয়ারি মাসে সব বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হবে।’
