বিনিয়োগের নামে কালবের ৯৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৫:০৫ এএম

দি কো-অপারেটিভ ইউনিয়ন ক্রেডিট অব বাংলাদেশের (কালব) ৯৭ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অনুসন্ধানে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাল নথিপত্র তৈরি করে নাম ও প্যাডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে কালবের এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। ২০১৫ সালের পর প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও মহাব্যবস্থাপকসহ সাতজনের যোগসাজশে এ টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকা ও গাজীপুরের ১১টি ক্রেডিট ইউনিয়নের অংশগ্রহণে জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষ সংগঠন হিসেবে কালব প্রতিষ্ঠিত হয়। সমবায় সমিতি বিধিমালা অনুযায়ী পেশাভিত্তিক ২৯ প্রকারের সমিতির মধ্যে এ ক্রেডিট ইউনিয়নও এক প্রকার সমিতি। যার উদ্দেশ্য সদস্যদের যৌথ সঞ্চয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট তহবিল পুনরায় ঋণ ও সেবা দেওয়ার মাধ্যমে সদস্যদের মধ্যে বিনিয়োগ করা। কিন্তু সব নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে আরিয়ান কেমিক্যালস লিমিটেড নামে একটি নামসর্বস্ব ও সাজানো কোম্পানিকে ১৯টি চেকের মাধ্যমে ৯৭ কোটি টাকা দেয় কালব। আরিয়ান কেমিক্যালসের শেয়ার ক্রয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের নামে যে টাকা দেওয়া হয় তা কালবের নিজস্ব অর্থ ছিল না। সেটা নিট মুনাফার অংশও নয়; বরং কালবের সদস্যভুক্ত সাধারণ ক্রেডিট ইউনিয়নগুলোর সঞ্চয়ের টাকা ছিল। এই অর্থ কালবের বিধি অনুযায়ী সদস্যদের প্রয়োজনে ঋণ হিসেবে দেওয়ার কথা। এই অর্থ তারল্য সম্পদ হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংকে খোলা হিসেবে জমা রাখা হয় মাত্র। তাছাড়া আরিয়ান কেমিক্যালস নামক ওই প্রতিষ্ঠান স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশনের নিবন্ধনভুক্ত নয় বিধায় কালব তহবিলের কোনো অর্থই সেখানে বিনিয়োগের অবকাশ ছিল না।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরিয়ান কেমিক্যালসের শেয়ারে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির প্রোফাইল, ফান্ডামেন্টাল (মৌলভিত্তি), দায়-দেনা, আর্থিক প্রবৃদ্ধি, সম্পদের পরিমাণ, ব্যাংক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে সেটি দায়বদ্ধ রয়েছে কি না সেগুলো যাচাই করা হয়নি। সমিতির সাধারণ সদস্যদের জমা করার আমানতের টাকা সম্পূর্ণ বেআইনি ও বিধিবহির্ভূতভাবে এবং বোর্ডসভার অনুমতি ছাড়াই আরিয়ান কেমিক্যালসকে টাকা দেওয়া হয়। এ জালিয়াতির সময় কালবের চেয়ারম্যান ছিলেন সাইমন এ পেরেরা ও মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ছিলেন রতন এফ কস্তা। আরিয়ান কেমিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন ওমর শরীফ। তারা পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে এ টাকা আত্মসাৎ করেন।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কালবের তিনটি হিসাব থেকে আরিয়ান কেমিক্যালসের তিনটি ব্যাংক হিসাবে ৯৭ কোটি টাকা জমা হয়। পরে আরিয়ান কেমিক্যালস ওই অর্থ আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করেন

তৎকালীন চেয়ারম্যান সাইমন এ পেরেরা, তার ভাই মার্টিন সিলেভেস্টার পেরেরা, কালবের তৎকালীন জিএম রতন এফ কস্তাসহ অন্য হিসাবধারীরা। তারা যে একাধিক ট্রান্সফার ও নগদ উত্তোলনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করে পাচার করেন তার প্রমাণ মিলেছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ৯৭ কোটি টাকা আরিয়ান কেমিক্যালস লিমিটেডের হিসাব থেকে শহীদ ট্রেডিং করপোরেশন, মামুন এন্টারপ্রাইজ, হাসান ট্রেডিং করপোরেশন, আরিয়ান ট্রেডিং করপোরেশন ও স্বপ্নীল ট্রেডিং করপোরেশনের চলতি হিসাবে জমা করে তুলে নেওয়া হয়। উত্তরা ব্যাংকের মগবাজার শাখায় শহীদ ট্রেডিং করপোরেশন, মামুন এন্টারপ্রাইজ ও হাসান ট্রেডিং করপোরেশনের হিসাবগুলো একই দিন খোলা হয়েছিল। তিনটি হিসাবেরই শনাক্তকারী ছিলেন আরিয়ান কেমিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর শরীফ। প্রতিষ্ঠান তিনটির বর্ণিত মালিক ওই অর্থ আত্মসাতে সহায়তা করেছেন। ওই লেনদেন ছাড়া তাদের হিসাবে আর কোনো লেনদেন হয়নি। স্বপ্নীল ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মিচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পান্থপথ শাখায় ওই প্রতিষ্ঠানের দুটি চলতি হিসাব পাওয়া যায়। সেখানে আরিয়ান কেমিক্যালসের থেকে আসা টাকা ছাড়া তেমন কোনো লেনদেন পাওয়া যায়নি। এসব থেকেও জালিয়াতির বিষয়টি পরিষ্কার প্রমাণিত হয়।

এ অবস্থায় দুদকের অনুসন্ধান দল সাইমন এ পেরেরা, রতন এফ কস্তা, ওমর শরীফ, স্বপ্নীল ট্রেডিংয়ের মালিক জুবাইদুর রহমান, শহীদ ট্রেডিংয়ের মালিক গাজী শহীদ, হাসান ট্রেডিংয়ের মালিক হাসান মোড়ল ও মামুন এন্টারপ্রাইজের মালিক মাসুম বিল্লালের বিরুদ্ধে ৯৭ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলার সুপারিশ করে। কমিশন মামলার অনুমোদন দেওয়ার পর গতকাল সোমবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় (সজেকা) ঢাকা-১-এ মামলা করা হয়। মামলার বাদী দুদকের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ শিহাব ইসলাম। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে কালব ভবন, বাড়ি নং ৮, ব্লক-বি, স্কুল রোড, খিলবাড়ীর টেক, ভাটারা, গুলশান ঢাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত