কারাতের সোনালি দিন

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৩:২২ এএম

২০১০ সালে কারাতে ইভেন্টে ৪টি স্বর্ণপদক জিতে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছিল অন্তত এই দক্ষিণ এশিয়ায় তারা ফেলনা নয়। দেশের মাটিতে সেই স্বর্ণপদক নিয়ে বাইরের দেশগুলোতে অবশ্য একটা কানাঘুষাও ছিল। অনেক পক্ষপাতিত্বের কথাও পেছনে বলেছেন। সেগুলো অবশ্য ধোপে টেকেনি। তারপরও প্রশ্ন উঠেছিল বলেই তৃপ্তিতে ভেসে যেতে চাননি কারাতেকারা। চেয়েছিলেন দেশের বাইরে নিজেদের অন্যভাবে চেনাতে। ২০১৬ গৌহাটি-শিলং গেমসে কারাতে না থাকায় অবশ্য সে সুযোগ পাননি। তবে ৯ বছর পর ঠিকই পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন তিন কারাতেকা। আল আমিন ইসলাম, মারজান আক্তার প্রিয়া ও হুমায়রা আক্তার অন্তরা কাল দেশকে এনে দিয়েছেন তিনটি স্বর্ণপদক। আগের দিন তায়কোয়ান্দোকা দীপু চাকমার হাত ধরে এসেছিল দেশের প্রথম সোনা। কাল কারাতের তিনটি যোগ হয়ে ১৩তম এসএ গেমসের তৃতীয় দিনেই গত আসরের চার স্বর্ণপদক ছুঁয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। আসরের বাকি ৭ দিন অতীতকে পেছনে ফেলার দারুণ সুযোগ বাংলাদেশের সামনে।

স্বর্ণ সম্ভাবনায় শুরু থেকে খুব একটা আলোচনায় ছিল না কারাতে। আগের দিন ২টি স্বর্ণ হাতছাড়া হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিল এবার আর হলো না। হয়তো আর কিছু রুপা-ব্রোঞ্জ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু সবার ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে মঙ্গলবার দিনের প্রথম ইভেন্টেই দেশকে সোনার আনন্দে মাতান আল আমিন। ছেলেদের কুমিতে ৮৮ কেজি ওজন শ্রেণিতে তিনি হারিয়ে দেন পাকিস্তানের প্রতিপক্ষ জাফরকে, ৭-৩ পয়েন্টে। ম্যাচে বেশ ক’বার বেআইনিভাবে আক্রমণ করে আল আমিনকে ফেলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি প্রতিপক্ষ। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে ঠিকই কঠিন পরীক্ষা উতরে যান। এর আগে অবশ্য আরও বড় পরীক্ষা তাকে দিতে হয়েছিল সেমিফাইনালে স্বাগতিক নেপালের প্রতিপক্ষের সঙ্গে। স্বাগতিকরা এ ধরনের খেলাগুলোতে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে বিচারকদের কাছ থেকে। কালও সেই চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বারবার রিভিউ নিয়ে শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা ৪-৩ পয়েন্টে জিতে নেন আল আমিন।

তার কিছু পরই কারাতে থেকে দ্বিতীয় স্বর্ণ এনে দেন মারজান আক্তার প্রিয়া। মেয়েদের কুমিতে অনূর্ধ্ব-৫৫ কেজিতে প্রিয়া ৪-৩ ব্যবধানে পাকিস্তানের কাউসার সানিকে হারিয়ে উল্লাসে মাতান সাতদোবাতোর কারাতে ভেন্যুতে উপস্থিত বাংলাদেশিদের। এর আগে তিনি সেমিফাইনালে প্রিয়া হারান নেপালে মানিশা চৌধুরীকে। প্রিয়ার সাফল্য উদযাপন শেষ হতে না হতেই ফের আনন্দের উপলক্ষ এনে দেন আগের দিন দেশের হয়ে প্রথম পদক (ব্রোঞ্জ) জেতা হুমায়রা আক্তার অন্তরা। মেয়েদের কুমিতে অনূর্ধ্ব-৬১ কেজির ফাইনালে নেপালের আনু গুরুংকে ৪-০ পয়েন্টে হারিয়ে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানোর উপলক্ষ এনে দেন। সেমিফাইনালে তিনি হারিয়ে ছিলেন পাকিস্তানের গুলনাজকে।

দিনের প্রথম স্বর্ণপদক এনে দেওয়া রাজশাহীর আল আমিন কিন্তু কারাতে নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না একটা সময়। ছোট চাচা শরিফুল ইসলাম এক প্রকার জোর করেই তাকে কারাতে শেখাতে নিয়ে আসেন, ‘তখন একদমই মন চাইত না কারাতে খেলতে। এর জন্য চাচার হাতে কত মার খেয়েছি। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো। পরে জেলায় খেলতে গেলাম, ভালোও করলাম। এরপর ধীরে ধীরে এটা ভালো লেগে গেল। ভালোবেসে ফেললাম খেলাটাকে।’

এসএ গেমসে আসার আগে ঢাকায় সাউথ এশিয়ান কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতেছিলেন নিজের ইভেন্টে। সেটাই তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আবেগ সংবরণ করে আল আমিন বললেন, ‘এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার নয়। অতীতে অনেক আন্তর্জাতিক আসরে সোনা জিতেছি। কিন্তু এটা একদম আলাদা। এখানে আসার পর থেকেই ভাবতাম দেশের জন্য কিছু করব। ফাইনালের মঞ্চে তাই সাহস হারাইনি। এই পদকের জন্য আমি আমার সব কোচের কাছে কৃতজ্ঞ।’

প্রিয়ার গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। ২০১৬ সালে হুট করেই মনে হলো কারাতে শিখবেন। ভিকারুন্নিসা স্কুল ও কলেজে পড়াকালীন একবার সুযোগ এলো কারাতে শেখার। আর মেয়ের এই মারামারির খেলা ভীষণ অপছন্দ ছিল বাবা-মায়ের। কারাতে যাতে না খেলেন তার জন্য মারধরও করেছেন এক সময়। তবে সোনা জয়ের পর বাবা-মাকেই তা উৎসর্গ করেছেন জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ে চারুকলার প্রথম বর্ষের ছাত্রী, ‘পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই আমার বাবা-মাকে, দলের সব কোচ ও খেলোয়াড়দের। একটা সময় বাবা-মা চাইতেন না কারাতে খেলি। কিন্তু আমার জেদ ছিল খেলার। পরে অবশ্য যখন ভালো করতে শুরু করলাম তখন আমার কাজে বাবা অনেক সমর্থন দিয়েছেন। তার প্রত্যাশা ছিল, দেশের যাতে কিছু করতে পারি। আগের দিন দু’টি স্বর্ণপদক যখন হাতছাড়া হয় তখন খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আল আমিন ভাই যখন স্বর্ণপদক জিতলেন সেটা আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করল। ওই সময় আমি অনুশীলন করছিলাম। স্বর্ণ জয়ের খবর শোনার চেয়ে বেশি আনন্দের কিছু ছিল না। আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়; মনে হয় আমিও সোনা জিততে পারি। তখন শুধু আমার বাবার কথা মনে হচ্ছিল।’

আগের দিন একক কাতায় ব্রোঞ্জ জেতার পর মন খারাপ করেই অন্তরা বলেছিলেন কুমিতে শেষ চেষ্টা করার কথা। আল আমিন-প্রিয়ার সাফল্যের খবর সাহস বাড়িয়ে দেয় তার। যে কারাতের জন্য ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছেন, সেই কারাতে খেলে দেশকে কিছু না দিতে পারার আক্ষেপ খুব পোড়াচ্ছিল তাকে, ‘এইচএসসি পাস করার পর স্বপ্ন ছিল মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেব। কিন্তু সাফ ক্যাম্পে থাকব বলে সেই স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিই। স্বপ্ন ছিল সোনা জয়ের। আগের দিন হয়নি বলে হতাশ হলেও হাল ছাড়িনি এবং দু’প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হয়েই জয় তুলে নিয়েছি।’ এই জয়টাকে দেশকে উৎসর্গ করলেন অন্তরা। সেই সঙ্গে স্বর্ণপদক জয়ের স্বপ্ন পূরণের পর এখন চিকিৎসক হওয়ার চ্যালেঞ্জটাও নিতে চান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত