তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিন জেলা বিএনপির ৬১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল কেন্দ্র থেকে। ইতিমধ্যে দুই মাস পার হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াই শুরু করতে পারেনি আহ্বায়ক কমিটি। আগামী ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কমিটির আহ্বায়ক ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবু সুফিয়ান। এ অবস্থায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ নানা কোন্দলে দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা নির্জীব হয়ে থাকা নেতাকর্মীরা নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণায় কিছুটা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু আহ্বায়ক কমিটির ধীরে চলো নীতি কর্মীদের মধ্যে আবারও হতাশা ছড়াচ্ছে। প্রায় আট বছর পর গত ১ অক্টোবর চট্টগ্রাম দড়্গিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দিয়ে কেন্দ্র থেকে ৬১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে দড়্গিণ জেলার নেতাদের বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ানকে আহ্বায়ক করা হয়। কমিটিতে দড়্গিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আব্বাসকে যুগ্ম আহ্বায়ক ও বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তাক আহমেদ খানকে সদস্য সচিব করা হয়। কিন্তু ৬১ সদস্যের কমিটিতে স্থান পাননি দক্ষিন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পটিয়া আসনের সাবেক সাংসদ গাজী শাহজাহান জুয়েল, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও আনোয়ারা আসনের সাবেক সাংসদ সরওয়ার জামাল নিজামসহ বেশ কয়েকজন সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা।
দায়িত্ব পাওয়ার পর আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানও সংবাদ সম্মেলন করে ৯০ দিনের মধ্যে সম্মেলন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে দড়্গিণ জেলা বিএনপিতে যে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা চলছে তা নিরসন করে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি উপহার দেওয়াই হবে আহ্বায়ক কমিটির মূল কাজ। তবে ইতিমধ্যে দুই মাস চলে গেলেও উপজেলা কমিটিগুলোও হয়নি।
দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, চট্টগ্রাম দড়্গিণ জেলা বিএনপির কমিটির অধীন ৭টি উপজেলা, ১টি থানা ও ৫টি পৌরসভা কমিটি রয়েছে। জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গাজী শাহজাহান জুয়েলকে ঘিরে সবকটি উপজেলায় বিভক্তি রয়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ে অধিকাংশ উপজেলা ও পৌরসভায় ছিল দুটি করে কমিটি। গত ২১ অক্টোবর এসব উপজেলা ও পৌরসভা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে এক সপ্তাহের মধ্যে এসব উপজেলা ও পৌরসভায় নতুন আহ্বায়ক কমিটি করার কথা জানানো হয়। কিন্তু এক সপ্তাহের জায়গায় ছয় সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও এসব কমিটি গঠন হয়নি। নিরসন হয়নি অভ্যন্তরীণ কোন্দলও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আহ্বায়ক কমিটির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, কেন্দ্রের নির্দেশনা রয়েছে- তৃণমূল থেকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা কমিটি গঠনের পর সম্মেলনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম দড়্গিণ জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার। কিন্তু নতুন কমিটির শীর্ষ পদপ্রত্যাশীদের কেউ কেউ এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চান না। তারা চান নিজেদের লোকজনকে দিয়ে উপজেলা ও পৌরসভার আহ্বায়ক কমিটি করে মেয়াদ শেষ হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে তাদের নিয়েই তড়িঘড়ি করে জেলা কমিটি করতে। কিন্তু আহ্বায়ক কমিটির অনেকেই এটা মানতে নারাজ। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উপজেলায় অভ্যন্তরীণ যে কোন্দল রয়েছে তা নিরসনেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দ্বন্দ্ব নিরসন না করে উপজেলা ও পৌরসভায় আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হলে গ্রুপিং আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সংসদ সদস্য মইনুদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে শূন্য হয় চট্টগ্রাম-৮ আসন। সেখানে উপনির্বাচন হওয়ার কথা আগামী ১৩ জানুয়ারি।দক্ষিন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান বিগত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ওই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা জানান, গতকাল পর্যন্ত বিএনপি এ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও নিজেকে সম্ভাব্য প্রার্থী ধরে নিয়ে অঘোষিত নির্বাচনী তৎপরতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এসব কারণে দড়্গিণ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া অনেক থমকে গেছে।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আবু সুফিয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন ধরনের গ্রুপিংয়ে দীর্ঘদিন ধরে দড়্গিণ জেলার নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা ছিল। এখনো কিছুটা বিশৃঙ্খলা আছে। আমরা চাই এসব গ্রুপিং নিরসন করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি উপহার দিতে। এ নিয়ে আহ্বায়ক কমিটি কাজ করছে। অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং নিরসনে আমরা আলাদাভাবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, উপজেলা ও পৌরসভাগুলোর আহ্বায়ক কমিটি গঠনের বিষয় অনেক দূর এগিয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্ত সাংগঠনিক প্রক্রিয়া শেষ করে জেলা সম্মেলন করা হয়তো সম্ভব হবে না। আরেকটু সময় লাগতে পারে।
