বেসরকারি হাসপাতালে অফিস করেন সরকারি ডাক্তার

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:২৬ এএম

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. মইনুল ইসলাম। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত খাতা-কলমে সরকারি ওই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে উল্লিখিত কর্মঘণ্টার অধিকাংশ সময়ই তিনি বাইরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে বসে রোগী দেখার পাশাপাশি ব্যস্ত ছিলেন আল্ট্রাসনোগ্রাম করায়। এ সময়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা বেশ কয়েকজন রোগী মইনুল ইসলামকে না পেয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হন।

এ চিত্র শুধু এক দিনের নয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দিনই অফিস সময়ে নিজের দায়িত্ব পালন না করে উপজেলার বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনাস্টিক সেন্টারে গিয়ে রোগী দেখার পাশাপাশি আল্ট্রাসনোগ্রাম করায় ব্যস্ত থাকেন মইনুল ইসলাম। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা। বিশাল এই উপজেলার একমাত্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও চিকিৎসাসেবার দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন ঘটেনি এখন পর্যন্ত। উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগীরা এখানে এলেও 

পাচ্ছেন না কাক্সিক্ষত চিকিৎসা। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের ঘুরেফিরে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেই যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ রোগীদের। আর সরেজমিনে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এর সত্যতাও পেয়েছেন এই প্রতিবেদক।

গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসক মইনুল ইসলামকে জরুরি বিভাগে না পেয়ে চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন বেশ কয়েকজন রোগী। এ সময় ডিউটি থাকলেও কর্মস্থলে না থাকার কারণ জানতে চিকিৎসক মইনুলের মোবাইল ফোনে কল করেন এই প্রতিবেদক। তখন কলটি রিসিভ করে ওপাশ থেকে স্থানীয় ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক নারী কর্মচারী বলেন, ‘স্যার আল্ট্রাসনো করতেছেন। ব্যস্ত আছেন। পরে ফোন দেন।’ পরে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে একটি কক্ষে বসে থাকতে দেখা যায় চিকিৎসক মইনুলকে। এ সময় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি ‘হাসপাতালের (শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) কাজেই এখানে এসেছি’ বলে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। পরে দ্রুত একটি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির মোটরসাইকেলে চড়ে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার চত্বর ত্যাগ করেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসে চিকিৎসক মইনুলকে না পেয়ে ফিরে যাওয়ার সময় উমেদপুর এলাকার মহসিন মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এর আগেও দুই দিন আসছি, কিন্তু তাকে (মইনুল) অফিসে পাই নাই। কেউ কিছু বলতেও পারে না। আজকেও সাড়ে ১১টার দিকে এসে তাকে অফিসে পাই নাই। তাই এখন বাধ্য হয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে যাচ্ছি। এভাবে চললে আমরা গরিবরা কীভাবে চিকিৎসা পাব বলেন?’

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষারত মাতব্বর চর এলাকার নসিমন বেগম গতকাল দুপুর ১২টার দিকে দেশ রূপান্তরের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ছোট মেয়ে রতœাকে নিয়ে হাসপাতালে আইছি। এক ঘণ্টা ধরে বইসা আছি। কিন্তু তারে (মইনুল) পাচ্ছি না। কর্মচারীরা কইছে হে নাকি বাইরে রোগী দেইখা আইব।’

অফিস সময়ে কাজে ফাঁকি দিয়ে বাইরের হাসপাতালে বসে চিকিৎসক মইনুলের রোগী দেখার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এম এ মোকাদ্দেস হোসেন শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অফিসের সময়ে বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অবস্থান করা একটি ধৃষ্টতামূলক কাজ। তার (মইনুল) বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘অফিসের সময়ে কেউ অফিসের কোনো আদেশ ছাড়া বাইরের কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখতে পারেন না। যদি কারও বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সংবাদটি আপনাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম। আপনারা আপনাদের মতো আগান। আমরা তদন্ত করে এ ব্যাপারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত