বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এক কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ ছড়িয়েছে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রবীণ শিক্ষকদের মাঝে। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন ও তদন্তে গিয়ে কনিষ্ঠ ওই কর্মকর্তা উপাচার্যসহ প্রবীণ শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন প্রতিনিয়ত। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। এদিকে ওই কর্মকর্তার অসদাচরণকে অগ্রহণযোগ্য অভিহিত করে পরিদর্শন ও তদন্ত টিমে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউজিসি।
অভিযোগ রয়েছে, ইউজিসি পরিচালক মো. কামাল হোসেন পরিদর্শনের নামে উপাচার্যদের সঙ্গে হয়রানিমূলক আচরণ করছেন। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির বিপরীতে শিক্ষা সংকোচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। পরিদর্শনকালে ইউজিসির সদস্য হিসেবে দায়িত্বরত অধ্যাপকদের মতামতের বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। একই ধরনের অভিযোগ এনেছেন ইউজিসির একাধিক সদস্যও। তাকে নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্তে যাওয়াকে বিব্রতকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন কমিশনের একাধিক সদস্য।
এ পরিস্থিতিকে নিজেদের জন্য অমর্যাদাকর অভিহিত করে ‘মর্যাদা রক্ষায়’ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন উপাচার্য ও প্রবীণ শিক্ষকরা। তারা পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য ইউজিসির তদন্ত বা পরিদর্শন টিমে কমিশনের সদস্য পদমর্যাদার নিচে কোনো কর্মকর্তাকে না রাখার দাবি জানিয়েছেন। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে উপাচার্যদের এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন কয়েকজন উপাচার্য। তারপর ইউজিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তার সম্পর্কে তথ্য নিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান বলেন, মন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আমাদের কথা হয়েছে। এক উপাচার্য বিষয়টি তুলেছিলেন। আমিও বলেছি। অবশ্যই উপাচার্যদের বিষয়ে পরিদর্শন ও তদন্তে ইউজিসি কর্মকর্তাদের রাখা ঠিক নয়, উচিত নয়। ইউজিসি চেয়ারম্যান তখন বলেছিলেন, ‘কর্মকর্তাদের রাখা হয়। কারণ তারা আইনকানুন, নীতিমালার বিষয়গুলো ভালো জানেন। তখন আমি বলেছিলাম, আপনি (ইউজিসি চেয়ারম্যান) আপনার জায়গা থেকে ঠিকই বলেছেন। একই সঙ্গে আমার সুপারিশ হচ্ছে, যেসব প্রবীণ শিক্ষক উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবসরে গেছেন তাদের মধ্য থেকে কমিশনের সদস্য করা হলে তদন্ত নিয়ে কোনো সমস্যা থাকে না। তারা উপাচার্যদের বিষয়ে তদন্তে গেলেও কোনো উপাচার্য ও প্রবীণ কোনো শিক্ষকের জন্য মর্যাদাহানির কিছু ঘটত না।’
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে আরেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, তদন্তের নামে ওই কর্মকর্তা প্রায় সময়ই হয়রানি করছেন। প্রকাশ্যে সিনিয়রদের অশ্রদ্ধা করছেন। আরেক প্রবীণ শিক্ষক মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন বলেন, নাম ধরে কোনো কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করছি না। তবে এটা তো ঠিক যে ইউজিসির কর্মকর্তা তো ভিসিদের পদমর্যাদার অনেক নিচে। কোনো অধ্যাপকের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য তো তার নিচের কাউকে দেওয়া যায় না। কমপক্ষে কোনো অধ্যাপককে দিয়ে তদন্ত করতে হয়। তেমনই এক উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্তে যদি তার অনেক নিচের পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তাকে দেওয়া হয় তাহলে তা কখনোই ভালো হয় না। এতে উপাচার্যদের মর্যাদা, তাদের সম্মানটা ঠিক রাখা হয় না। বিষয়টি মন্ত্রীকে বলা হয়েছে, উপাচার্যদের বিরুদ্ধে তদন্তে ইউজিসির সদস্যদের নিচের কাউকে যেন না পাঠানো হয়।
ইউজিসির একাধিক সদস্য ও কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউজিসির তদন্ত কমিটি নিয়ে উপাচার্যদের অসন্তোষের বিষয়টি নিয়ে তারাও বিব্রত। ইতিমধ্যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। ওই কর্মকর্তার আচরণের বিষয়টিও চেয়ারম্যানকে জানানো হয়েছে। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লা বলেন, আমি বিষয়টি জেনেছি। অসদাচরণকে অগ্রহণযোগ্য অভিহিত করে তদন্ত টিমের দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। উপাচার্যরা আমার কাছে এখনো লিখিত কিছু দেননি। কমিশনের সদস্যদের মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি এক কর্মকর্তার সমস্যা। আমি তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি উপাচার্যদের বিরুদ্ধে তদন্তে কর্মকর্তাদের আর রাখা হবে না। যদি রাখাও হয় সেক্ষেত্রে কর্মকর্তার জন্য শর্ত দেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইউজিসি কর্মকর্তা কামাল হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ইউজিসি কর্মকর্তা কামাল হোসেন দেশ রূপান্তকে বলেন, যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন তারা নিজেদের স্বার্থেই সেগুলো করছেন। আমি দেশের জন্য কাজ করি। তাই আগেও আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন সংবাদের কোনো প্রতিবাদ করিনি।
তিনি বলেন, আমি নামাজের জন্য দাঁড়িয়েছি। এ অবস্থায় আপনাকে বলছি, অনেক সংস্থায়ই নিচের পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত করা হয়। সে সব জায়গায় সমস্যা না হলে ইউজিসিতে কেন সমস্যা হবে? আসলে কমিশনের ভেতরে ও বাইরে আর্থিক দুর্নীতিতে যারা জড়িত তারাই আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করছেন। সেগুলো তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ।
