শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রশাসনের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনায়ও সমাধান না আসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা।
অবরোধের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে কোনো পরিবহন শহরের উদেশ্যে ছেড়ে যেতে পারেনি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দেন তারা।
শিক্ষার্থীরা জানান, এতদিন মিছিল, বিক্ষোভ, পেইন্টিং, গ্রাফিতিতে সীমাবদ্ধ ছিল তাদের আন্দোলন। এবার ১৩তম দিনে এসে অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেছেন তারা।
আন্দোলনকারীরা জানান, প্রশাসনকে দেওয়া ১৬টি দাবির মধ্যে ছয়টি দাবির সময়সীমা শেষ হয়েছে বুধবার। এসব দাবি বিষয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া সময়ে কোনো সমাধানে যেতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে বিকেল ৪টার দিকে তারা অবরোধ শুরু করেন।
৮ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় সমাবর্তনকে কেন্দ্র করে ১৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় ডিসেম্বরের শীতকালীন ছুটি পিছিয়ে আগামী বছরের ৫ থেকে ১৬ জানুয়ারি করা হয়। একই সঙ্গে ছুটিতে আবাসিক হল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। হল বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২০ নভেম্বর ক্যাম্পাসে মানববন্ধনের চেষ্টা করেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু মানববন্ধনের অনুমতি না নেয়ায় প্রক্টরিয়াল বডি এসে তা পণ্ড করে দেয় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধনে এক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ও প্রক্টর তর্কে জড়িয়ে পড়েন।
মানববন্ধনে প্রক্টরিয়াল বডির বাধার প্রতিবাদে ও হল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে পরদিন বৃহস্পতিবার ফের মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ, সম্মিলিত প্রতিবাদী গান, মশাল মিছিল ও রোড পেইন্টিং করে আসছেন তারা।
এ দাবিগুলো দ্রুত মেনে নেয়ার দাবিতে রোববার উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বরাবর লিখিত স্মারকলিপি দেন তারা।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো ক্যাম্পাসে সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত, আসন্ন সমাবর্তন উপলক্ষে হল বন্ধের ঘোষণা প্রত্যাহার করে ৩৬৫ দিনই হল খোলা রাখা, ছেলে ও মেয়েদের হলে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বৈষম্য ও সময়সীমা প্রত্যাহার, ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের মান বাড়ানো ও দাম কমিয়ে টংগুলোতে ভারি খাবারের ব্যবস্থা করা, রাত ১০টা পর্যন্ত লাইব্রেরি খোলা রাখা, সংগঠনগুলোকে ভেন্যু বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অর্থ না নেওয়া ও কক্ষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ না করা।
এ ছাড়া ২৬ মার্চ পর্যন্ত আল্টিমেটাম বেঁধে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি দাবিগুলো হলো পরীক্ষার খাতায় পরিচয় নির্দেশক রেজিস্ট্রেশন নম্বরের পরিবর্তে কোডিং সিস্টেম, শতভাগ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত, শিক্ষার্থীদের আনুপাতিক হারে বাস এবং রুট ও ট্রিপ সংখ্যা বৃদ্ধি, জিমনেসিয়ামের কার্যকারিতা ও প্রবেশের যৌক্তিক সময়সীমা বৃদ্ধি, মেডিকেল সেন্টারের সুবিধা বৃদ্ধি, লাইব্রেরিতে বইসহ রিডিংরুমে প্রবেশের সুবিধা, প্রথম ছাত্রীহল ও একাডেমিক বিল্ডিংগুলোর যথাযথ নামফলক ব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ও হলগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠগুলো ব্যবহার উপযোগী ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় মিলনায়তনের মান উন্নয়ন ও সংস্কার।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর রহমান বলেন, আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো প্রশাসন যতদিন পর্যন্ত মেনে না নিবে ততদিন পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমরা আশা রাখি প্রশাসন আমাদের দাবি দ্রুত সময়ে মেনে নিবে।
এ বিষয়ে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছি। এগুলো প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
খসড়া সিদ্ধান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের মিছিল, সমাবেশে ও মানববন্ধনে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে, তবে কোনো কারণে অনুমতি না দিলে প্রশাসন তা লিখিতভাবে জানিয়ে দেবে, রাত ১০টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত মেয়েদের হলে প্রবেশের বিষয়ে অনুমতি দেয়া হবে, লাইব্রেরি রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার বিষয়ে সুপারিশ করা হবে, আসন্ন সমাবর্তন উপলক্ষে ৫ থেকে ৮ জানুয়ারি হল বন্ধ থাকবে, তবে সমাবতর্নের পরে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত হল খোলা রাখার জন্য আমরা প্রশাসনকে সুপারিশ করব। এ ছাড়া ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের মান বাড়ানো ও দাম কমানোসহ চারটি বিষয়ে পরে আলোচনা করা হবে বলে তিনি জানান।
