বৈষম্য না কমলে উন্নয়ন টেকসই হবে না

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৪৩ পিএম

ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য মাপার সূচক ‘গিনি সহগ’ দশমিক ৫০-এ পৌঁছালে কোনো দেশ ‘বৈষম্যের মহাবিপদ’ পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশের গিনি সহগ ছিল দশমিক ৩৬। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে গিনি সহগ এখন দশমিক ৪৮২।  ২০১০ সালে এটি ছিল দশমিক ৪৫৮-এ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর্মসংস্থান হ্রাস ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে অনিয়মের কারণে গরিব মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে ধনীদের সম্পদ। তবে সরকারের পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, কোনো দেশ যখন দ্রুত উন্নয়ন করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বৈষম্য বাড়ে।  সরকার বৈষম্য কমাতে দরিদ্রদের জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাই বৈষম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশজুড়ে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং আয়বৈষম্য কমাতে সরকারের নানা প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগের সুফল মিলছে না; বরং দেশের গরিব মানুষ দিন দিন আরও গরিব হচ্ছে, দ্রুত সম্পদ বাড়ছে ধনীদের।

বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরের ‘দ্রুত সম্পদ বাড়ছে ধনীর, হারাচ্ছে গরিব’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বিবিএস-এর হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভের (এইচআইইএস) চূড়ান্ত প্রতিবেদনের নানা দিক তুলে ধরা হয়।  এতে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ মানুষের সম্পদের পরিমাণ বিগত ছয় বছরের ব্যবধানে দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে। এই সময়ে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছে ২ শতাংশেরও বেশি। বিবিএসের তথ্যানুসারে, সবচেয়ে গরিব এমন ৫ শতাংশ মানুষের সম্পদ ২০১০ সালে ছিল দেশের মোট সম্পদের দশমিক ৭৮ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা কমে নেমে এসেছে দশমিক ২৩ শতাংশে। এ সময়ে গ্রামের গরিব মানুষের সম্পদ আরও বেশি কমেছে। অন্যদিকে, ২০১০ সালে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশের সম্পদের পরিমাণ ছিল দেশের মোট সম্পদের ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০১৬ সালে তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৮২ শতাংশে। ছয় বছরের ব্যবধানে শহুরে ধনীদের সম্পদ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমাগত বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যানের মতোই মোট দেশজ উৎপাদন বা ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হারের পরিসংখ্যানও বিস্ময়কর। চলতি বছরই ‘স্পেকটেটর ইনডেক্স’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান ‘চলতি মূল্যপদ্ধতি’-এর বিবেচনায় ২০০৯ সাল থেকে ১০ বছর ধরে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বে শীর্ষস্থান অধিকার করে আছে।  বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার এখন ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।  এ অবস্থায় এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, এত উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশ কীভাবে এবং কেন এখন একটি ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে যে হারে কর্মসংস্থান বাড়ার কথা ছিল, তা বাড়েনি। গত দশ বছরে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বরং কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ব্যাপক হারে।  কর্মসংস্থান না বাড়লে গরিব মানুষের আয় কমবে এটা স্বাভাবিক।

দেশে উচ্চমাত্রায় আয় বৈষম্য বৃদ্ধি এবং বিশ্বের মধ্যে দ্রুততম হারে ধনীদের সম্পদের পরিমাণ আরও বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায় অন্যান্য পরিসংখ্যান থেকেও। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদনে ধনী-দরিদ্র বৈষম্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এই তালিকায় বাংলাদেশের সামনে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শুধু ভারত রয়েছে। বাকি তিনটি দেশ হলো আফ্রিকার নাইজেরিয়া, কঙ্গো ও ইথিওপিয়া। আবার অতি ধনী বা ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক দিয়েও বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েলথ এক্স’-এর ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুসারে ২০১২ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে।  এ হার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির চেয়ে বেশি।

দেশে আয় বৈষম্য নিরসন নিয়ে সম্প্রতি এক সেমিনারে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম মন্তব্য করেন, দেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। তার মতে, ব্যাংকঋণের লুণ্ঠিত অর্থের সিংহভাগ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। আর একটি বড় অংশ পাচার প্রক্রিয়ায় দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে। এসব কারণেই আয়বৈষম্য বেড়ে বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে গেছে।  অবশ্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে যথাযথভাবে না পৌঁছানোর কথা সাম্প্রতিক বিভিন্ন মন্তব্যে সরকারের নীতিনির্ধারকরাও স্বীকার করেন। সরকারের তরফ থেকে এর কারণ হিসেবে সর্বগ্রাসী দুর্নীতিকেই দায়ী করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে প্রশাসনসহ অন্যত্রও ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালাতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না করে এমন শুদ্ধি অভিযান বড় কোনো সুফল বয়ে আনবে না। এ অবস্থায় সরকার দেশের উচ্চমাত্রার আয় বৈষম্য দূর করে টেকসই উন্নয়নে জোর দেবে, সেটাই কাম্য। উচ্চ বৈষম্যের সমাজে উন্নয়ন কখনো টেকসই হয় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত