শ্বাসরোধে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:১৩ এএম

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আলমগীর হোসেন। ২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ দড়িগাঁও গ্রামে বাড়ির পাশের একটি কাঠ বাগান থেকে গলায় লুঙ্গি পেঁচানো অবস্থায় তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ঘটনার পর আলমগীরের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে স্থানীয় থানা পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে। কিন্তু আদালতের নির্দেশে তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। হত্যার পর জড়িতদের রক্ষা করতেই আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়।

আলমগীরের মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু থানা পুলিশ ও চিকিৎসকের দেওয়া প্রতিবেদন চ্যালেঞ্জ করে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পিবিআই।

এ ঘটনায় বাদীর করা মামলার আসামিদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানা যাবে বলে মনে করছে তদন্তসংশ্লিষ্ট পিবিআই কর্মকর্তারা। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দা মো. আশ্রাফ ওরফে আছরাপ, কাবিল, মোহাসিন, সোহরাব, নাজু এবং কবির পরস্পর মিলে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আলমগীরকে।

মামলার বাদী আলমগীরের বাবা আবদুর ছাত্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলে মাছের ব্যবসা করত। যারা তাকে মেরেছে ও তাদের সঙ্গেই মিশত। ঘটনার পর পুলিশ আত্মহত্যা বললেও আমি বারবার বলেছি এটা হত্যাকাণ্ড। আলমগীরকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে খুনিরা টাকা পয়সা দিয়ে সব ম্যানেজ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

২০১৮ সালের ১২ আগস্ট দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার দক্ষিণ দড়িগাঁও গ্রামের আবদুর ছাত্তারের ছেলে আলমগীরকে বাড়ি থেকে ডেকে নেয় প্রতিবেশী আশ্রাফ, কাবিল ও মোহাসীন। পরদিন সকাল ৮টায় বাড়ির পাশের বাবুর আলীর কাঠ বাগান থেকে গলায় লুঙ্গি পেঁচানো ঝুলন্ত অবস্থায় আলমগীরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি প্রথম থেকেই আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে থানা পুলিশ। তবে ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় এ বছরের ২৯ এপ্রিল আলমগীরের বাবা আবদুর ছাত্তার বাদী হয়ে পাঁচজনকে আসামি করে ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে হত্যা মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেয় আদালত। আদালতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ বছরের ১৩ জুন মামলাটি গ্রহণ করে পিবিআই। সম্পªতি প্রাথমিক তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পিবিআই।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার এসআই সালে ইমরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আমার কাছে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে আলমগীরকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। যে গাছে তাকে ঝুলিয়ে রাখা হয় সেখানে কারও আত্মহত্যা করা সম্ভব নয়। গাছের ডালের সঙ্গে তার পরনের লুঙ্গি দিয়ে ফাঁস দেওয়া ঝুলন্ত অবস্থায় পা মাটিতে লাগানো হাঁটু ভাঁজ করা বাঁকানো অবস্থায় দেখতে পায়। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালাতে চেয়েছে খুনিরা। আসামিদের গ্রেপ্তার করে ব্যাপক আকারে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিস্তারিত জানা যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আলমগীরের মাদক ব্যবসার সঙ্গীরাই তাকে হত্যা করেছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। হত্যার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।’

পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়েছে–হত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, পূর্বের তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদন, সুরতহাল রিপোর্ট, পিএম রিপোর্ট, স্থিরচিত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে–নিহত আলমগীর হোসেন মামলার অভিযোগে বর্ণিত আসামিদের সঙ্গে চলাফেরা করত এবং একসঙ্গে মাদক সেবন করত। মাদক সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে মামলার বিবাদীদের সঙ্গে আলমগীর এবং তার ভাই মামুনের ঘটনার কিছুদিন আগে ঝগড়া হয়েছিল। এ ঘটনায় হওয়া অপমৃত্যু মামলাটি তদন্ত করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই জাফর ইকবাল। আলমগীর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করে সে।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্তে বিশেষজ্ঞ মতামত অনুযায়ী আলমগীর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে মর্মে প্রতীয়মান হলেও ঘটনার সময়কালের স্থিরচিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তার পরনের লুঙ্গি দিয়ে ফাঁস দেওয়া ঝুলন্ত অবস্থায় পা মাটিতে লাগানো হাঁটু ভাঁজ করা বাঁকানো অবস্থায় আছে। তার গায়ের গেঞ্জি কোমরে গিট্টু দিয়ে কোমরের অংশ আবৃত করা আছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও পারিপার্শ্বিকতার আলোকে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড মর্মে প্রাথমিকভাবে সত্যতা প্রতীয়মান হয়েছে। আসামিদের সঙ্গে ভিকটিমের মাদক সংক্রান্ত বিরোধ এবং ঘটনার পূর্বে আসামিদের সঙ্গে ভিকটিমের ঝগড়াঝাঁটি, ঘটনার সময়কালের স্থিরচিত্র বিশেস্নষণ এবং ঘটনার দিন রাতে আসামি মো. আশ্রাফ ওরফে আছরাপ, কাবিল, মোহাসিন আলমগীরকে তার বাসা থেকে ডেকে নেয়। পরের দিন তার লাশ পাওয়া যাওয়ার ঘটনাটি আসামি মো. আশ্রাফ ওরফে আছরাপ, কাবিল, মোহাসিন, সোহরাব, নাজু এবং কবির পরস্পর যোগসাজশে গলায় লুঙ্গি পেঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে পরিহিত লুঙ্গি দিয়ে কাঠ বাগানে গাছের সঙ্গে আলমগীরকে ঝুলিয়ে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়, যা দণ্ডবিধি আইনের ৩০২ / ২০১ / ৩৪ ধারার অপরাধ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত