একাত্তরে বাবা-মা ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে মুক্তিযুদ্ধে যান সিপাহি মো. মমিনুল হক। দেশের জন্য যুদ্ধে প্রাণ হারান তিনি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বাবাকে পাঠানো এক চিঠিতে সেই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিও দেন। ১৯৭২ সালের ১ আগস্ট পাঠানো চিঠিটির সঙ্গে দুই হাজার টাকার একটি চেকও পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘ ৪৭ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি চাঁদপুরের কচুয়ার সেই মমিনুল।
স্বজনরা জানান, ১৯৭১ সালে মমিনুল হক বিমানবাহিনীর চতুর্থ এমওডিসি (আইডি নম্বর ৮৮০৭৯২৩) পিএএফে কর্মরত ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার সালদা নদীর পাড়ে সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের গুলিতে শহীদ হন মমিনুল। কমান্ডার এ টি এম হায়দারের নেতৃত্বে তিনি যুদ্ধে অংশ নেন। দেশের জন্য যুদ্ধে গিয়ে অনাগত সন্তানের মুখটিও দেখার সুযোগ হয়নি তার। তারা আরও জানান, বঙ্গবন্ধুর ওই চিঠি ও চেক (নং ডিই-এ ২৯১৫৭৬, তারিখ ০১-০৮-১৯৭২ ইং) তৎকালীন চাঁদপুর মহকুমা প্রশাসক আইয়ুব কাদেরীর কাছ থেকে গ্রহণ করেন শহীদ মমিনুলের বাবা ওয়াহিদ আলী। চিঠিতে বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন, ‘প্রিয় ভাই, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য পুত্র আত্মোৎসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতিও রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভূতি। এমন নিঃস্বার্থ মহান দেশ-প্রেমিকের পিতা হওয়ার গৌরব লাভ করে সত্যি আপনি ধন্য হয়েছেন।’ চিঠিটি পেয়ে একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোকে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন ওয়াহিদ আলী।
সিপাহী মমিনুলের স্বজনরা জানান, ওই চেক নেওয়ার জন্য মহকুমা প্রশাসক স্বাক্ষরিত একটি চিঠিও ওয়াহিদ আলীকে দেওয়া হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মমিনুলের স্ত্রীর পেনশনের জন্য দুই কপি ছবি চেয়ে রেকর্ড অফিস থেকে টেলিগ্রামে বার্তাও দেওয়া হয়। এসব ছাড়াও রেকর্ড অফিসের অনেক প্রমাণাদি থাকলেও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় তালিকায় মমিনুল হকের নাম নেই।
মমিনুলের সন্তান এমরান হোসেন বড় হয়ে জানতে পারেন দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গিয়ে শহীদ হয়েছেন তার বাবা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গিয়ে আমার বাবা শহীদ হয়েছেন। যার ফলে আমি কখনো তাকে বাবা বলে ডাকতে পারিনি। তবে স্বাধীন বাংলাদেশ দেখতে পেরেছি। আমার বাবা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করলেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি।’
এমরান আরও বলেন, ‘স্বয়ং বঙ্গবন্ধু বাবার মৃত্যুতে সমবেদনা ও সহায়তা করলেও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম নেই তার। বাবার (মুক্তিযোদ্ধার) স্বীকৃতির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিমানবাহিনী কার্যালয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়াতে দৌড়াতে আমি ও আমার পরিবার আজ ক্লান্ত। আমার বুঝ হওয়ার আগে আমার মা এবং চাচা বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়িয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করতে পারিনি। অনেক সন্ধানের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় বাবার কবর (অজ্ঞাত) খুঁজে পেলেও জেলা প্রশাসকের অনুমোদন ছাড়া সেটিও দাবি করতে পারছি না।’
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মমিনুল হকের স্ত্রী আবিদা খাতুন বলেন, ‘আমার মতো অভাগা আর কজন আছে? আমার স্বামীর মৃতদেহটাও দেখার ভাগ্য হয়নি আমার। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি আমার স্বামীকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সরকারের নিকট দাবি জানাই।’ সিপাহী মমিনুলের ভাই সিরাজুল হক বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শোনার পর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোথাও মৃতদেহের সন্ধান পাইনি। এমনকি কাগজপত্র নিয়ে অনেক চেষ্টা করেও তাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তভু©ক্ত করতে পারিনি।’
এ ব্যাপারে জেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম এ ওয়াদুদ বলেন, ‘এমনটি হওয়ার কথা নয়। যেহেতু বঙ্গবন্ধুর চিঠি আছে সেহেতু কোনো শর্ত ছাড়াই তার স্বীকৃতি হওয়ার কথা।’
চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, ‘যেসব প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এখন পর্যন্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি, তাদের নাম তালিকাভুক্ত করতে উপজেলা পর্যায় থেকে আবারও কার্যক্রম শুরু হবে। আশা করছি আগামী যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।’
