বীর যোদ্ধাদের অমর ইতিহাস

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৩:৪৫ এএম

বগুড়ার গাবতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের উদ্যোগে ও চেষ্টায় এই উপজেলার মোট ২১২ জন মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধস্মৃতি আছে ‘মুক্তিযুদ্ধের শ্রুতিকথা : গাবতলীর সূর্যসন্তানেরা’ বইতে। লিখেছেন শাহীন আলম

ভাবনাটি প্রথম ভেবেছিলেন বগুড়ার গাবতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইংরেজিতে সংক্ষেপে ইউএনও) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। এই উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস লিখে রাখবেন। এখন তিনি জয়পুরহাট জেলার সহকারী কমিশনার। ফলে প্রথমেই বন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের  সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন ও ফোকলোরের অধ্যাপক মোস্তফা তারিকুল আহসানকে জানালেন। তারাও রাজি। চারজনের প্রথম সভা হলো। মনিরুজ্জামান ইচ্ছের কথা বললেন, ‘বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ইতিহাস জীবন্ত মলাটবন্দি করতে চাই।’ কাজের প্রস্তাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষকই রাজি। জানালেন, নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ ও কাজ হবে। কারণ প্রায় দিনই মুক্তিযোদ্ধারা মারা যাচ্ছেন। নানা জেলায় তাদের চলে যাওয়ার ফলে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে চিরকালের মতো।

হেলাল উদ্দিন বললেন, ‘আমার জানা মতে, বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে তার স্বাধীনতার সংগ্রামীদের নিয়ে কিছু কাজ, ইতিহাস তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু স্থানীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তেমন কোনো ইতিহাস নেই।’ তারা ফলে আগ্রহ বেশি পেলেন। খুব আগ্রহ নিয়ে কাজে নামলেন। তাদের পরিকল্পনায় ছিল– মুক্তিযোদ্ধাদের বাল্যকাল, লেখাপড়া, তার জীবনে সত্তরের নির্বাচন, কোনো রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন কি না সেই সময়ে, পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমণ প্রথম কীভাবে দেখেছেন, কার কাছে জানলেন, সাত মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণা তার কীভাবে শোনা, মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা, প্রস্তুতি, ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়ার সময়, প্রশিক্ষণ শিবিরের দিনগুলো, কীভাবে যুদ্ধে জড়ালেন, মুক্তিযুদ্ধের অনন্য জীবন, স্বাধীনতার পর কীভাবে দেশে ফিরলেন, কী দেখলেন– এসব প্রশ্ন।

ফোকলোর ও ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীদের তারা বিভাগের বলে বাছাই করলেন। আগ্রহ আছে এই কাজে ও উপযুক্ত হিসেবে মোট ৩০ জনকে নিয়ে পুরো ছাত্র গবেষকের দল হলো। একটি বাস নিয়ে ৩৩ জন ক্যাম্পাস ছাড়লেন। বগুড়াতে গিয়ে ১০ জন ভিডিওগ্রাফার জোগাড় হলো। তারা অডিও-ভিজ্যুয়াল ইতিহাস তৈরি করবেন। টানা সাতটি দিন– ৮ আগস্ট থেকে ১৪ আগস্ট ২০১৯ সাল পর্যন্ত রেকর্ড, লিখিত ও ভিডিওতে সূর্যসন্তানদের বীরশ্রুতি রেকর্ড করা হলো।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়করাই তাদের অভাব, অনটন, ভালো ও মন্দ থাকার মাঝে তাদের প্রায় পুরোটা সময় খাবার খাইয়েছেন। নিজেদেরও কখনো খেতে হয়েছে। থাকার ব্যবস্থা করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিরুজ্জামান নিজে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা কাজ করেছে পুরো দল। ফিরে এসে খেয়ে দেয়ে সাক্ষাৎকার শুনে লিখেছেন। তারপর কাগজের অমূল্য ইতিহাসের দলিল তৈরি হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাধ্যমে তৈরি বলে এই বই অন্য গবেষণা গ্রন্থগুলোর চেয়ে আলাদা ও ভালো হয়েছে–দাবি করলেন ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন। প্রকাশিত হয়েছে সরকারিভাবে। কারণ বইয়ের পরিকল্পক, প্রকাশক সরকারি কর্মকর্তা। প্রচ্ছদ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র সোহেল আশরাফ। এখনো বাজারে আসেনি। তবে সবাই কপি পেয়েছেন একটি করে, যারা যুক্ত ছিলেন। মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই ছিলেন। এলাকার, রাজশাহীর অনেকেও গিয়েছেন। প্রথমে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, পরে প্রতিজন বীরের হাতে বই দেওয়া হয়েছে। তারা উল্টে দেখেছেন নিজের জীবন। ছবিসহ সাক্ষাৎকার দেখে অনেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। অনেকে চোখের পানি ফেলেছেন। ফলে পুরো মিলনায়তন আবেগে ভেসেছে। প্রতিটি বইয়ের দাম ১২শ টাকা। সামনে বাজারে আসবে।

এই কাজে কোনো ছাত্রী ছিলেন না। কারণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বগুড়ার গাবতলী অনেক দূরের পথ। তাদের খাওয়া, থাকা ও নিরাপত্তার আলাদা, উন্নত ও নিরাপদ ব্যবস্থা এখনো এই বাংলাদেশে করতে হয়। ছাত্ররা ভালো কাজ করেছেন।

এবারে বইয়ের পেছনের গল্প–মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া তালিকা ধরে কাজ করেছেন তারা। সাক্ষাৎকারে ছিলেন সেই নির্বাচিত মুক্তিযোদ্ধারাই। এই দলে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সোহরাব– ‘মুক্তিযুদ্ধ তাদের স্মৃতিতে এত জীবন্ত দেখেছি যে চোখের সামনে মনে হচ্ছিল ভাসছে। সেই অনুভূতিই আলাদা। তারা তাদের সীমাহীন নির্যাতনের কথাও আমাদের বলেছেন। তখন আমরাও কেঁদেছি।’ সাক্ষাৎকার দেওয়া অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা খাজা নাজিম উদ্দিন, ‘আমি সাতই মার্চের ভাষণ শুনে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছি। যেকোনোভাবে দেশকে স্বাধীন করতে লড়েছি। শেষ শত্রুকেও হারিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছি। তাদের সবাইকে আমাদের নিয়ে কাজ করার জন্য ধন্যবাদ।’   

উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক মোস্তফা তারিকুল আহসান, ‘আগেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই হয়েছে। তবে কোনো উপজেলার নানা পেশা ও শ্রেণির মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধার জীবন মলাটবন্দি হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পুরো বিষয়গুলো এই বইতে ভালোভাবে আছে।’ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুনের ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ও মৌখিক ইতিহাস; বীর বাঙালির গণযুদ্ধের জীবন্ত শ্রুতকাহিনীগুলো সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সম্পাদনার মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও গাবতলী উপজেলা প্রশাসন মানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চমৎকার যৌথ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের যৌথ প্রচেষ্টা ইতিহাস-ঐতিহ্য চর্চা ও জনকল্যাণমুখী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’

এই বইয়ের মূল প্রাণ ও অন্যতম সম্পাদক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানালেন, ‘বিভিন্ন উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা প্রতি মাসে মারা যাচ্ছেন। ফলে সেরা সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের সত্যি কাহিনী জানতে পারেন সেজন্য আমাদের এই কাজ।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত