একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন

সরকারের চেয়ে শক্তিশালী কোনো গ্রুপ নেই

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:১৯ পিএম

ভোক্তাদের ঠকিয়েই যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে নিত্যপণ্য চাল, মাংস, ডাল, সর্বশেষ পেঁয়াজ নিয়ে একটি অসাধু চক্র অতি মুনাফা করেছে। একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে অতি মুনাফা ঠেকাতে আইন ও প্রতিযোগিতা কমিশন থাকলেও কার্যকারিতা নেই। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতে এই কমিশনের বিষয়েই কথা বলেছেন প্রতিযোগিতা কমিশনের নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মো. মফিজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, যথাযথভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারলে সিন্ডিকেট ঠেকানো সম্ভব। সরকারের চেয়ে শক্তিশালী কোনো গ্রুপ নেই। নিজস্ব আইন আছে, সে যেই হোক না কেন, আইন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিতে পারব। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার মামুন আব্দুল্লাহ

প্রতিযোগিতা কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কোন কাজে হাত দিয়েছেন?

প্রতিযোগিতা আইনের উদ্দেশ্য হলো বাজারে অনৈতিক মুনাফার লোভে ষড়যন্ত্রমূলক প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকা- প্রতিরোধ করা। আমরা এই অধীনে কাজ করার চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যেই কিছু অভিযোগের ওপর রায় হয়েছে, যা জনস্বার্থে খুব প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, বাজারে যদি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা থাকে তবে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই লাভবান হবে। ক্রেতা ন্যায্যমূল্যে মানসম্পন্ন পণ্যটি পাবে। ব্যবসায়ীরা অবশ্যই মুনাফা করবে। তাদের জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ব্যবসায় মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসা, যোগসাজশ, জোটবদ্ধতা, কার্টেল এবং ডমিনেন্ট পজিশনকে অপব্যবহার করা হচ্ছে। এটি বন্ধ করাই বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজ। তবে নতুন হিসেবে আমরা এখনো লার্নিং স্টেজে আছি।

সিন্ডিকেটকারীরা প্রভাবশালী গোষ্ঠী। প্রতিযোগিতা কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিতে পারবে?

সরকারের চেয়ে শক্তিশালী কোনো গ্রুপ নেই। আইন অনুযায়ী কাজ হবে। আমাদের নিজস্ব আইন রয়েছে, সে যেই হোক না কেন, আমরা আমাদের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। প্রতিযোগিতা কমিশনের আইন ২০১২-এর অধীনে কেউ যদি অপরাধ করে আমরা অবশ্যই সেখানে আমাদের আইন প্রয়োগ করব। আমরা কোনো গ্রুপ বা দলের কাজে নতি স্বীকার করব না।

এ কাজে প্রতিষ্ঠানটির সীমাবদ্ধতা বা প্রতিবন্ধকতা কী?

জনবল সংকটের কারণে আমরা ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। কেননা আমি ছাড়া  (চেয়ারপারসন) নিজস্ব জনবল কিন্তু একজনও নেই। এখানে ১০-১২ জন অফিসার আছে যারা প্রেষণে কাজ করছে। অন্য স্টাফরা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছে। তবে ৩০-৩৪ জনের জনবল নিয়োগ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। তাদের নিয়োগ হয়ে গেলে নিজস্ব জনবল হবে। ভবিষ্যতে হয়তো কাজের ধরন অনুযায়ী আমাদের আরও জনবলের প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে একটা গোয়েন্দা ইউনিট হয়তো প্রয়োজন হবে। সেইভাবে আমরা জনবল নিয়োগ করার চেষ্টা করছি। এছাড়া কমিশনের জন্য চারজন মেম্বার প্রয়োজন। সেখানেও আমাদের শর্ট আছে।

প্রতিযোগিতা কমিশনের মাধ্যমে ভোক্তা কী কী সুবিধা পেতে পারে?

আমরা সাধারণত ক্রেতাদের স্বার্থ আদায়ে কাজ করি। বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা থাকলে পণ্যের দাম ও মান ঠিক থাকবে। এর ফলে ক্রেতা পরোক্ষভাবে লাভবান হবে। আমাদের কাজ হলো বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। একচেটিয়া ব্যবসা ও যোগসাজশ করে কেউ যাতে ব্যবসা না করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা। জোটবদ্ধতা করে কেউ যাতে সরবরাহে বিঘœ সৃষ্টি না করতে পারে, সেই দিকেও খেয়াল রাখবে প্রতিযোগিতা কমিশন।

এখনো বাজার অস্থিতিশীল, বিশেষ করে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে। এই সংকটের কারণ কী?

মূলত সাপ্লাই চেইন ডিজরাপশনের কারণে পেঁয়াজে এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশের পেঁয়াজের বাজার ভারত থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করে। ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণার পরই কিন্তু বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হওয়া শুরু করল। দাম বাড়া শুরু করল। দাম এত বেশি হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ সুযোগটা নিতে পারে। তবে পেঁয়াজ আমদানিকারকদের কাছে তথ্য চেয়েছি।  কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেব।

বাজারের মেনিপুলেশন বন্ধে আপনার পরামর্শ কী?

প্রথমেই বলব, আমাদের নৈতিকতার জায়গা তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়ীরা অবশ্যই লাভ করবে, কিন্তু সেটা যেন অস্বাভাবিক না হয়। মানুষকে কষ্ট দিয়ে যেন মুনাফা না করে। এটা আমাদের প্রত্যাশা থাকবে। সরকার ব্যবসায়ীদের নানাভাবে সাহায্য করছে। পেঁয়াজ আমদানিতে ট্যাক্স ফ্রি করেছে সরকার।

প্রতিযোগিতা কমিশনের এ পর্যন্ত কোনো অর্জন আছে?

বাজারকে স্থিতিশীল করার জন্য এক বছর আগে আমরা উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (বিআইডিএস) দিয়ে পেঁয়াজ ও চালের ওপর স্টাডি করি। আমরা অনেক আগে থেকেই বাজার পর্যবেক্ষণ করছি। সেখানে বিআইডিএস আমাদের কিছু রিকোমেন্ডেশন দিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য যারা যারা কনসার্ন যেমন বাণিজ্য, কৃষি মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংস্থা তাদের সাজেশনস পাঠিয়েছি। তারা ব্যবস্থা নেবে।

 

বাজার নিয়ন্ত্রণে আপনারা কী করবেন?

প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী করতে কাজ করবে বিশেষ এই গোয়েন্দা ইউনিট। মূলত এই ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বাজার মনিটরিং করবে। বাজারে পণ্যের দাম টাইম টু টাইম মনিটরিং করবে। তারা দেখবে বাজারের কোথাও অসুস্থ প্রতিযোগিতা হচ্ছে কি-না। প্রতিযোগিতা আইন কেউ অমান্য করছে কি-না সেটা তারা সরেজমিন গিয়ে দেখবে। আমরা যে প্রবিধান তৈরি করছি, সেটাতে তারা কীভাবে কাজ করতে পারে তা উল্লেখ থাকবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত