উপসচিবরাই বেশি স্বেচ্ছা অবসরে যাচ্ছেন

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৩৩ এএম

জনপ্রশাসনে সরকারের বিশেষ পদগুলোর মধ্যে উপসচিবরা বেশি স্বেচ্ছা অবসরে যাচ্ছেন। এরপরই স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে এগিয়ে অতিরিক্ত সচিবরা। শীর্ষপর্যায়ে পৌঁছানো সচিবরাও স্বেচ্ছা অবসরে পিছিয়ে নেই। তবে চাকরিতে ঢুকেই চাকরি ছাড়ার প্রবণতা সাধারণত কম। অর্থাৎ সহকারী সচিবরা সবচেয়ে কম চাকরি ছাড়ছেন। গত ১০ বছরে প্রশাসন ক্যাডারের স্বেচ্ছা অবসর বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, উপসচিব পদে পদোন্নতি পান মূলত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তবে অন্য ক্যাডারের ২৫ শতাংশ কর্মকর্তাও তাদের লাইনি পোস্ট বাদ দিয়ে উপসচিব হতে পারেন। এ কারণেই উপসচিব, যুগ্ম সচিবঅতিরিক্ত সচিব এবং সচিব পদ হচ্ছে সরকারের বিশেষ পদ। গত ১০ বছরে এই বিশেষ পদ থেকে ৪৭ জন কর্মকর্তা স্বেছা অবসরে গেছেন। তাদের মধ্যে উপসচিব পর্যায় থেকে ১৪ জন ও যুগ্ম সচিব পদ থেকে স্বেচ্ছা অবসরে গেছেন ৬ জন। এ সময়ের মধ্যে ১০ জন অতিরিক্ত সচিব ও ৯ জন সচিব স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। বিশেষ পদ ছাড়া লাইন পোস্টের ৮ কর্মকর্তাও এ সময়ে অবসর নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ জন সহকারী সচিব ও ৬ জন সিনিয়র সহকারী সচিব রয়েছেন।

এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মকর্তারা মূলত রাজনৈতিক কারণে চাকরি ছাড়েন বা স্বেচ্ছা অবসরে যান। সরকারের নীতিনির্ধারকদের নজরে যাওয়ার জন্য অনেক সময় কর্মকর্তারা দলীয় কর্মীদের মতো আচরণ করেন। এতে করে তারা নীতিনির্ধারক মন্ত্রী বা পাওয়ার হাউজগুলোর সমর্থন পান ঠিকই, কিন্তু সরকার পরিবর্তন হয়ে গেলেই তারা বিপদে পড়ে যান। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকে স্বেচ্ছা অবসরে যান। এছাড়া উন্নত জীবনযাপনের আশায় কিছু কর্মকর্তা স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে বিদেশে চলে যান। অনেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। শুরুর পদ সহকারী সচিব বা সিনিয়র সহকারী সচিব পদ থেকে স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়ার ঘটনা কম। কারণ সরকার কর্মচারীদের বেতন কয়েকগুণ বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। উপসচিব থেকে স্বেচ্ছা অবসরে বেশি যান কারণ ওই বয়সে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস থাকে।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক কারণেই প্রশাসনে স্বেচ্ছা অবসরের ঘটনা বেশি ঘটে। মেধা তালিকার নিচের সারির কর্মকর্তারা দলীয় লেজুড়বৃত্তি করেন। তাদের দাপটে মেধাবীরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যান এবং একসময় তারা সরকারি চাকরি ছেড়ে অন্য চাকরিতে ঢুকে পড়েন। তবে স্বেচ্ছা অবসরের আবরণে অনেক সময় কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেয় সরকার। অর্থাৎ ওই কর্মকর্তাকে স্বেচ্ছায় অবসর নিতে বাধ্য করা হয়।

উপসচিব পর্যায় থেকে বেশি কর্মকর্তা স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, উপসচিব হচ্ছে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) মাধ্যমে পাওয়া প্রথম পদোন্নতি। এরপর কর্মকর্তারা প্রেস্টিজিয়াস পদ ডিসি হন। ডিসি হওয়ার জন্য শুরু হয় লবিং। এ সময় কর্মকর্তারা নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ্যে বলে বেড়ান। নিজেদের লোক ভেবে সরকার তাদেরই ডিসি করে। মন্ত্রীদের পিএস নিয়োগ পান উপসচিবরাই। মন্ত্রীরা সাধারণত নিজের পরিচিত কোনো উপসচিবকে তার পিএস করতে চান। কারণ পিএসকে খুবই বিশ্বস্ত হতে হয়। এখানেও দলীয় মতাদর্শ খোঁজা হয়। আর পিএস হওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা কাজ করে। পিএস হলে উপসচিব হয়েও যুগ্ম সচিব বা অতিরিক্ত সচিবের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ থাকে। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর বা অধিদপ্তরের পদোন্নতি, নিয়োগ ও বদলিতে হস্তক্ষেপের অবারিত সুযোগও মেলে। এমনকি মন্ত্রণালয়ে শাখার দায়িত্ব বণ্টনেও পিএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এসব ক্ষেত্রে যেসব কর্মকর্তা যোগ্যতা অনুযায়ী শাখা পান না তারা সংক্ষুব্ধ হতে থাকেন। একই রাজনৈতিক মতাদর্শের কর্মকর্তারাও সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। আর ভিন্ন মতাবলম্বী কর্মকর্তাদের তো কোনো কথাই নেই। ক্ষমতার পরিবর্তন হলে সবাই মিলে সুবিধাগ্রহণকারী ডিসি, পিএস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে যান। তখন সুবিধা গ্রহণকারী ওই কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয় না, তিনি ভালো পোস্টিং পান না, বিদেশ ট্যুর থেকে বঞ্চিত হন। অনেক কর্মকর্তাকে একপর্যায়ে ওএসডি করে রাখা হয়। ওএসডি কর্মকর্তাদের তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। কারণ তাদের কোনো অফিস বা বসার চেয়ার-টেবিল থাকে না। অথচ অফিসের কথা বলেই এসব কর্মকর্তারা প্রতিদিন বাসা থেকে বের হন। এরপর সচিবালয়ে গিয়ে বারান্দায় বারান্দায় ঘুরে বেড়ান তারা। অনেকে বন্ধুদের রুমে বসে সময় কাটান। কিন্তু ওএসডি কর্মকর্তাদের ভালো পদে থাকা কর্মকর্তারা বন্ধু হওয়ার পরও প্রশ্রয় দিতে চান না। ভবিষ্যৎ বিপদের আশঙ্কা থেকে তাদের এড়িয়ে চলেন তারা। পদোন্নতি না পাওয়ায় এসব কর্মকর্তার সামাজিকভাবেও বয়কট করা হয়। এসব কারণে বঞ্চিত কর্মকর্তারা স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে ব্যবসা বা বেসরকারি চাকরি শুরু করেন।

উপসচিবের পর অতিরিক্ত সচিব পদ থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক কর্মকর্তা স্বেচ্ছা অবসরে যান। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, যখন দেখেন কোনোভাবেই সচিব হতে পারবেন না তখন হতাশ হয়ে তারা চাকরি ছেড়ে দেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দেন। যদিও সংশ্লিষ্টরা অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন রাজনৈতিক মতাদর্শের পরীক্ষা দিয়েই। দলীয় কর্মকর্তাদের গুরুত্ব দিতে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে তাদের অতিরিক্ত সচিব করা হয়েছে। আগে অতিরিক্ত সচিবের পদ হাতেগোনা কয়েকটি বড় মন্ত্রণালয়ে ছিল। যেসব মন্ত্রণালয়ে সচিব অতিরিক্ত কাজের চাপে থাকেন তাদের সহায়তা করার জন্য পদটি সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন ছোট-বড় সব মন্ত্রণালয়েই একাধিক অতিরিক্ত সচিবের পদ রয়েছে। মন্ত্রণালয়গুলোতে একাধিক অতিরিক্ত সচিব দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে স্থানীয় সরকার বিভাগে ১৪ জন অতিরিক্ত সচিব দায়িত্ব পালন করছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগে অতিরিক্ত সচিব আছেন ১৩ জন।

সচিব হচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টিং অফিসার। দেশে একটি সেক্টরের প্রধান তিনি। এই জৌলুসপূর্ণ চাকরিও ছেড়ে দেন কর্মকর্তারা। সচিব পর্যায়ে কর্মকর্তাদের চাকরি ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত নীতিগত কারণে সচিব পদ থেকে কর্মকর্তারা ইস্তফা দেন। যখন বুঝতে পারেন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে সেই বিষয়টি অনুমোদন করলে ভবিষ্যতে তিনিও ফেঁসে যেতে পারেন, তখন তারা স্বেচ্ছা অবসরে যান। তারা আরও বলেন, কর্মকর্তারা সচিব পদে পদোন্নতি পান একেবারে চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে। সচিব হওয়ার পর তাদের আর বেশি দিন চাকরি থাকে না। এ কারণে অনেক সচিব অবসরে গিয়ে কী করবেন তা আগেই ঠিক করে নেন। চাকরিতে থাকার সময়ই মন্ত্রণালয়ের স্টেকহোল্ডার বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় চাকরির চুক্তি করেন তারা। এ পরিস্থিতিতে অনেকে স্বেচ্ছা অবসরে গিয়ে সেখানে চাকরি নেন।

যুগ্ম সচিব হচ্ছে সরকারের নীতিনির্ধারণী পদ। এ পদের কর্মকর্তারাই সরকারের পলিসি নির্ধারণ করে থাকেন। তাদের চাকরি ছাড়ার কারণ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক ছাড়া এ পদে পদোন্নতি পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ। কেননা এ পদে পদোন্নতি দেওয়ার আগে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ জানতে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন নেওয়া হয়। অতীতের পদোন্নতির খসড়া তালিকায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সমর্থক কর্মকর্তাদের নামের পাশে ‘এ’, বিএনপি সমর্থক কর্মকর্তার নামের পাশে ‘বি’ এবং জামায়াত সমর্থক কর্মকর্তাদের নামের পাশে ‘বিশেষ চিহ্ন’ রয়েছে। ভিন্ন মতাদর্শের কোনো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি না দেওয়া হলে তার নামের পাশে লেখা হয়, ‘আরও তথ্য প্রয়োজন’। কিন্তু কী তথ্য প্রয়োজন তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জানানো হয় না। সংখ্যায় কম হলেও এই যুগ্ম সচিব পদ থেকেও স্বেচ্ছা অবসরে যান কর্মকর্তারা।

চাকরি আইন অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মচারী চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে স্বেচ্ছা অবসরে যেতে পারেন। ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-এর ৪৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হইবার পর যেকোনো সময় একজন সরকারি কর্মচারী অবসর গ্রহণের অভিপ্রেত তারিখের অন্যূন ৩০ দিন পূর্বে নিয়োগকারী কর্র্তৃপক্ষের নিকট চাকরি হইতে অবসর গ্রহণের অভিপ্রায় লিখিতভাবে ব্যক্ত করিয়া অবসর গ্রহণ করিতে পারিবেন।’ একই আইনের ভিন্ন একটি ধারায় বলা হয়েছে, ‘ব্যক্তকৃত অভিপ্রায় চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে এবং উহা সংশোধন বা প্রত্যাহার করা যাইবে না।’

সাম্প্রতিক সময়ে স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম বরুণ দেব মিত্র। সাবেক এই খাদ্য সচিব জনপ্রশাসনে বিডি মিত্র নামে পরিচিত। চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আট মাস আগে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে স্বেচ্ছায় অবসরে যান তিনি। অথচ তার চাকরি ছিল ২০১৮ সালের ২৮ আগস্ট পর্যন্ত। জানা গেছে, ক্ষোভ থেকেই বরুণ দেব মিত্র স্বেচ্ছা অবসরে গেছেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব থাকাকালে ২০১০ সালে তাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়। এরপর রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগ দিতে তার চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। পরে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের ইকোনমিক মিনিস্টার পদে নিয়োগ পান। দেশে ফিরে তিনি দীর্ঘদিন ওএসডি হয়ে ছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় তদবির করেও পদায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ থেকেই তিনি স্বেচ্ছায় অবসরে যান।

মুক্তিযোদ্ধা সনদ জালিয়াতি করে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর কারণে সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. নিয়াজউদ্দিন মিঞাকে স্বেচ্ছা অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল ২০১৪ সালে। একই কারণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সাবেক সচিব একেএম আমির হোসেন স্বেচ্ছা অবসরে যান। মতপার্থক্যের কারণে সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব হুমায়ুন কবীর ও সাবেক ভূমি সচিব দেলোয়ার হোসেন চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসরে যান। স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়া একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত