ভারতীয় ভাষ্য, পাকিস্তান বিমানবাহিনী ৩ ডিসেম্বর বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে একটি পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতের অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, অবন্তিপুর, উত্তরালাই, আম্বালা ও আগ্রা বিমানঘাঁটিতে বিমান আক্রমণ চালায়। একই সঙ্গে পশ্চিম সেক্টরের অনেক স্থানে স্থলভাগ থেকেও আক্রমণ পরিচালনা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সুলাইমানকি, খেমকরন, পুঞ্চ এবং অন্যান্য অঞ্চলে ভারতীয় অবস্থানের ওপর গোলা নিক্ষেপ করে। পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ তার ডায়েরিতে লেখেন ইস্টার্ন কমান্ডকে কোনোভাবে অবহিত না করে পাকিস্তান অতর্কিতে স্থল আক্রমণের বদলে ভারতে বিমান আক্রমণ শুরু করে দিল।
পাকিস্তানি আক্রমণের খবর শুনে প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী দিল্লিতে ফিরে রাতে মন্ত্রিপরিষদের জরুরি বৈঠকে বসেন।
রাত ১১.৫০ মিনিটে ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানের বিমানঘাঁটিতে প্রতিশোধমূলক আক্রমণ পরিচালনা করে। ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানের চান্দোরি, শিয়ালকোট, সারগোদা, মিয়ানওয়ালি, মাসরুর (করাচির কাছে) রিসালওয়ালা (রাওয়ালপিন্ডির কাছে) এবং চঙ্গা মঙ্গা (লাহোরের কাছে) বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়, সারগোদা বিমানঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৪ ডিসেম্বর ৪ দিনের শুরুতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘আমাদের দেশ ও জনগণের মহাদুর্যোগের মুহূর্তে আমি আপনাদের উদ্দেশে বলছি যে, ৩ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর পাকিস্তান আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নেমে পড়েছে। আজ বাংলাদেশের যুদ্ধ ভারতের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা পাকিস্তানের কা-জ্ঞানহীন ও প্ররোচনাবিহীন আগ্রাসন যথাযথ ও চূড়ান্তভাবে নস্যাৎ করবে।
পাকিস্তানও আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। একই দিন নিরাপত্তা পরিষদে পোল্যান্ডের প্র্রস্তাবে অস্ত্রবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলা হয়, তবে পাকিস্তান তা প্র্রত্যাখ্যান করে।
৫ ডিসেম্বর নিয়াজি ডায়েরিতে লিখলেন, সেনা সদর দপ্তর থেকে হুকুম দেওয়া হয়Ñ যেন আমরা ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের সৈন্যদের এখানেই ব্যস্ত থাকতে বাধ্য করি, যাতে তাদের পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানো না যায়। কাজেই আমাকে পর্যাপ্তসংখ্যক সৈন্য দিনাজপুর, রংপুর, খুলনাসহ বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধবিরতির পূর্ব পর্যন্তÍ ভারতীয়দের ব্যস্ত রাখার জন্য অবস্থান করাতে হচ্ছে যা রাজশাহী সেক্টরে আমার আক্রমণ পরিকল্পনাকে ব্যাহত করে। সেনা সদর দপ্তর থেকে আমাকে জানানো হয় যে আমরা শিগগিরই চীনের সাহায্য পেতে যাচ্ছি। এটা ছিল একটা প্র্রহসন, আমাদের ভুলপথে পরিচালিত করার একটি চিত্র; বাস্তবে এর কিছুই ঘটেনি।
পূর্বাঞ্চলে ভারতীয় সেনারা বিভিন্ন স্থান দিয়ে বাংলাদেশের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিলে অনেক জায়গা শত্রুমুক্ত করে। ভারতীয় নৌবাহিনীর ইস্টার্ন ও ওয়েস্টার্ন ফ্লিট সমুদ্রে নিজ নিজ মিশন সম্পন্ন করছে, শত্রুর যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করেছে এবং পশ্চিম পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সমুদ্র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
৬ ডিসেম্বর একাত্তর : ৫-৬ তারিখ রাতে আর্টিলারি রেজিমেন্টের সমর্থনপুষ্ট দুই ব্রিগেডের একটি বাহিনী চাম্ব সেক্টরে ভারতীয় এলাকায় দুবার আক্রমণ চালালে তা প্রতিহত করা হয়েছে। বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিলে আরও এলাকা মুক্ত করেছে।
ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে খুলনা, চালনা ও মোংলা বন্দরে, চট্টগ্রাম বিমানঘাঁটি ও সংলগ্ন সামরিক স্থাপনায় গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। মুক্তিবাহিনী লালমনিরহাটে প্রবেশ করেছেÑ মুক্তিবাহিনীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতীয় বাহিনী যুদ্ধ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী সংসদে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন।
৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতির সংবাদ নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রীকে মিসেস প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি:
হিজ এক্সিলেন্সি মিস্টার তাজউদ্দীন আহমদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মুজিবনগর।
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী
...আমি হৃষ্টচিত্তে আপনাকে জানাতে চাই, বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে নিশ্চয়ই তার আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ সকালে এ বিষয়ে আমি আমাদের সংসদে একটি বিবৃতি দিয়েছি।
বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভুগতে হয়েছে। আপনার তরুণ ছেলেরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মবলিদানের সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতের জনগণও একই আদর্শের প্রতিরক্ষায় লড়ে যাচ্ছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে এই শ্রেষ্ঠতম উদ্যোগ এবং আত্মদান ভালো কাজের জন্য আমাদের আত্মনিবেদনকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দুদেশের জনগণের বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখবে। যা হোক, পথ যত দীর্ঘই হোক, আত্মদান যত বেশিই হোক, আমাদের দুদেশের মানুষের ভবিষ্যতে ডাক পড়বে, আমি নিশ্চিত আমরাই বিজয়ী হব। ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে, আপনার সহকর্মীদের এবং বাংলাদেশের বীর জনতাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ নিচ্ছি। আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিজ এক্সিলেন্সি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আমার সর্বোচ্চ সম্মানের নিশ্চয়তা জ্ঞাপন করবেন।
আপনার একান্ত ইন্দিরা গান্ধী
তার পরের ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটে যায় । একটার পর একটা শহর মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠতে থাকে। ১০ ডিসেম্বর নিয়াজি লিখেন: জাতিসংঘের প্র্রতিনিধির কাছে যুদ্ধবিরতি, ক্ষমতা হস্তান্তর, পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের পশ্চিম পাকিস্তানে প্র্রত্যাবাসন সংক্রান্ত একটি নোট হস্তান্তরের জন্য গভর্নর মালেক প্র্রেসিডেন্টের অনুমোদন চান।
প্র্রেসিডেন্টের অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে গভর্নরের উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী অত্যন্ত গোপনীয় এ বার্তা জাতিসংঘ প্র্রতিনিধির হাতে তুলে দেন, আর সেই প্র্রতিনিধি বিষয়টি জাতিসংঘকে জানান। আমাকে কিংবা গভর্নরকে না জানিয়েই ফরমান ভারতীয় কমান্ডার ইন চিফের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন।
সোভিয়েত হুমকি
দিল্লিতে নিযুক্ত সোভিয়েত দূত পেগভ বলেন, চীন যদি হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন সিনকিয়াং-এ পাল্টা অপারেশন চালাবে, তিনি আরও বলেন, ঢাকা স্বাধীন হওয়ার পর যখন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হবে তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে এবং বর্তমান সংকট নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে। অপর একটি গোয়েন্দা প্র্রতিবেদন সোভিয়েত উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভ্যাসিলি কুজনেতসভের ভারত মিশন থেকে জানতে পেরেছে ভারতের আকস্মিক আক্রমণের পর সাফল্য লাভে বিলম্বের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন অসন্তোষ প্র্রকাশ করেছে।
কুজনেতসভ নয়াদিল্লি পৌঁছে ভারতীয় কর্মকর্তাদের বলেন, আগে বেঁধে দেওয়া দশদিন সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ব্যর্থতায় ক্রেমলিন অধৈর্য হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘসময় ধরে চলে অস্ত্রবিরতির প্র্রস্তাবে সোভিয়েত ভেটো গুরুত্ব হারাবে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিরতির যে-কোনো প্র্রস্তাবেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্র্রয়োগ করতে থাকবে, তবে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে।
কুজনেতসভ তার মস্কো প্র্রত্যাবর্তনের সময় পিছিয়ে দেন, তিনি সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব লিওনিদ ব্রেজনেভের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছেন। কারণ ভারত অনুরোধ জানিয়েছে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন যেন বাংলাদেশের সঙ্গে একটি সামরিক চুক্তি সম্পাদন করে। কুজনেতসভ জানিয়েছেন এ বিষয়ে নির্দেশনা চেয়েছেন কিন্তু ব্রেজনেভ মস্কোতে না থাকায় হুকুম পেতে দেরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের যে যুদ্ধ ভারতের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, সেই যুদ্ধটা জিততেই হবে।
