বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পুঁজি ও কর্ত„ত্ববাদের টিকে থাকার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির কাঁচামাল হচ্ছে মানুষ। প্রযুক্তি-পুঁজির এই আধিপত্যে মানুষ জিম্মি হচ্ছে। শাসকশ্রেণি উন্নয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির জয়গান গেয়ে যে ‘উন্নয়ন মোহ’ সৃষ্টি করছে আর মানুষ নিরাপদ ও উন্নত জীবনের আশায় খুব আয়েশ করে বন্দি হচ্ছে সেই ফাঁদে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসকশ্রেণি, সন্ত্রাসী সংগঠন ও মাফিয়া চক্র স্বীয়স্বার্থ উদ্ধার করছে। অন্যদিকে সমস্ত নির্মমতার শিকারে পরিণত হচ্ছে ও অধিকারহীনতার শৃঙ্খলে বন্দি হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
প্রযুক্তি বেশ কিছু উপায়ে কর্তৃত্ববাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নাগরিকদের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার হ্যাকিং পদ্ধতি বা এসব প্রযুক্তি-পণ্যে গোপনে আড়িপাতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য থেকে সব ধরনের গোপনীয় তথ্য অন্যের কাছে চলে যাচ্ছে। মোবাইল ফোনে স্পাইওয়্যার বা গুপ্তচর প্রযুক্তি ঢুকিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে– ব্যবহারকারী সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র টেরও পাচ্ছে না। গবেষকরা বলছেন যে, এর মাধ্যমে হ্যাকাররা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ফোনের মাইক্রোফোন থেকে শুরু করে ক্যামেরা, ফেইসবুক, মেসেঞ্জার, অনলাইন ব্লগ, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জার থেকে শুরু করে সব কিছুতেই এই স্পাইওয়্যার দিয়ে নজরদারি চালাতে পারে। এরকম স্পাইওয়্যার তৈরিকারী বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ইসরায়েলি কোম্পানি- এনএসও গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও গ্রুপের কাছে এই স্পাইওয়্যার বিক্রি করে শত শত কোটি ডলার মুনাফা কামিয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর ‘লুক আউট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান জানাচ্ছে, এই ‘স্পাইওয়্যার’ সফটওয়্যার অত্যন্ত গোপনীয়তাসহ কাজ করে ফলে কোনো ব্যক্তি বিন্দুমাত্র টেরও পায় না। এটি তথ্য আদান-প্রদানের সময় নয়, মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে থাকা অবস্থাতেই তথ্য হাতিয়ে নিতে সক্ষম। এটি মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের যাবতীয় রকমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হওয়ার ফলে শনাক্ত করা কঠিন। ‘লুক আউট’ জানাচ্ছে যে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইলের মাইক্রোফোন ও ক্যামেরা অন করে ব্যবহারকারী চারপাশে যা ঘটছে সবকিছুই রেকর্ড করার মাধ্যমে জেনে নিতে পারে। মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে থাকা ছবি, কনট্যাক্ট, ক্যালেন্ডার, ই- মেইলের তথ্যসহ যত রকমের ডকুমেন্ট থাকে সবই হাতিয়ে নিতে পারে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে মোবাইলের জিপিএস অন করে ব্যবহারকারীর গতিবিধি অনুকরণ করা যায় খুব সহজেই। এক কথায় বলা যায়, এই স্পাইওয়্যার প্রযুক্তির একটি ‘মারাত্মক অস্ত্র’– যার কোনো নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আর এর প্রায় অধিকাংশই ব্যবহার হচ্ছে, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দমনের জন্য, সাংবাদিকদের ফোনে আড়িপাতার ড়্গেত্রে, আইনজীবীদের নথি ফাঁস করতে, সরকারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন ও জনমত গঠনের ড়্গেত্রে অ্যাক্টিভিস্টদের ধরতে এবং নাগরিকদের জীবনযাপনের সার্বিক বিষয়ে নজরদারি করতে।
‘সিটিজেন ল্যাব’র গবেষকরা বলছেন, এটি এমন সফটওয়্যার যার মাধ্যমে কর্ত„ত্ববাদী সরকার, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, সন্ত্রাসী গ্রুপ ও মাফিয়া চক্র তাদের টার্গেটকৃত যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর খুব সহজে ও অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে নজরদারি চালাতে পারে। ফলে খুব সহজে ভিন্নমত দমানো এবং প্রমাণহীন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ঠিক একই কাজ করছে চীন সরকার উইঘুরদের সঙ্গে। দেশটিতে উইঘুরদের মোবাইলে একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ সংযুক্ত করে দিচ্ছে। যার মাধ্যমে ব্যবহারকারী কখন কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কার সঙ্গে আছে তথা ব্যক্তিজীবনের সব বিষয়ে নজরদারি করছে। যদি সন্দেহজনক মনে হয় তখন তাকে হঠাৎ করে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২৫ লাখ উইঘুরের তথ্য চীন প্রশাসন হাতিয়ে নিয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উদ্বেগজনক রিপোর্টও প্রকাশ করেছে। একই কাজ করছে ভারত সরকার কাশ্মীরিদের আন্দোলন দমানোর জন্যেও। সেখানে সন্দেহজন প্রত্যেক ব্যক্তির মোবাইলে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে খবরদারি চালানো হচ্ছে। ইসরায়েল, সৌদি, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসকরা নাগরিকদের ওপর এভাবে খবরদারি চালাচ্ছে। ফলত নাগরিক-অধিকার আন্দোলনকারীরা, অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিরোধীদের ও আইনজীবীরা দমন-নির্যাতনে শিকার হচ্ছেন। এই স্পাইওয়্যার প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর বিক্রয় ও অন্যান্য নীতিমালা স্পষ্ট নয়। তাই অর্থের বিনিময়ে তারা এই প্রযুক্তি যে কারও কাছে বিক্রি করছে।
বর্তমানে মুখচ্ছবি শনাক্তকারী প্রযুক্তি নজরদারি করার জন্য খুব ব্যবহার হচ্ছে। বায়োমেট্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের মুখের বিভিন্ন সময় ও ইমোশনের আকৃতি শনাক্ত করার মাধমে ব্যক্তির আবেগ বুঝে নজরদারি চালানো হচ্ছে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। ‘ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম’র আওতায় ‘আর্টিফিশিয়াল ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ (ইমোশনাল এআই) ও ‘ফেসিয়াল অ্যাকশন কোডিং সিস্টেম’র মাধ্যমে একজন মানুষ কখন, কোন পরিস্থিতিতে থাকে তার মুখচ্ছবির মাধ্যমে শনাক্ত করে তার ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে ‘ফেসিয়াল অ্যালগরিদম’র কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির জেডকেটেকোর এফআই৭১০ মডেলে বুলেট মাল্টি ফাংশনাল ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা। এই ক্যামেরাটি ৩৬০ ডিগ্রি কোণে ২০ হাজার মানুষের ভিড়েও নির্দিষ্ট ব্যক্তির চেহারা শনাক্ত করতে সক্ষম এবং চেহারা সরাসরি রেজিস্ট্রেশন করেও রাখা সম্ভব।
২০১৭ সালের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী এমন ক্যামেরা বসানো হয়েছে আড়াই কোটিরও বেশি। এর অন্তত ২০ ভাগ রাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্কভুক্ত। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ ধরনের ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ ও তথ্য বিক্রির বাজার ছিল ২৮ হাজার মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই অর্থ বৃদ্ধি পাবে ৮৭ হাজার মিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে বিশ্বে ‘ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম’র প্রযুক্তির সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে। চীন ২০১৭ সালে দেশ জুড়ে নিজস্ব প্রযুক্তির উদ্ভাবিত ১৭ কোটি ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা বসিয়েছে; যা ২০২০ সালে ৪০ কোটিতে উন্নীত করা হবে। জিনজিয়াং-এ প্রতি ১ হাজার মানুষের বিপরীতে ১৫৯টি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। সাংহাইয়ে এর সংখ্যা হাজারপ্রতি ১১৩টি। এছাড়াও হংকংয়েও এর ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। লন্ডনে প্রতি হাজারে ৬৮টি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এই প্রযুক্তির কদর দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের হাতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপায়ে ৪১ কোটি মানুষের মুখচ্ছবিসহ বিস্তর তথ্য চলে গেছে। এরকম তথ্য সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। আশঙ্কা হচ্ছে, এরকম তথ্য খুব সহজেই সন্ত্রাসী ও মাফিয়া গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন অপরাধীদের হাতে চলে যেতে পারে। রাষ্ট্রের কাছে এবং এমন সন্ত্রাসী ও মাফিয়া চক্রের হাতে নাগরিকদের ব্যক্তিজীবনের গোপনীয় তথ্য চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে এই ‘ফেসিয়াল রিকগনিশন’ প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি সেখানকার পুলিশও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না।
সম্পªতি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মোবাইল বা সিম কিনতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশন করতে হচ্ছে। এর ফলে নাগরিক তথ্য খুব সহজে রাষ্ট্রের হাতে যাচ্ছে। এই তথ্য ব্যবহার করে নাগরিকদের ব্যক্তিজীবনের গোপনীয় তথ্যও খুব সহজে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি চীনে মোবাইল রেজিস্ট্রেশন করার সময় মুখের ছবি স্ক্যান করতে হচ্ছে। দেশটি নাগরিকদের এসব কিছু তথ্য সংগ্রহ করে ‘ফেসিয়াল রিকগনিশন’ পদ্ধতি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নাগরিকদের পুরো ডাটাবেজ তৈরি করার কর্মসূচি নিয়েছে। সম্প্রতি হংকং বিক্ষোভে মুখ ঢাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকারীদের পরিচয় শনাক্ত করা। উইঘুরদের ওপর চীন সরকারের নির্যাতনের কারণে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র চীনের ২৮টি কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি নজরদারি প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও বিক্রেতা কোম্পানিও রয়েছে। এর পেছনে যতটা মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতা কাজ করেছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় চীনকে রুখে দেওয়া।
বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বে মানুষ ও মানবমন বড় পুঁজি। তাই মানবজীবনের সার্বিক তথ্য যার কাছে যত বেশি সে তত বেশি শক্তিমত্তা নিয়ে আধিপত্য ও সাম্রাজ্য বিস্তার এবং টিকিয়ে রাখতে পারবে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও প্রযুক্তির সুফলের জয়গানে নাগরিকদের মধ্যে ‘ফ্যাসিনেশন’ সৃষ্টি করে ক্ষমতা ও শক্তির মহড়ায় মানুষের স্বাধীনতা নাগালের বাইরেই রাখা হচ্ছে, মানুষ হচ্ছে জিম্মি।
লেখক
সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
[email protected]
