জোকারের রাজনীতি

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:০৪ পিএম

মাল্টিপ্লেক্সে ‘জোকার’ দেখছিলাম। একটা দৃশ্যে জোকার আর্থার পুরনো ক্ষোভ থেকে নৃশংসভাবে এক সহকর্মীকে মেরে ফেলে। ঘটনাস্থলে থাকা খর্বাকৃতির অন্য সহকর্মী মনে করে তাকেও মেরে ফেলবে। ভয় পেয়ে মানুষ কত কিছুই করে! দর্শক হিসেবে গা শিরশির করারই কথা সাধারণত। অথচ আশপাশ থেকে থেমে থেমে হাসির আওয়াজ আসছিল। যদিও আর খুন করে না জোকার। কারণ ওই মানুষটি আকারে ছোট হলেও মনে বড়!

প্রশ্ন আসতে পারে, মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া মানুষের ভয় দেখা কি হাসির? উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে ট্র্যাজেডি আর কমেডির ফারাক আমরা ভুলে গেছি। শুধু শিল্পের খাতিরে! উল্টোভাবে, বাস্তব হলো সিনেমা হলের বাইরে ঘটে তারই অনুরূপ কিছু। এখন প্রশ্ন হলো, মানুষ খুন কেন করবে? অজুহাত হিসেবে স্রেফ ন্যায়যুদ্ধ বা প্রতিশোধ। নিশ্চয় না। বিনোদনও নিশ্চয়। নইলে খুনের পদ্ধতিতে এত এত কারিশমা কেন বা কিছু কিছু খুনে মানুষ আনন্দ পায় কেন এবং এই দর্শকরাই হয়তোবা কেউ কেউ আনন্দ-সহযোগে খুনের বিচার যখন চায় তখন বীভৎস কায়দায় খুনের কথা বলে! তারা মূলত খুন করার কথাই বলে। প্রতিশোধ বা ন্যায়বিচার হলেও আগের খুনের সঙ্গে পরেরটার প্রতিস্থাপন করা যায় না। তাহলে জোকারের কাজ কি এই?

পপ কালচারের এই অ্যান্টিহিরোর সঙ্গে ড্রাকুলা বা ফ্রাংকেনস্টাইনের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যারা পশ্চিমা সমাজের ভয়গুলোকে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তুলে ধরেছে। তাদের রীতিমতো উদ্যাপন করা হয়। তবে জোকার বা সার্কাসের সঙকে হাসির পাশাপাশি ভয়ের প্রতীক আকারে দেখা অনেক পুরনো ঘটনা। শেক্সপিয়ারের নাটকে পাবেন বুদ্ধিমান কিন্তু বোকার বেশ ধরে রাখা চরিত্র। যারা অনেকটা জোকারের মতো দ্ব্যর্থক। সাম্প্রতিক সময়ে স্টিফেন কিংয়ের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘ইট’ সার্কাসের জোকারকে ভয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। ভয়ের অন্যতম কারণ এই চরিত্রগুলো বরাবরই নিজের কাল্পনিক সমাজের তুলনায় বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সেসব প্রশ্ন আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না।

কিন্তু পপ কালচারের অন্য চরিত্রের সঙ্গে জোকারের পার্থক্য আছে। তার ক্ষেত্রে ন্যায্যতার প্রশ্নটি আলাদা। জোকারের এই উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, একসময় জীবনকে ভেবেছিল ট্র্যাজেডি, আসলে তা ছিল কমেডি। অর্থাৎ, তীব্র বেদনা ও কৌতুক এক জায়গায় মিশে গেছে। সেটা হলো মানুষের জীবন। যখন দর্শক হাসে, তখন জোকারকে হাসতে দেখা যায় না। সিনেমার শেষে যখন নৈরাজ্য চূড়ান্ত অবস্থায় যায়, নিজের ঠোঁটে রক্ত মেখে হাসির ভান করে। অর্থাৎ, গোথাম শহর শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুহূর্তে এই মনোভাব। যখন শাসনযন্ত্র জনগণের গলায় ফাঁসের মতো চেপে ধরে। তখন যে মূলত কাঁদতে ভুলে যায়, হাসতে থাকে-প্রলাপ বকে। প্রথামাফিক হাসি-কান্না এক অর্থে পুরনো প্রতিষ্ঠানকে জিইয়ে রাখা। কিন্তু সে নিজে নিজে ভেঙে পড়ে। জোকার উপলক্ষ মাত্র?

এখানে জোকার বা তার মতো আরও যারা, তারা বিদ্যমান সমাজ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলে। একে সারানো যাবে না মনে করেই নাস্তিবাদী ভূমিকা নেয়। জোকার সিনেমার

নাস্তিবাদিতায় সৃষ্ট দুটো ভয় আমাদের ঘিরে ধরে। একদিকে যেমন বিপুল ভয় গ্রাস করে, অন্যদিকে রয়েছে ‘নেতৃত্বহীন’ একটা আন্দোলন। সম্ভবত সমাজে সব মানুষ নিজ নিজ খেয়ালে চলবেÑ এই ভয় মানুষের অনেক দিনের, যা সহসা স্বেচ্ছাচারে পর্যবসিত হওয়ার ভয় তার। এ কারণে কোনো কোনো খারাপ শাসনকে আমরা তুলনামূলকভাবে মেনে নিই। এমনকি চরম ফ্যাসিবাদী সময়েও একটা অনুমিত কর্র্তৃপক্ষের হাতে ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত দেখলেও এতটা হতাশ হই না। এরপর জোকার যখন ক্ষোভ প্রকাশ করে পুরনো ব্যবস্থাকে উল্টে দেওয়ার। এটা হয়তো কল্পনায় সুখকর, কিন্তু বাস্তবিক নৈরাজ্য ভীষণ ভীতিকর। কারণ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

সেদিক থেকে ‘জোকার’ সেজে থাকা বা এর ‘ধারণা’ সাংঘাতিক ব্যাপার। আপাতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেখলেও সে আরও গভীরে হানা দেয়। যার ওপর বর্তমান গণতান্ত্রিক কাঠামো সেই সামাজিক চুক্তি মতবাদকে চ্যালেঞ্জ করে। ‘মানুষ স্বভাবত খারাপ’ এই অনুমানের ভেতর দিয়ে হবস-লক-রুশোর মারফত সামান্য তফাতের ভেতর দিয়ে চুক্তির ধারণাটা আলাদাভাবে আমরা পাই। জোকারের মতে, এই চুক্তির ফলে মানুষ প্রকাশ্যে (সমাজ-সমর্থিত) ভালো কাজ করে। আর গোপনে সুযোগ পেলে অন্যের মাংসেও তার অরুচি নেই। মানুষের এই অবস্থা তার কাছে হিপোক্রেসি। শুধু তা-ই নয়, বিদ্যমান সমাজ সবার তরে ভালো এমন অসিলা দিয়ে কিছু লোককে ‘খারাপ’ ট্যাগ দিয়ে মেরে ফেলে। বিচারেরও মুখোমুখি করে না। প্রতিবাদ তো দূরের জিনিস, একই রকম খবর বারবার মিডিয়ায় উৎপাদিত হয়। এভাবেই ভাবা যায় সামাজিক চুক্তির আগে অন্তত কিছু জিনিস ছিল না জনগণের নামে সমাজ বা রাষ্ট্রের সম্মতিতে অনাচার ও অপরাধ ছিল না। এই অনাচারের রক্ষাকবচ হিসেবে থাকে রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ, আইন ও জাতীয় চেতনা। তো, যে মানুষ ‘স্বভাবত খারাপ’ ও ‘স্বার্থপরতা’র কারণে সামাজিক চুক্তি করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছে বলে যায়, সেই মানুষ ওই চুক্তির দোহাই দিয়ে খুনখারাবি করছে। যেন বলি দিয়ে সমাজ শুদ্ধ হচ্ছে! এই ভাবনার মধ্যে মানুষ সম্পর্কিত আগাম অনুমানে কি গরমিল নেই? এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে স্বার্থপরতার পথে ঠেলে দেয় না?

এমন সমস্যা ছাড়াও জোকারে জটিলতা আরও আছে। এই ব্যবস্থাগুলো যখন ফ্যাসিবাদী বা জাতীয়তাবাদী ধারণার মধ্যে চালিত হয় আমাদের দেখাদেখি মূলত বাইনারি। ভালো বা মন্দ, সাদা বা কালো, বন্ধু বা শত্রু এভাবে ভাগাভাগি। উল্টোদিকে জোকার মানুষকে স্বরূপে বিচার করতে বলে। যেখানে জাহের-বাতেনের ভাগাভাগি করা চুক্তি থাকবে না। জোকারের মুখোশটাই দেখুন যখন সে কাঁদছে মেকআপ বলছে হাসছে। এমনকি অসুস্থতার কারণে যখন সে হাসি থামাতে পারে না সেটা অন্যরা মেনে নিতে পারে না। অসুস্থ, উন্মাদের ঠাঁই নাই এই সমাজে। উন্মাদের অন্তর্দৃষ্টিও সামাজিক চিন্তার অংশ। তো, একপর্যায়ে বাইনারি সিস্টেম কলাপস করে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ আরও বেশি আত্মসচেতন ও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

কিন্তু রাষ্ট্র কেন এমন বাইনারি জায়গায় থাকে? তার নিশ্চয় অনেক কারণ থাকে। যেখানে একটি সভ্যতার শুরু আর শেষ আছে। জোকারের সময় রাষ্ট্র আর কল্যাণমূলক জায়গায় নেই। একের পর এক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে দুর্নীতিবাজ আমলা, রাজনীতিবিদ, পুলিশ ও ব্যবসায়ী। সরকার মূলত তাদের স্বার্থ দেখভালের ঠিকাদারি করে। হ্যাঁ, জনকল্যাণের বাস্তবতা ততটুকুই, যতটা ঠিক করে দেয় করপোরেশন। এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা আসলে নেতৃত্ব তৈরি হতে না দেওয়া। যাতে করে কোনো পরিস্থিতিতে মানুষ এক না হতে পারে। কিন্তু মানুষের স্বভাব হলো একত্র হওয়া। বিপদের সময় গায়ে গা লাগিয়ে উত্তাপ নেওয়া। তখন মানুষগুলো আলাদা আলাদা হয়েও একত্রে থাকে। তাদের মধ্যে নৈরাজ্য তৈরি হয় বলে দাবি করি। জোকার আমাদের নেতৃত্বের ইশারা দেয় না। কিন্তু এখানে যে সংহতি আছেÑ তার নাম কী? এরা বরং বিদ্যমান পক্ষগুলোকে ধ্বংস বা নির্মূলের কথা বলে। আগেই বলেছি, এটা যেন সেই আত্মবিধ্বংসী সিস্টেম, যা নিজেই নিজেকে খেয়ে ফেলছে। জোকার সেই সিস্টেমের অংশ। সে থাকে বলেই হয়তো নতুন কিছু করার কথা ভাবতে হয়। কারণ ন্যায্যতা তো তখন পরিপূর্ণ হয়, যখন সমাজের একদম প্রান্তিক জায়গায় তার আলো পৌঁছায়। কিন্তু এমন সময় তো আসে তখন গরিব, প্রান্তিক মানুষদের অস্বীকার করাই রাষ্ট্রের মূল চরিত্র হয়ে ওঠে। মিডিয়া তাদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে, যা ওই সিস্টেমের নিজেরই আত্মঘাতী প্রবণতা।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত