যুদ্ধদিনের প্রিয়বন্ধু ইন্দিরা গান্ধী

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:৫৭ এএম

একাত্তরে ইন্দিরা গান্ধী যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী না থাকতেন, প্রধানমন্ত্রী হতেন সম্ভবত মোরারজি দেশাই কিংবা চরণ সিং কিংবা জগজীবন রাম। রামস্বামী কামরাজ ও গুলজারিলাল নন্দাও প্রধানমন্ত্রী পদ-প্রত্যাশীদের মধ্যে ছিলেন। পরের পাঁচজনের যে কেউ প্রধানমন্ত্রীর আসনে থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মতো বিশাল ঘটনাটি আরও পিছিয়ে যেত। তাদের মধ্যে যিনিই প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসুন না কেন, অন্তর্দলীয় দ্বন্দ্ব ও আঞ্চলিক ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াইয়ে তাকে একটি দুর্বল সরকারের নেতৃত্ব দিতে হতো, তাদের কারোরই সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্যতা ছিল না, বাংলাদেশ সংকটের প্রতি বিশ্বকে আকৃষ্ট করার মতো ব্যক্তিত্বও তাদের ছিল না।। তাদের কেউই রক্ষণশীল চরিত্র নিয়ে দেশীয় সংকট পাশ কাটিয়ে অথবা মোকাবিলা করে, নিক্সনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সংকট নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো অবস্থায় থাকতেন না।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থরক্ষা করে, বিশ্বজনমত পক্ষে এনে, একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত যুদ্ধ জিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ইন্দিরা গান্ধী যেমন সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন, তেমনি পাকিস্তানকে দু’খ- করে ভারতের পূর্ব-সীমান্তকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ আক্রমণের ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করেছেন।

১৯৭১ সাল ইন্দিরার জন্য ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ ও চরম সাফল্যের বছর। তিনি তখনকার পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা প্রায় ১০ মিলিয়ন শরণার্থী সামলেছেন, এটাকে পুঁজি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক  ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন করে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ও আস্থা অর্জন করেছেন।

১৯৭১-এর ডিসেম্বরের যুদ্ধের যে আর্থিক ব্যাখা দেওয়া হয় প্রায় এক কোটি শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদি লালন-পালনের যে ব্যয় তার চেয়ে বরং যুদ্ধে নেমে পাকিস্তানকে দু’খ- করে শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো অধিকতর অর্থবহ; কার্যত আর্থিক সাশ্রয় আরও অনেক বেশি।

বাংলাদেশের শরণার্থীর বোঝা কাঁধে নিয়ে, বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে ভারতের অভ্যন্তরে স্থান দিয়ে, সর্বোপরি মুক্তিবাহিনী গঠনে সার্বিক সহায়তা দিয়ে ইন্দিরা গান্ধী অকংগ্রেসীয়দের সমালোচনার মুখে যেমন ছিলেন, নিজ দলের রক্ষণশীলরাও তাকে ছাড় দেননি। নিক্সন-কিসিঞ্জারের হুমকি ও রূঢ় আচরণের মুখেও তিনি অনড় ছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে ম্যান্ডেট দিয়েছিলÑ বিস্ময়কর সেই ম্যান্ডেট থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন। গত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের জন্য জনগণ আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যান্ডেটের তুলনায় তা কিছুই নয়।

ইন্দিরা গান্ধী বলেন, গত ২৫ মার্চ সেনাবাহিনী যখন আক্রমণ চালায়, গত ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী এ দলটিকে সেনাশাসকরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

পূর্ব পাকিস্তান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা ভালো করে চোখ মেলে সমস্যাটিকে  দেখছে না। বাংলাদেশের সামরিক শাসনকে ঠেকা দিয়ে রেখে কোনোভাবেই পাকিস্তানকে শক্তিশালী করা হচ্ছে না।’

এয়ার ভাইস মার্শাল কপিল কাক (অব.) লিখেছেন, ভারতের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং কল্যাণের পথে সবচেয়ে বড় হুমকি ২৫ মার্চের পর পাকিস্তান ছেড়ে আসা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর অনিঃশেষ স্রোত। ২১ এপ্রিল সেখানে শরণার্থীর সংখ্যা আড়াই লাখ, ১৪ মে তা বেড়ে ১৪ লাখ ৮০ হাজার। অধিকাংশই জড়ো হয়েছে পশ্চিম আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, তারা ‘ভিকটিমস অব ওয়ার’Ñ সামরিক সন্ত্রাস থেকে বাঁচতে এখানে আশ্রয় নিয়েছে।

আই এন দীক্ষিত লিখেছেন ‘পূর্ব বাংলার সংকট মোকাবিলার জন্য সরকার দ্বিমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রথমত, পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন জানায় যাতে পাকিস্তান ১৯৭০ এর নির্বাচনের ম্যান্ডেট মেনে নিতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করে। দ্বিতীয় উদ্যোগটি যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তান সমর্থনের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। অধিকন্তু পাকিস্তানের পক্ষে চীনের ওকালতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন নতুন আঁতাত ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ভারতের সামনে তখন দুটো বিকল্প। সরাসরি পশ্চিম পাকিস্তানকে সামরিকভাবে সাহায্য করে পূর্ব বাংলার বিদ্রোহ দমন করা অথবা সরাসরি বাংলাদেশকে সাহায্য করা যাতে স্বাধীন দেশ হিসেবে এর অভ্যুদয় ঘটতে পারে।

কে সুব্রামানিয়ামের যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য হয় যে, এক কোটি শরণার্থী লালন-পালনের যে ব্যয়, যুদ্ধের ব্যয় তার চেয়ে কম। ভারত এই হিসাবটি সনাতন অর্থনীতির লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণ দিয়ে করেনি, সমকালীন পৃথিবীর অনেক যুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কাহিনীও সামনে নিয়ে এসেছে।

তিন বাহিনীর কাজে কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে অবদান রেখেছে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী। ভারতীয় বিমান বাহিনী দুদিনেই পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ দখল করে নিল। আর এতেই পাঁচ ডিভিশন শক্তিশালী ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি সেনাঘাঁটি ও ক্যান্টনমেন্ট পাশ কাটিয়ে ফেরি-সেতু নিরাপদে পেরিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল। রকেট আক্রমণ হলো গভর্নর হাউজে, গভর্নর পদত্যাগ করলেন। আত্মসমর্পণ করল ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য।

একাত্তরের সাফল্যের মুকুট ইন্দিরার। তার সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম, তিনবাহিনী প্রধান জেনারের স্যাম মানেক শ’, এয়ার চিফ মার্শাল প্রতাপ লাল, অ্যাডমিরাল এস এম নন্দা, প্রতিরক্ষা সচিব কে বি লাল, পররাষ্ট্র সচিব টি এন কাউল, গোয়েন্দা প্রধান আর এন কাউ, পলিসি প্ল্যানিং প্রধান ডিপি ধর আর বিশ^স্ত মুখ্য সচিব পিএন হাকসার।

খুশবন্ত সিং লিখেছেন, যখন তিনি বুঝতে পারলেন সংকট শিখরে পৌঁছেছে, তিনি বিচক্ষণতার প্রমাণ দিলেন। যেমন যখন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ হাইজ্যাক করা হলো, আমাদের জানা আছে, ভারতীয়দের প্রচেষ্টাতেই জাহাজটি লাহোরে নেমেছে। তারপর সেখানে তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর উপস্থিতিতে জাহাজটি উড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তার নির্বুদ্ধিতা প্রতিষ্ঠিত হলো। ঘটনাটি ভারতের হাতে প্রয়োজনীয় একটি ছুঁতো তুলে দিল। যেহেতু যুদ্ধ এগিয়ে আসছে, ভারতের ওপর দিয়ে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের (এখন বাংলাদেশ) মধ্যে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার দরকার ছিল। ইয়াহিয়া খানের যুদ্ধ ঘোষণার এক পক্ষকালেরও কম সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। পাকিস্তানি বাহিনী শহর রক্ষার পরিকল্পনা করল, কিন্তু ভারতীয় বাহিনী শহরগুলো পাশ কাটিয়ে সরাসরি ঢাকার দিকে এগিয়ে গেল। যে-কোনো মানদন্দ্বে এটা অত্যন্ত দক্ষ একটা পরিকল্পনা, ভারতরত্ন খেতাব তার প্রাপ্য ছিল বলেই পেয়েছেন।

একাত্তরে ইন্দিরার নেতৃত্বে ভারতের যে সাফল্য, যুদ্ধের ইতিহাসে তা স্মরণীয়, বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশে তার যে অবদান স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে তাও দুর্লভ।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত