মানবতাবিরোধী অপরাধ

রাজশাহীর টিপু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:৫৯ এএম

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজশাহীর বোয়ালিয়ার আবদুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যিনি স্থানীয়ভাবে টিপু রাজাকার হিসেবে পরিচিত।

বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল গতকাল বুধবার তার উপস্থিতিতে এ রায় দেয়। হত্যা, নির্যাতন ও লুটতরাজের দুটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুটিতেই তাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। রায়ের পর তাকে ফের কারাগারে নেওয়া হয়।

গত ১৭ অক্টোবর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে যেকোনো দিন রায় ঘোষণা করা হবে মর্মে তা অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল ও জাহিদ ইমাম। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম। বিচারকালে আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। আইন অনুযায়ী দ-িত আসামি এক মাসের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ পাবেন।

১৭৭ পৃষ্ঠার রায় ঘোষণার আগে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম বিজয়ের মাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও সম্ভ্রম হারানো নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘আর পাঁচ দিন পরই জাতি মহান বিজয় দিবস, তিন দিন পর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করতে যাচ্ছে। আশা করছি তাদের মহান আত্মত্যাগের মহিমাকে সামনে রেখে দেশ-জাতি এগিয়ে যাবে।’

মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি ট্রাইব্যুনালের ৪১তম রায়। এর মধ্যে ৬৮ জনের মৃত্যুদ-সহ মোট ৯৫ জনের সাজার রায় এসেছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ছয়জনের।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল সাংবাদিকদের বলেন, সাক্ষ্য ও দালিলিক প্রমাণাদির মাধ্যমে আসামির বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগই আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আদালত অপরাধ বিবেচনায় মৃত্যুদ-ের রায় দিয়েছে। এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।’ তিনি বলেন, ‘একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে একত্রিত হয়ে ইসলামী ছাত্রসংঘ যে আলবদর ও রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলেছিল সেই বাহিনী ছিল হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর মতো। আজকের রায়ের মধ্য দিয়ে সে বিষয়গুলো উঠে এসেছে।’ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম বলেন, ‘এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। আশা করি তিনি (টিপু) সেখানে ন্যায়বিচার পাবেন।’

প্রসিকিউশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী টিপু সুলতান নাটোরের লালপুর গোপালপুর ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক ছিলেন। ২০১১ সালে অবসরে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর শিবিরের রাজনীতি করতেন তিনি। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে টিপুকে ১৯৭৪ সালের আগস্টে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে ছাড়া পেয়ে যান। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় মতিহার থানার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১৭ সালের ২ মে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার তদন্ত শুরু করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ২০১৮ সালের ২৭ মার্চ তার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনে অভিযোগ সংবলিত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। গত বছর ২৯ মে টিপুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে ৮ আগস্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়।

যে দুই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড : প্রথম অভিযোগ অনুযায়ী, একাত্তরে ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত টিপু সুলতানসহ স্থানীয় রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা বোয়ালিয়ার সাহেববাজারে হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা বাবর ম-লকে আটক করে। এরপর তাকে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শামসুজ্জোহা হলে বসানো সেনা ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন ও গুলি করে হত্যার পর লাশ মাটিচাপা দেয়। দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, একাত্তরের ২ নভেম্বর মধ্যরাতে টিপু সুলতান স্থানীয় কয়েকজন রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে বোয়ালিয়ার তালাইমারি এলাকায় হামলা চালিয়ে লুটপাট চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা চাঁদ মিয়া, আজহার আলী শেখসহ ১১ জনকে আটক করে তাদের রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে বসানো অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন চালায়। এরপর নয়জনকে গুলি করে হত্যা করে, দুজন পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যান।

রাজশাহী প্রতিবেদক জানিয়েছেন, রাজশাহীর চিহ্নিত রাজাকার টিপু সুলতানের মৃত্যুদ- হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন একাত্তরে শহীদ এবং হামলা ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্যরা। স্বস্তি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা এবং স্থানীয়রাও। রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন তারা।

রায়কে কেন্দ্র করে মহানগরের রানীনগর শহীদ মিনারে সকাল থেকে আসতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। টিপু রাজাকারের হাতে নিহত শহীদ ম-লের ছেলে শাহ জামান বলেন, আমার বাবার লাশের হদিস পাওয়া যায়নি। টিপু রাজাকারের ফাঁসির রায় হওয়ায় খুব আনন্দ লাগছে। অন্তত বাবার আত্মা শান্তি পাবে। মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী বরজাহান বলেন, এই রাজাকারের মৃত্যুদ-ে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে গ্রামগঞ্জে আরও যে রাজাকার আছে, তাদেরও বিচার দাবি করছি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে টর্চার সেল থেকে বেঁচে ফিরেছেন তৎকালীন ছাত্রনেতা ও বর্তমান ওয়ার্কার্স পার্টির রাজশাহী মহানগর সভাপতি লিয়াকত আলী লিকু। তিনি বলেন, টিপু মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ছিল। সে যুদ্ধের সময় বিভিন্ন পরিবারে হামলা, নির্যাতন, লুটপাট, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার মূল হোতা ছিল। এই রাজাকারের ফাঁসিতে রাজশাহী অনেকটা কলঙ্কমুক্ত হলো। অতি দ্রুত এই রাজাকারের ফাঁসির রায় কার্যকর দেখতে চাই।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত