প্লাস্টিক কারখানায় আগুন নিহত ১, দগ্ধ ৩৪ ঢামেকে

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:১৯ এএম

ঢাকার কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরির কারখানা প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে আগুন লেগে একজন নিহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার বিকেলে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ আরও ৩৪ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের বেশিরভাগের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

এর আগে চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল এবং গত বছরও কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকার ওই কারাখানাটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একতলা টিনশেড ওই কারখানায় ওয়ান টাইম প্লেট, কাপসহ প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা হতো। কোম্পানির মালিক নজরুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপক আল-আমিন।

গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কারখানাটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থলে থাকা র‌্যাব-১০-এর সিপিসি ২-এর মেজর মো. শাহরিয়ার জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ঢাকা জোন-৬-এর উপপরিচালক কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ‘৪টা ২০ মিনিটে আগুন লাগে। আমরা সাড়ে ৪টায় ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাই। ১০টি ইউনিট কাজ করে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।’ আগুন লাগার কারণ জানতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে ওই দমকল কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আশা করি দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আশপাশের মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দাউদাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, র‌্যাব-পুলিশসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আগুন নেভানোর কাজ করেন।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতিবছরই আগুনের ঘটনা ঘটে এই কারখানায়, কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থাই নেয় না। আগুনের ঘটনায় ২-১ দিন সরগরম থাকে, তারপর সবকিছু আগের মতোই হয়ে যায়।

এদিকে কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিদগ্ধ ৩৪ জনকে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। শ্বাসনালিসহ শরীরের ১০০ ভাগ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে কারও কারও। তবে গতকাল রাত পর্যন্ত কারও মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায়নি।

ঢামেক বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন আরিফুল ইসলাম নবিন গতকাল রাত ৯টায় জানান, এখন পর্যন্ত ৩৪ জন এখানে এসেছে। সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। 

ঢামেকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে বার্ন ইউনিটে আসতে শুরু করে আগুনে দগ্ধ মানুষ। কেউ সিএনজিচালিত অটেরিকশায়, কেউ রিকশায় আবার অনেকেই পিকআপে আসেন ঢামেক বার্ন ইউনিটে। দগ্ধ ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, কারখানাটিতে মাঝেমধ্যেই

আগুন লাগত। কারখানার ভেতরের পরিবেশ ঘিঞ্জি। এরপরও পেটের তাগিদে অন্তত ৭০-৮০ জন সেখানে কাজ করতেন। ১২ ঘণ্টা ডিউটি করলেও তাদের খুবই কম বেতন দেওয়া হয়।

বার্ন ইউনিটে দগ্ধদের দেখতে এসে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ৩৩ জনকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগেরই অবস্থা সংকটাপন্ন। তাদের সর্বাত্মক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। দগ্ধদের আইসিইউ, এইচডিইউ ও স্পেশাল কেয়ার ইউনিটে রাখা হচ্ছে। এরপরও আরও দগ্ধ এলে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হবে।’

গতকাল সন্ধ্যায় ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, দগ্ধদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল। বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগের সামনের ফ্লোরে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে দগ্ধদের। তাদের অধিকাংশেরই সমস্ত শরীরে ব্যান্ডেজ, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তারা। চিকিৎসকদের কাছে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন তারা। অনেকেই অচেতন হয়ে পড়ে আছেন।

ঢামেক বার্ন ইউনিট চিকিৎসাধীন ৩৪ জনের মধ্যে ৩৩ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেনÑ সিরাজ (৫০), ফিরোজ (৪০), ফয়সাল (২৫), দুর্জয় (১৮), মফিজ (৪৫), মোস্তাকিম (২২), জাহাঙ্গীর (৪৫), সালাউদ্দিন (৩২), বাবুল (২৬), ফয়সাল (২৯), রায়হান (১৬), সুমন (২২), খালেদ (৩৫), ফারুক (৩২), জিনারুল ইসলাম (৩২), আলম (৩৫), জাকির (২৪), মেহেদি (২০), ইমরান (১৮), আবু সাঈদ (২৯), সুজন (১৯), ফিরোজ (৩৯), সাজিদ (২৯), সহিদুল (১৯), জিহান (১৬), সোহাগ (২৫), সাখাওয়াত (২৬), লালমিয়া (৪২), সোহাগ (১৯), আসাদ (১৪), বশির (১৮), আসলাম (১৯), সাজু (১০)।

দগ্ধ মো. সিরাজের (৫০) ছেলে সোহান বলেন, ‘আমি পাশের ফ্যাক্টরিতে কাজ করতাম। বাবার ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগার খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে যাই। বাবা কোনোমতে এক ফাঁক দিয়ে বের হয়েছে। হাত ও পা পুড়ে গেছে। এছাড়া মুখের একপাশও পুড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ওই ফ্যাক্টরিতে এর আগেও আগুন লেগেছে। বাবা ৬ মাস বেকার থাকার পর গত মাসের ৯ তারিখে ৭ হাজার টাকা বেতনে মালামাল প্যাকেটের কাজ নেয়। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়।’

সুমন ইসলাম নামে ২১ বছরে এক তরুণের শরীরের অধিকাংশ পুড়ে গেছে। বিস্ফোরণের সময় কারখানাটিতে ছিলেন তিনি। পরে দগ্ধ অবস্থায় বাইরে এলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। অবস্থা খারাপ দেখে পরে তাকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে ঢামেকে ছুটে আসেন স্ত্রী আঁখি আক্তার। দেখতে পান শরীরে ব্যান্ডেজসহ স্বামীকে। আঁখি বলেন, তাদের বাসা কেরানীগঞ্জের হাবীবনগর। সাড়ে চার বছর আগে বিয়ে করেন সুমনকে। তাদের কোনো সন্তান নেই। প্রায় পাঁচ বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করে সুমন। চুক্তিতে মাল ডেলিভারির কাজ করত সে। বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সে বাসা থেকে কারখানায় যায়। রাতে বাসায় ফেরার কথা ছিল। বিকেলেই দুর্ঘটনার খবর জানতে পারি।

দগ্ধ জাকির হোসেনের (২২) বাবা আবুল হোসেনকে দেখা যায় ছেলের পাশে বসে আহাজারি করছেন। ফোনে ছেলের দগ্ধ হওয়ার খবর জানাচ্ছেন শরীয়তপুরে থাকা স্ত্রীকে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, জাকির প্রিন্টিংয়ের কাজ করত। গত দুই বছর এই ফ্যাক্টরিতে কাজ করছে সে। এর আগেও আগুন লেগেছে ফ্যাক্টরিতে। তবে সেগুলো বেশি বড় ছিল না।

দগ্ধ কর্মচারী মো. বশির (২০) বলেন, বিকেলে সবাই কারখানায় কাজ করছিলাম। সোয়া ৪টার দিকে এক ইঞ্জিনিয়ার ভেতরে সবকিছু দেখছিল। তার শরীরের সঙ্গে লেগে গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপ খুলে যায়। এরপরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। পরে দৌড়াদৌড়ি করে বের হয়েছি আমরা।

ঢামেকে দগ্ধদের দেখতে এসে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম বলেন, দগ্ধদের শরীরের ৩০-১০০ ভাগ পুড়ে গেছে। এদের শ্বাসনালীও দগ্ধ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রত্যেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। দগ্ধদের সংখ্যা আরও বাড়লে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এ ভর্তি করা হবে। আরও ৩০-৩৫ জনকে চিকিৎসা দেওয়ার মতন ব্যবস্থা করে রেখেছি। চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হবে না।’

সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে হাসপাতালে আসেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য নসরুল হামিদ বিপু। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘৩৩ জন দগ্ধ ও একজনের মৃত্যুর খবর এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছি। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। যারা লোকাল গভর্নমেন্টে আছে তারা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কারখানাটির অনুমোদন ছিল না। ৭০-৮০ জন শ্রমিক সেখানে কাজ করত।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত