রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কড়া সমালোচনা এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি এক নির্দেশনার পর একে একে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিচ্ছে তাদের সান্ধ্যকালীন কোর্স। গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সান্ধ্যকোর্স বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। শিগগিরই আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সান্ধ্যকোর্স বন্ধ করে দেবে বলে জানিয়েছে। এদিকে শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এই কোর্সের কড়া সমালোচনার পর ইউজিসি গত বুধবার সান্ধ্যকোর্স বন্ধসহ ১৩ নির্দেশনা পাঠায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই নির্দেশনা পাওয়ার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সান্ধ্যকোর্স বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে যেসব কোর্স চালু রয়েছে, সেগুলো শেষ করা হবে। নতুন করে আর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হবে না।
গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মীজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করেছি। যারা অলরেডি কোর্সে রানিং তারা কোর্স শেষ করবে, তবে নতুন করে আর ভর্তি করানো হবে না।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবু তাহের বলেন, ‘ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সান্ধ্যকোর্স বন্ধ ঘোষণা করেছি। যাদের এখন কোর্স চলমান তাদের শেষ করতে দেওয়া হবে। তবে নতুন করে আর কাউকে ভর্তি করা হবে না।’
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এস এম আবদুল লতিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অফিশিয়ালি এখনো চিঠি পাইনি। কোর্সটি আমরা চাইলেও বন্ধ করতে পারব না। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং হবে। সেখানেই সিদ্ধান্ত হবে। তবে আমরা সান্ধ্যকোর্স বন্ধের ব্যাপারে আগ্রহী। এর আগেও দুবার বন্ধ করেছিলাম। শিক্ষকদের চাপের কারণে আবার চালু করতে হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার আকবর হোছাইন বলেন, ‘আমরা কোর্স বন্ধের বিষয়ে টিভিতে দেখেছি। তবে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা হাতে পেলে কার্যক্রম শুরু করব।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামান গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে দুই বছর আগেই আমরা এই কোর্স বন্ধের বিষয়ে অনুশাসন পেয়েছিলাম। তখন থেকেই আমরা এই কোর্স বন্ধের প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেও তিনি এর সমালোচনা করেছেন। ইউজিসিও নির্দেশনা দিয়েছে। বর্তমানে একটি কমিটি কাজ করছে। আশাকরি খুব দ্রুতই কমিটি একটা প্রতিবেদন দেবে এবং আমরা সান্ধ্যকোর্স বন্ধ করতে পারব।’
এদিকে এই কোর্স বন্ধের ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি এ কোর্সটি বন্ধ করে দেয় তাহলে তাদের সাধুবাদ জানাব। অর্থের বিনিময়ে সনদ বিক্রির হাট রীতিমতো এই সান্ধ্যকোর্স। শুধু তা-ই নয়, কোর্সটি চালু থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটে।’
অন্যদিকে শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বহুদিন যাবৎ নিমœমানের এই কোর্স বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চালু রয়েছে। আমরা বহুবার বলেছি এই বাণিজ্যিক কোর্স বন্ধ করে দেওয়ার। অবশেষে এটি বন্ধ হচ্ছে, এটাকে সাধুবাদ জানাই।’
এদিকে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরও ইউজিসির এই নির্দেশনাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সান্ধ্যকোর্সের মতো বাণিজ্যিক কোর্স শুধু কিছু শিক্ষকের পকেট ভারী করে। টাকার বিনিময়ে তারা কিছু শিক্ষার্থীকে সনদ দেন। এই বাণিজ্য বন্ধের দাবি বিভিন্ন সময় আমরা সোচ্চার ছিলাম। আমি চাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুতই এই কোর্স বন্ধ করে দেবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন নিয়মিত শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, সান্ধ্যকোর্স চালুর কারণে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। শিক্ষকরা সান্ধ্যকোর্সে বেশি মনোযোগী থাকায় নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষার ড়্গেত্রে সময় কম দেন। এ কোর্সটি বন্ধে শিক্ষাক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
