বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের শত্রু ছিল

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:১৭ পিএম

পাকিস্তান আর্মি ১৯৭১ সালে খুব কম ক্ষেত্রেই নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালায়। প্রায় প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটা পরিকল্পনা ছিল, লক্ষ¨ ছিল। সেটা ২৫ মার্চের রাত থেকেই লক্ষ করা যায়। যারা গণহত্যা নিয়ে কাজ করেন, তারা সাধারণত লক্ষায়িত শত্রুহত্যা এবং নির্বিচারে হত্যার একটা তফাত টানেন। বাংলাদেশের ড়্গেত্রে আমরা যাদের নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে দেখি, তার চেয়ে অনেক বেশি পাকিস্তানের কাছে যারা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত, তাদের হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ বেশি পাই। যেসব মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তার মধ্যে একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে যাদের নিধন করার পরিকল্পনা করা হয়, তার মধ্যে বুদ্ধিজীবীরা অন্যতম প্রধান গোষ্ঠী।

২৫ মার্চের রাতে হত্যাকাণ্ডের কয়েকটি লক্ষ¨ চিহ্নিত করা যায়। এক. পিলখানা ও রাজারবাগ। অর্থাৎ যেখান থেকে পাকিস্তানিরা সশস্ত্র প্রতিরোধ হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিল। দুই. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো, বিশেষ করে ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এবং জগন্নাথ হল। ইকবাল হলে অবস্থান করতেন রাজনৈতিক কর্মীরা এবং জগন্নাথ হল টার্গেট করার কারণ ছিল ওখানে ছিল হিন্দু ছাত্ররা। তিন. ঢাকার বিভিন্ন বিস্তসমূহ, যার অধিবাসীদের পাকিস্তানিরা ভয় ও ঘৃণা করত। তাদের লেখাতে উল্লেখ পাওয়া যায় এই বিষয়টি। মিছিলের সামনের মুখগুলোকে তারা বিস্তবাসী মানুষ বলেই চিহ্নিত করত। বিশেষভাবে লক্ষায়িত কয়েকটি হত্যাকাণ্ড তারা চালায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন এবং পরে ভাষাসৈনিক ধীরেণ দত্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই লক্ষায়িত গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ যেসব শিক্ষককে তারা চিহ্নিত করেছিল রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতা হিসেবে বা যারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজনকে। এর মধ্যে আবার তেমন নামও পাওয়া যায় যিনি কোনোভাবেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। যেমন– প্রফেসর গোবিন্দচন্দ্র দেব। আবার সব শিক্ষকের ওপর আক্রমণ করা হয়নি। অতএব মোটাদাগে বলা যায় শিক্ষকরা তাদের শত্রু ছিল এবং তাদের ভেতরে আবার কিছু মানুষকে তারা বড় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তার মানে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক হত্যা শুরু হয়েছে ২৫ মার্চ রাত থেকেই এবং এটা পরিচালনা করে পাকিস্তান আর্মি। যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে ১৪ ডিসেম্বর আবার হত্যাকাণ্ড চালায়। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের হত্যাকারীরা প্রধানত ছিলেন এ দেশের মানুষ। যদিও পরিকল্পনা পুরোটা করেছিল পাকিস্তানিরা। এই পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায় বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তানিরা বিশেষভাবে শত্রু হিসেবে দেখত।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বাংলাদেশের জন্মের কয়েকটি সূত্রস্থান খুঁজে পাওয়া যায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য ঢাকা এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। যেহেতু সংস্কৃতিচর্চা এবং রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্তকরণ এই পরিসরেই ঘটেছে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের বক্তৃতা যদি পাঠ করা হয় তাহলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়। জিন্নাহর মূল দুর্ভাবনা ছিল প্রধানত তিনটি। এক. এই অঞ্চলে, অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিকতার মনোভাব জন্মলাভ করছে। দুই. এখানকার তরুণরা ভারতের কথায় অনেক বেশি উদ্বুদ্ধ হচ্ছে, যেগুলো তিনি মিথ্যাচার বলে আখ্যায়িত করেন। তিন. মুসলিম লীগকে সমর্থন না করলে পাকিস্তানের উন্নতি সম্ভব নয়। এরপর তিনি সরাসরিভাবে হুমকি দেন, যদি এই গুণ্ডামি-বদমাইশি বন্ধ না করা হয় তাহলে রাষ্ট্র তার সব শক্তি দিয়ে সেটাকে প্রতিহত করবে।

এ কথা থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তান একক রাষ্ট্র হিসেবে সম্ভবত কোনো দিনই জন্মলাভ করেনি। কারণ, পূর্ব পাকিস্তান/পূর্ববাংলা জন্ম থেকেই স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের সব চরিত্র ধারণ করেছিল। জিন্নাহার সব সময় ভয় ছিল যে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়বে এবং তাদের তিনি বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ রেখে নানা ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে, বদমানুষের কথা না শুনতে। একটি সদ্যসৃষ্ট রাষ্ট্রের প্রধান এতটা কেন নার্ভাস ছিলেন সেটা সহজে বোঝা যায় না, যদি আমরা ইতিহাসের দিকে না তাকাই, পূর্বের এবং পরের। জিন্নাহ বাংলাদেশের তরুণদের সরকারি চাকরি না করে আরও বিভিন্ন কাজ করতে বলছিলেন এবং দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তরুণরা কেন শুধু সরকারি চাকরি চায়। জিন্নাহর দুশ্চিন্তার প্রাবল্য তার বক্তৃতার মধ্যেই রয়েছে।

১৯৪৮ সালে যখন জিন্নাহ ঢাকায়, তত দিনে ভাষা-আন্দোলন রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক এই আন্দোলন পরবর্তীকালে আরও বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৯ সালের দিকে যখন সংবিধানের মূলনীতির বিষয়ে প্রস্তাবনা রাখা হয়, তখন উদুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা উল্লেখ করা হয়। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়ে যায় এবং ক্রমেই বড় আকার ধারণ করতে থাকে। অতএব পাকিস্তানের ক্ষমতাবানদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব সময় দুর্ভাবনার স্থান ছিল। ১৯৫২ সালে যখন ভাষা-আন্দোলনের মিছিলে গুলি করা হয়, তত দিনে এটি একটি কেন্দ্রীয় বিদ্রোহের পরিসর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। ৫২ থেকে ৫৪ খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। যেহেতু এ সময় রাজনৈতিক দল এবং শক্তিসমূহ একত্র হয়ে আন্দোলন শুরু করে। যেটি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি থেকে মুসলিম লীগের বিদায়ঘণ্টা বাজায়। অর্থাৎ জিন্নাহর দল কোনো দিনই পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে শান্তিতে পা রাখতে পারেনি।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে মার্শাল ল জারি হয় রাষ্ট্র বাঁচানোর একটি চেষ্টা হিসেবে। সেই ধারাবাহিকতায় নতুনভাবে এর বিরুদ্ধেও আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশনকে কেন্দ্র করে ছাত্র আন্দোলন পাকিস্তানকে সাংঘাতিকভাবে নাড়া দেয় এবং ৬৯-এর আন্দোলনের প্রস্তুতি তখন থেকেই শুরু হয়ে যায়। ৬৯-এর আন্দোলনের বিশেষত্ব হচ্ছে যে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যারা সাধারণত সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলতে পছন্দ করে, তারাই প্রধান বিদ্রোহীশক্তি হিসেবে উন্নীত হয়।

১৯৬৬ সালের ৬ দফাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের ১১ দফা আন্দোলন তৈরি হয়। যেটি শেষপর্যায়ে এসে আইয়ুব খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তার বদলে নতুন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসে এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন দেয়। ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আবিভূ©ত হয়। যার প্রতি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষকদের পূর্ণ সমর্থন ছিল। একই সঙ্গে এই বুদ্ধিজীবীরাও সক্রিয় রাজনীতির সহায়ক হিসেবে আবিভূ©ত হয়।

কিন্তু আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিবকে ক্ষমতা দেওয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে অসম্ভব ছিল। যেহেতু পাকিস্তান সেনাবাহিনী কিছুদিন আগে তাকে ভারতীয় চর হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবত। পাকিস্তান রাষ্ট্রকে রক্ষা করার প্রয়োজনে পাকিস্তানিদের আক্রমণ অবধারিত হয়ে ওঠে। ২৫ মার্চ রাতে যেসব জায়গায় হানা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো যদি চিহ্নিত করা হয় এবং ১৪ ডিসেম্বর যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের পরিচয়গুলো লক্ষ করা যায়, তাহলে এটা বোঝা সহজ যে, তাদের মেধাবী হিসেবে যতটা না, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে নিরবচ্ছিন্নভাবে দুর্বল করার পেছনে তাদের যে ভূমিকা সেটাই ছিল তাদের প্রধান অপরাধ। সে কারণেই বুদ্ধিজীবী দিবস বৃহৎ রাজনীতির যে ধারা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম তার একটি অংশ। এখানেই অনেকেই ভূমিকা রেখেছেন। অতি সাধারণ প্রান্তিক মানুষসহ। আমরা যেমন বুদ্ধিজীবীদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাই এ দিবস পালন করে, ঠিক তেমনিভাবে এ দেশ সৃষ্টির পেছনে যেসব শ্রেণিপেশার ও জনগোষ্ঠীর মানুষের ভূমিকা রয়েছে, তাদের সবাইকে শ্রদ্ধা জানানো আমাদের দায়িত্ব।

লেখক

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, শিক্ষক ও সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত