ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব লিখছেন ততক্ষণে আমরা জেনে গেছি, মালাক্কা প্রণালী দিয়ে আমেরিকান নৌবহর এগিয়ে আসছে। ইসলামাবাদ থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে যে সামরিক সিগন্যাল পাঠানো হচ্ছে আমরা তাতে ইন্টারসেপ্ট করি। বার্তায় বলা হয় : ‘যুদ্ধ চালিয়ে যাও। তোমরা উত্তর দিক থেকে হলুদের (চীন) সাহায্য পাবে আর দক্ষিণ দিক থেকে সাদার (আমেরিকা)।’
সিগন্যালে পাঠানো এ বার্তা নিয়াজি বিশ্বাস করে বসলেন। এই বার্তার কথা পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজিও লিখেছেন, জবাবে জানিয়েছেন তাদের দেরি হলে পাকিস্তানের সর্বনাশ হয়ে যাবে।
জ্যাক এন্ডারসন ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ লিখলেন, বঙ্গোপসাগরে সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তির মুখোমুখি হওয়ার পরিণতি হবে ভয়ংকর। ভারতকে নিরস্ত্র করার জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সন নৌ টাস্কফোর্সকে ঝামেলার দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
বিমানবাহী জলযান এন্টারপ্র্রাইজ বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছে, সঙ্গে আছে উভচর যান ত্রিপোলি, গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট কিং, গাইডেড মিসাইল
ডেস্ট্রয়ার তিনটি-পার্সন, ডেকাটুর এবং টার্টার স্যাম।
একইসঙ্গে স্পষ্টতই ভারতকে সাহায্য করার জন্য বঙ্গোপসাগরের দিকে সোভিয়েত যুদ্ধজাহাজকে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। গোয়েন্দা প্র্রতিবেদন থেকে আরও অমঙ্গলজনক খবর পাওয়া গেছেÑ ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজে সোভিয়েত টেকনিশিয়ান রয়েছে, সে জাহাজ পাকিস্তানি বন্দর এবং সংলগ্ন স্থাপনার ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।
ভারতে নিযুক্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং ভারত মহাসাগরে রণজাহাজবাহী টাস্কফোর্সের উপস্থিতি মেনে নিতে পারছেন না।
১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেটকে জরুরি গোপনীয় টেলিগ্রাম পাঠালেন। দিল্লি থেকে পাঠানো সেই টেলিগ্রামটির ভাষ্য :
১. গত ক’দিন আগে পর্যন্ত (ভারত ও পাকিস্তানের) বৈরিতা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পক্ষে কথা বলে আসছিলাম। কিন্তু এখন আমি সংকটের মধ্যে আছি। আমার কূটনৈতিক সহকর্মীদের অনেকেই মনে করছেন ভারত মহাসাগরে ক্যারিয়ার টাস্কফোর্স মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উসকানি প্র্রদান করছে।
২. কানাডিয়ান হাইকমিশনার জর্জ অনেকটা জোর দিয়েই এর প্র্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বিশ^াস করেন এই টাস্কফোর্স মোতায়েনে আমাদের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের সামরিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে ইয়াহিয়া খানকে উৎসাহিত করেছে।
এ বিষয়ে জর্জ মনে করেন এই টাস্কফোর্স মোতায়েনের কারণেই (ঢাকা থেকে) রাও ফরমান আলীর বার্তা এবং সেখানকার গভর্নর মালিকের বার্তা (দুটোতেই যুদ্ধবিরতি ও আত্মসমর্পণের প্র্রস্তাব রয়েছে) ইয়াহিয়া খান উপেক্ষা করছেন ।
৩. এই মোতায়েনের কারণে বৃহৎ শক্তিগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার যৌক্তিকতা খুঁজে পাবেÑ এতে সোভিয়েত ও চীন উভয় শক্তিই বিচলিত হবে এবং এটাকে তারা অধিকতর সম্পৃক্ততার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করবে।
৪. জর্জ আমাকে ইঙ্গিত দিয়েছে এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোর কাছে কঠোর বার্তা পাঠাবেন যাতে ট্রুডো প্র্রেসিডেন্টকে বিষয়টি অবহিত করেন।
নয়াদিল্লিতে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত নিকোলাই এম পেগভ গোপনে ভারতকে আশ্বাস দিয়েছেন যে সোভিয়েত নৌবহর এখন ভারত মহাসাগরে এবং তারা সপ্তম নৌবহরকে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না।
যদি হিমালয় পেরিয়ে চীন ভারতকে আক্রমণ করে সে ক্ষেত্রে তিনি প্র্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাশিয়া সিংকিয়াঙ্গে আক্রমণ চালাবে যাতে চীনা বাহিনীকে সেদিকে ফিরিয়ে নিতে হয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানের পক্ষে হস্তক্ষেপ করে তাহলে পেগভ প্র্রতিশ্রুতি দিলেন তখন সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটবে।
রুশরা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের আগমন মূলত ভারতকে ধমক দেওয়ার জন্য, পশ্চিম পাকিস্তান আক্রমণ করা থেকে ভারতকে নিরুৎসাহিত করার জন্য এবং একইসঙ্গে পাকিস্তানের মনোবল বাড়াবার জন্য।
পেগভ বলেন, সোভিয়েত নৌবহরও ভারত মহাসাগরে। তারা সপ্তম নৌবহরকে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না। যুক্তরাষ্ট্র যখন বুঝতে পারল তারা পাকিস্তানের পক্ষে একটি হেরে যাওয়া যুদ্ধ লড়ছে, সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল, ভীষণ প্রতারিত হলো পাকিস্তান।
পাকিস্তানের পাশে চীনও নেই
নিরাপত্তা পরিষদে চীনা প্রতিনিধি বললেন, ‘সম্প্রতি ভারত সরকার প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণের উদ্দেশ্যে সশস্ত্র সেনাদল পাঠিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত বৃহদাকার সশস্ত্র সংঘর্ষের জন্ম দিতে পারেÑ ফলে উপমহাদেশ তথা এশিয়ায় উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং এতে কারও হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। ভারত সরকার পূর্ব পাকিস্তানের অজুহাত তুলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। ভারত সরকার বলেছে পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী প্রেরণ সম্পূর্ণভাবে তাদের জন্য আত্মরক্ষামূলক। এটা তো জঙ্গলের আইন। ঘটনাবলি প্রমাণ করে ভারতই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়েছে, এমন নয় যে পাকিস্তান ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকি দিচ্ছে।
ভারত-পাকিস্তান সমস্যায় চীনের কৌশলগত অবস্থানের পেছনে কূটনৈতিক সূত্রমতে চারটি কারণ রয়েছে :
১. চীন দেখাতে চায় যে জাতিসংঘে দেশটির অন্তর্ভুক্তির ফলে এই বিশ্বসংস্থাটি আরও দক্ষ হয়ে উঠেছে।
২. চৌ এন লাইয়ের কূটনৈতিক পরিকল্পনা হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে (দক্ষিণ এশিয়াও) দুটি পরাশক্তির দ্বন্দ্ব, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত থেকে রক্ষা করা।
৩. ভারতের সঙ্গে আঁতাত সৃষ্টির সুযোগ নষ্ট হয় এমন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশ্নে পিকিং অনাগ্রহী থাকবে। জাতিসংঘে চীনের অন্তর্ভুক্তির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী চৌ এবং ইন্দিরা টেলিগ্রাম বিনিময় করেছেন। মিসেস গান্ধী বলেছেন, বিশ্বসংস্থায় তিনি চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন এবং চৌ এন লাই বলেছেন চীন ও ভারতের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি পিকিংয়ে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টে চীন ভারতীয় দলকে স্বাগত জানিয়েছে এবং গত ১৫ বছরের মধ্যে এই প্রথম দুজন ভারতীয় সাংবাদিককে চীন আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
৪. স্বাধীন বাংলাদেশ না চীনের স্বার্থ না চীনের আদর্শÑ কোনোটাই রক্ষা করবে না।
চীনা প্রতিনিধি বলেন, চীন সরকার ও চীনের জনগণ দৃঢ়ভাবে পাকিস্তান, পাকিস্তানের জনগণ এবং ভারত সরকার ও তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জনগণের সংগ্রামকে সমর্থন করে। আমি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সামনে এবং সমগ্র পৃথিবীর মানুষের সামনে দেখিয়ে দিতে চাই যে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় ভারত এই আগ্রাসন চালিয়েছেÑ অসংখ্য ঘটনা তা প্রমাণ করে।
মুখে মুখে চীন যাই বলুক, পকিস্তানের দুর্দিনে ইয়াহিয়ার পক্ষে একটি বুলেটও খরচ করেনি। নিয়াজি প্রতারিত হয়েছেন। পাকিস্তান প্রতারিত হয়েছে, মিত্রের ওপর বিশ্বাস ভেঙেছে।
পাকিস্তানের চূড়ান্ত পরাজয়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
