Cসরকারের ৫০ শতাংশ মালিকানাধীন তেল কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেডের (এসএওসিএল) ব্যাংক হিসাব থেকে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা ব্যক্তিগত হিসাবে কোম্পানিটির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ ও পরিচালক মঈনউদ্দিন আহমেদ সরিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বলা হচ্ছে, সরিয়ে নেওয়া অর্থ দিয়ে সাতটি
কোম্পানি প্রতিষ্ঠা ও অন্তত ৫০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ার খোঁজ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ওই ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মোহা. রহমাতুল মুনিমের কাছে প্রায় চার মাস আগে জমা দিলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নেই আত্মসাৎ করা অর্থ আদায়ের কোনো চেষ্টাও। যখন ওই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে, তার বড় একটা সময় বিপিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও ছিলেন বর্তমান জ্বালানি সচিব।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মোহাম্মদ শাহেদ ও মঈনউদ্দিন এসএওসিএলের ব্যাংক হিসাব থেকে দুই বছরে (২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে) ১৫৪ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে বিপিসির একটি তদন্ত কমিটি। বিপিসির ওই তদন্ত প্রতিবেদন গত ২৬ আগস্ট জ্বালানি সচিব আবু হেনা মোহা. রহমাতুল মুনিমের কাছে জমা দিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করা হয়। প্রায় চার মাস পার হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি জ্বালানি সচিব।
দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিতে দিয়ে জানায়, তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসএওসিএলের মঈন উদ্দিন আহমেদ ৪৩ কোটি টাকা ও মোহাম্মদ শাহেদ ১৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসএওসিএলের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদন্ত করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জ্বালানি বিভাগে দাখিল করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি-না, জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব আবু হেনা মোহা. রহমাতুল মুনিম গতকাল মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে জানতে চাচ্ছেন কেন?’
আপনি মন্ত্রণালয়ের সচিব, তদন্ত প্রতিবেদনও আপনার কাছে দেওয়া হয়েছে- দেশ রূপান্তরের এমন বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘এসএওসিএলের চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চান। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন), যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) ও জনসংযোগ কর্মকর্তার কাছে জানতে চান। তারপর যা ইচ্ছা লিখে দেন।’
নাম না প্রকাশ করার শর্তে জ্বালানি বিভাগের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসএওসিএলের ৩০০ কোটি টাকা লোপাট করার দায়ে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ হলো, অর্থ লোপাটের একটা বড় সময়ে বিপিসির চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান জ্বালানি সচিব আবু হেনা মোহা. রহমাতুল মুনিমই। চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি তখন এসএওসিএলের কোনো হিসাব নেননি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিপিসির তদন্ত কমিটি গত ২৬ আগস্ট জ্বালানি সচিবের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিটিকে সব তথ্য দিয়ে সহায়তা করেনি এসএওসিএল। সে কারণে প্রকৃত আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ ও গুরুতর অনিয়মের সব বিষয় খতিয়ে দেখা সম্ভব হয়নি। ২০১২-১৩ ও ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের হিসাবপত্র পর্যালোচনা করে আত্মসাৎকৃত অর্থের খোঁজ পেয়েছেন তারা। কমিটি একটি বেসরকারি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে (সিএ ফার্ম) এসওসিএলের সব হিসাবপত্র নিরীক্ষার সুপারিশ করেছে।
পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে এশিয়াটিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও যুক্তরাষ্ট্রের ইএসএসসো ইস্টার্ন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বেসরকারি লুব অয়েল কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি সরকার অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীকালে বিপিসির ৫০ শতাংশ মালিকানা ও বাকিটা ব্যক্তিমালিকানায় শুরু হয় এসএওসিএলর যাত্রা। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ডিজেল, ফার্নেস তেল, এলপিজি, বিটুমিন বিক্রি করে থাকে। এছাড়া বিশ্বখ্যাত লুব তেল মবিল, ক্যাস্ট্রল ও বিপি বিক্রি করে।
পাঁচ হিসাব থেকে ৩০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন তারা : দেশের পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের চট্টগ্রামের বিভিন্ন শাখায় এসএওসিএলর পাঁচটি হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের আইএফআইসি, এনসিসি, মেঘনা ও মিডল্যান্ডে ব্যাংকের শাখায় এসএওসিএলের ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ব্যাংক এশিয়ার ইপিজেড শাখায় রয়েছে আরেকটি হিসাব। কোম্পানির এসব শাখা থেকে বিভিন্ন সময় অন্তত ৩০০ কোটি টাকা নগদ তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ ও পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। যেখানে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এভাবে নগদ অর্থ তোলার সুযোগ নেই।
টাকা যেখানে জমা পড়েছে : এসএসিওএলের পাঁচ হিসাব থেকে অর্থ তুলে তার একটি অংশ দুটি বেসরকারি কোম্পানির পাঁচটি ব্যাংকের পাঁচটি শাখায় রাখা হয়েছে। একটি অংশ দিয়ে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। কোম্পানির হাতিয়ে নেওয়া অর্থ দিয়ে মোট সাতটি কোম্পানি খোলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দিয়ে ইঞ্জিন অয়েল বা লুব তেল আমদানি করার ব্যবসা করছেন তারা। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এসএসিওএলের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ তুলে পিরামিড এক্সিম লিমিটেড নামের একটি কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঢাকার একটি শাখায় অর্থ রাখা হয়েছে গুডউইন লিমিটেডের নামে। গুডউইন ও পিরামিড এক্সিম লিমিটেডের হিসাবে ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ওই বছরের নভেম্বর পর্যন্ত শুধু প্রিমিয়ার ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংকে চার কোটি টাকা জমা পড়ার রসিদ পাওয়া গেছে। গত সাড়ে তিন বছরে এই দুই কোম্পানির পাঁচটি ব্যাংক হিসাবে অন্তত ২৫০ কোটি টাকা রাখার অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ জমা দিয়েছেন কোম্পানির বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী ও কর্মকর্তারা। এর মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংক শাখার হিসাবটি সম্প্রতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পিরামিড এক্সিম লিমিটেড ২০১৪ সালের ১০ আগস্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ কোম্পানির ৫০ ভাগ মালিক এসএসিওএল পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদ ও বাকি ৫০ ভাগের মালিক তার স্ত্রী শামিমা আহমেদের নামে। গুডউইন নামে ছয়টি কোম্পানি নিবন্ধন করা হয়েছে। এর মধ্যে গুডউইন পাওয়ার লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ২০১৫ সালের ৭ মে। এ কোম্পানির একজন মালিক এসএসিওএলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ।
কোম্পানি খুলে লুব তেল আমদানি করছে তারা : সরকারি কোম্পানি এসএওসিএল লুব তেল বিপণন করে। সেই কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ নিজেই কোম্পানি খুলেছেন গুডউইন পাওয়ার নামে। ওই কোম্পানির নামে লুব তেল আমদানি করছেন তিনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে লুব তেল আমদানি করেছেন মোহাম্মদ শাহেদ। এ রকম সাতটি আমদানিপত্র যাচাই করে তাতে প্রায় ১০ কোটি টাকার লুব তেল আমদানির প্রমাণ মিলেছে। মোহাম্মদ শাহেদের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তারা বেশি মুনাফার আশায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে লুব তেল আমদানি করে। গত ২৪ জুলাই চট্টগ্রামের শুল্ক গোয়েন্দার একটি দল ভাটিয়ারী এলাকার একটি পরিত্যক্ত ব্রিকফিল্ড থেকে প্রায় আড়াই হাজার ড্রামভর্তি তেল আটক করে। এসব লুব অয়েল তৈরির কাঁচামাল (বেজ অয়েল) ঘোষণা দিয়ে আনা হয়েছিল। তবে সে যাত্রায় বেঁচে যান মোহাম্মদ শাহেদ।
অর্ধ শত কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন শাহেদ : এসএওসিএলের হিসাব থেকে অর্থ সরিয়ে নিজ নামে ও পরিবারের নামে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের খুলশী-২ আবাসিক এলাকায় ৫ তলা একটি ভবন, একই এলাকার ইয়াকুব ফিউচার পার্কের পাশে ১৫ কাঠা জায়গার ওপর ১০তলা ভবন ও পশ্চিম খুলশী আবাসিক এলাকায় নির্মাণাধীন দুটি বহুতল ভবন। এছাড়া চট্টগ্রামের তিন স্থানে তিনটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। ঢাকার একটি অভিজাত এলাকায় তার রয়েছে দুটি ফ্ল্যাট। সব মিলিয়ে এসব সম্পদের পরিমাণ অর্ধশত কোটি টাকার কম নয় বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। তারা আরও জানান, মোহাম্মদ শাহেদ মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছেন। সে কারণে তিনি প্রায়ই মালয়েশিয়া যান। এমনকি দুদকের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর অন্তত দুইবার দুদকের অনুমতি নিয়ে শাহেদ মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেছেন সেখানকার ব্যবসা দেখার জন্য।
শাহেদ এসএওসিএলের পাঁচটি গাড়ি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে প্রডো ও হেরিয়ার জিপ নিজে ব্যবহার করেন। তার স্ত্রী ব্যবহার করেন প্রিমিও আর মা-বাবা নিশান জুকি। ঢাকায় ব্যবহারের জন্য রাখা হয় একটি ভাড়ার গাড়ি, যার খরচও এসএওসিএল থেকে দেওয়া হয়।
