১৯৭১ ছিল তুলনাহীন ত্যাগ, রক্ত আর শোকের সম্মিলনে বাঙালির তথা এই জনপদের মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। এই বদ্বীপের স্বভাবে শান্তিপ্রিয়, চিরকাল বঞ্চিত অঞ্চলবাসী অনেকটা বাধ্য হয়েই জড়িয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এক অসম লড়াইয়ে। ছাত্র-জনতা থেকে কৃষক-শ্রমিক যারাই এই যুদ্ধে জড়িয়েছিল তাদের কেউ কেউ আর ফেরেনি। বুকের রক্ত ঢেলে দেশের মুক্তিতে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনী দ্বারা হেন অপরাধ নেই যা একাত্তরের নয় মাসে সংঘটিত হয়নি। অত্যাচার, হিংস্রতা, বর্বরতা সব ধরনের সীমা ছাড়িয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকালে অপরাধের এমন কোনো মাত্র ছিল না যা তারা লঙ্ঘন করেনি। কিন্তু পাশাপাশি বিশ্ববাসী এও প্রত্যক্ষ করেছে– মুক্তিসংগ্রামী বাঙালির অমিত তেজ আর দেশপ্রেম। এ কথা সত্য যে, এ দেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে জীবন হারাতে হয়েছে, নারীকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে, সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু এতে বিন্দুমাত্র সাহস হারায়নি বা বিচলিত হয়নি বাঙালি নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ। কতভাবেই যে মৃত্যু, নিষ্ঠুরতা আর লাঞ্ছনা প্রত্যক্ষ করেছে এই জনপদের মানুষ– তার কতটুকুই বা খবরের কাগজ, রেডিও-টেলিভিশন কিংবা সেলুলয়েডে আছে? ইতিহাস আর কতটুকুইবা ধরে রেখেছে বা রাখতে পেরেছে ব্যাখ্যার অতীত আমাদের শোক আর আনন্দের বিরল দৃশ্যপটগুলো?
আমি ব্যক্তিগতভাবে দেশের ভেতর যুদ্ধদিনের সেই বীভৎসতা প্রত্যক্ষ করেছি গ্রামে ও শহরে। ১৯৭১ সালের অনেক স্মৃতিই আমার দৃশ্যপটে ভাসছে। এর মধ্য থেকে এখন শুধু ডিসেম্বর মাসের স্মৃতিচারণ করছি। ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান বাহিনী জড়িয়ে গেল ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে। প্রথম দিন দুপুরে চারটা স্যাবর জেট উড়ে গেল। বুঝলাম তারা ভারতের দিকে গেছে। বিকেলে ফিরে এলো দুটো। এয়ারপোর্টের পাশে থাকায় বিমানের ওড়াউড়ির হিসাবটা আমরা রাখতাম ভালো। বিকেলে বাকি দুটোও উড়ে যায় কিন্তু ফিরে আসেনি। ওদিকে ভারতের মিগ-২১ গুলো ঘন ঘন ঘুরতে থাকে ঢাকার আকাশে। প্লেনও ধ্বংস হয় তাদের। মিরপুরে প্যারাসুটের সাহায্যে দুজন ভারতীয় পাইলট নেমে আসতে সক্ষম হলেও বিহারিরা তাদের মারধর করে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধে ধৃত পাইলট বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্য ধরা পড়লে তাকে যুদ্ধবন্দির মর্যাদা দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়।
আমাদের বাসার পাশটাতেই বিরাট একটা ফাঁকা জায়গা ছিল। শুকনো খালের মতো। ভারতীয় মিগগুলো খুব নিচু হয়ে এদিক দিয়েই এয়ারপোর্টে গিয়ে শেলিং করত। সুপারসনিক ওই মিগ বিমানের (শব্দের চেয়ে বেশি গতিসম্পন্ন) ঝাপটায় আমাদের জানালা দরজাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠত। অবশেষে ডিসেম্বরের ৫ তারিখে আমরা ঘরের জিনিসপত্র ঘরে রেখেই তালা মেরে আমার মায়ের এক চাচার বাসায় গিয়ে উঠলাম গ্রিনরোড স্টাফ কোয়ার্টারে। ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর পাকিস্তানি সৈন্যদের নৃশংসতা বেড়ে গেল। শহরে যখন-তখন এক তাকে আটক, নির্যাতন শুরু হলো। বাড়ি থেকে বের হয়ে ফিরে আসবে কেউ তেমন নিশ্চয়তা ছিল না। এই সঙ্গে আরেক বিপদ। মাঝরাতে ভারতীয় স্কাই হক বিমান খুব ধীর গতিতে আসত অনেক ওপর দিয়ে। ওগুলো বোম্বার। তখন দেখতাম অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানগুলো নিশ্চুপ। কোনো শব্দ নেই। পরে বাবার কাছে জেনেছিলাম, ওগুলোতে এত পরিমাণ বোমা বহন হয় যে ওর গায়ে আঘাত লাগলে বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর ওই এলাকার আর কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না। তার প্রমাণ সেদিন রাতেই পেয়ে গেলাম। রাতের অন্ধকারে স্কাই হক বোম্বিং করে গেল গ্রিন রোডের জাহানারা গার্ডেনে। সকাল হতেই বাবার সঙ্গে দল বেঁধে আমরা গেলাম দেখতে। বোমার আঘাতে বাড়ি তো ধ্বংস হয়েছে বটেই, একেকটা পুকুর সমান গর্ত। গোটা চারেক বোমা জাহানারা গার্ডেনেই ফেলে যায় তারা। একটা অবিস্ফোরিত অবস্থায় পড়ে ছিল। ওটাকে ঘিরে রেখেছিল মিলিটারি পুলিশের একটি দল। আর আমাদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিল। এসব দেখে আমরা জীবনের আশা ছেড়ে দিলাম। কাল যে আমাদের বাড়ির ওপর ফেলে যাবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়। এরই মধ্যে রাতের আকাশ দিনের আলোর মতো আলোকিত করে মিগ বিমানগুলো শুরু করে নিয়মিত শেলিং। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও বাবা আমাদের দেখাতেন, মিগ বিমানের দিকে অ্যান্টি এয়ারক্রাফটের গোলাগুলো পিছু পিছু ছুটত, কিন্তু সুপারসনিক মিগের নাগালও পেত না।
এদিকে দেশের চতুর্দিক থেকে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে কোথাও পালিয়ে, কোথাও প্রাণ হারিয়ে দিশেহারা। তাদের মনোবল তখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। খোদ ঢাকা শহরেই এখানে সেখানে মুক্তিবাহিনীর চোরাগোপ্তা আক্রমণে পাকিস্তানি দু’চারটে করে সৈন্য মারা যাচ্ছিল। ঠিক তেমনি একটা দিনে আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি একটু আগেই উড়ে যাওয়া বিমান থেকে ঝলমল করে কী যে নেমে আসছে। একটু পরেই আমাদের কোয়ার্টারের মাঠ ভর্তি হয়ে গেল লিফলেটে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমরা দৌড়ে গিয়ে দু-চারটে লিফলেট নিয়ে আসি। ইতিমধ্যে চার-পাঁচ পিকআপ ভর্তি সেনা সদস্য এসে হাজির মেইন রাস্তার ওপর। বাবা বললেন– ওদের আয়ু শেষ। জেনারেল মানেক শ’ নির্দেশ দিয়েছেন– হাতিয়ার ডাল দো। পাকিস্তানি সৈন্যদের জানিয়ে দেওয়া হয়– তোমরা চতুর্দিক থেকে ঘেরাও হয়ে আছো। আত্মসমর্পণ না করলে চরম মূল্য দিতে হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোবল একেবারেই ভেঙে যায়। তারা আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিতে থাকে ভেতর ভেতর। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল তখন মুক্ত হয়ে গেছে। ঢাকার কাছাকাছি অবস্থানে তখন মুক্তিবাহিনী ও মিত্র ভারতীয় সৈন্যরা। ১৫ তারিখ রাতে বাসায় ফিরে বাবা জানালেন, ওরা (পাকিস্তানিরা) মনে হয় আত্মসমর্পণ করবে। ১৬ তারিখ সকালেই লে. জেনারেল এ কে নিয়াজি মানেক শ’র কাছে অয়্যারলেস বার্তা পাঠান। ভারতের ইস্টার্ন কমান্ড ও যৌথবাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা জেনারেল জ্যাকবকে নিয়ে আসেন ঢাকায়। একে একে গোটা বিশেক হেলিকপ্টার ঢাকার তেজগাঁও এয়ারপোর্টে এসে নামতে শুরু করে। শহরে তখন তুমুল উত্তেজনা। দূর থেকে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ। সকাল ৭টায় কোথা থেকে মুক্তিবাহিনীর শ’খানেক সদস্য আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে জয় বাংলা স্লোগানে কোয়ার্টারের মাঠে এসে উপস্থিত। দেখলাম পাকিস্তানি সৈন্যরা অস্ত্রগুলোর মুখ মাটির দিকে করে লরি ভর্তি হয়ে সব রেসকোর্সের দিকে যাচ্ছে। বাবা বললেন, ওখানেই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে। ইতিমধ্যে আরেক ঝামেলা। গ্রিন রোডের শিরিন বিল্ডিংয়ে ভারতীয় বাহিনী ক্যাম্প করেছে। কেউ তাদের কথা বুঝতে পারছে না। বাবাই শেষে গেলেন শিখ মেজরের কাছে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। হিন্দিতে কথা বলতে পেরে শিখ মেজর তো বাবাকে ছাড়তেই রাজি নয়। কীভাবে তারা পথে পাক সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে এসেছেন, মুক্তিযোদ্ধারা সঙ্গে না থাকলে কী ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হতো এসব বর্ণনা করলেন।
এদিকে বড়ভাইরা গেছে সব রেসকোর্সে। আমি গেলাম বড় আপার খোঁজে পলাশী ব্যারাক। রাস্তায় রাস্তায় কেবলই জয় বাংলা ধ্বনি। ছোট-বড় প্রায় সবার হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এত পতাকা কোথায় লুকানো ছিল– ভাবতেই অবাক হয়ে যেতে হয়। বিজয়ের সে কী উল্লাস। এখনো সেই দিনটির কথা মনে পড়লে শিহরিত হই। বড় বোনকে নিয়ে যখন বাসায় ফিরছি– শেষ বিকেলে তখন রেসকোর্সের ময়দানে দুর্ধর্ষ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল নিয়াজি ভারতীয় লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সামনে টেবিলে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করছেন।
লেখক : গল্পকার
