এক বছরে ট্রেজারি বিলের সুদহার বেড়ে দ্বিগুণ

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৪৬ এএম

ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণে ট্রেজারি বিলের সুদহার বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার প্রায় দ্বিগুণে উন্নীত হয়েছে। এতে ব্যাংক খাতে সুদহার বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে। স্বল্প সুদহারের তহবিলের ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। যদিও সরকার ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদহার এক অঙ্কে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার নিজেই ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে বেশি সুদে টাকা নিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাচ্ছে। ঝুঁকিমুক্ত ঋণে সুদহার বাড়তে থাকায় শিল্পে ঋণ আরও কমে যেতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। আর গত ৯ ডিসেম্বর এ বিলের সুদহার উন্নীত হয়েছে ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশে। এতে এক বছরে ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার বেড়েছে ৯৪ শতাংশ। এ সময় ৯১ দিন ও ১৮২ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহারও ৫০ থেকে ৬৪ শতাংশ বেড়েছে।

ট্রেজারি বিলের সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও বেড়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে সুদহার ছিল ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা চলতি বছরের ৯ ডিসেম্বর ৮ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হয়ছে। একই সময় ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

ট্রেজারি বিলের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি স্বল্পসুদের তহবিলও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। জানা যায়, ট্রেজারি বিলের সুদহারের কারণে বিশ^ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অ্যান্ড ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি প্রজেক্টের (আইপিএফএফ) স্বল্প সুদহারের তহবিলও শেষ পর্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অংশ হিসেবে ১ শতাংশেরও কম সুদে এ তহবিলটি ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশকে প্রদান করে বিশ^ব্যাংক। কিন্তু এ তহবিল থেকে ঋণগ্রহীতাদের ১০ শতাংশের বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দেশি একটি কোম্পানি গাজীপুরের হাইটেক পার্কের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশ^ব্যাংকের আইপিএফএফ তহবিল থেকে নেওয়া ঋণের সুদ দিতে হচ্ছে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। মূলত ট্রেজারি বিলের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় স্বল্পসুদের এ তহবিল ঋণগ্রহীতাদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। 

এ বিষয়ে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশি তহবিল থেকে ঋণ নিতে হলে বেঞ্চমার্ক হিসেবে ট্রেজারি বিলের সুদহার ব্যবহার হয়। তাই ট্রেজারি বিলের সুদহার বাড়লে ওইসব তহবিলের ঋণের সুদহারও বাড়বে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ট্রেজারি বিলের সুদহার বেড়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে সরকারের ঋণগ্রহণ প্রবণতা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ধার বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি (অনুদান বাদে) দাঁড়াবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ও বিদেশি উৎস থেকে ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় এক বছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে যে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, অর্থবছর শুরুর মাত্র পাঁচ মাসেই তার ৯০ শতাংশ নিয়ে ফেলেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক থেকে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছে, যা ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় আরও কমে গেলে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের নির্ভরতা আরও বাড়বে। এর ফলে ট্রেজারি বিলের সুদহার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসেই এ খাতের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি নভেম্বর শেষে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ২১ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা।

এদিকে সরকারের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। অক্টোবরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ১০ শতাংশে, যা গত নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

জাহিদ হোসেন বলেন, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার কারণে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়ে গেছে। আবার ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদা বেশি ও সরবরাহ কম থাকার কারণে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বাড়ছে। তিনি জানান, ট্রেজারি বিল নিলামের মাধ্যমে সরকারের যে পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের টার্গেট থাকে, অনেক সময়ই তাতে ঘাটতি দেখা যায়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সাপোর্ট দেয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সাপোর্ট না দিত তাহলে ট্রেজারি বিলের সুদহার আরও বাড়ত।

এর প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকারকে দেওয়া ঋণ ঝুঁকিবিহীন। ঝুঁকিমুক্ত এই ঋণে যদি ব্যাংকগুলো ৭-৮ শতাংশ সুদ পায়, তাহলে ব্যাংকগুলো কেন শিল্প খাতে ৯ শতাংশ সুদে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণে যাবে। যেখানে পুরো ঋণ খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই শিল্পে ব্যাংকঋণ আরও কমতে পারে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত