বিমান আনতে ৪৫ কর্মকর্তা খরচ পৌনে ৩ কোটি টাকা!

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:৪১ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে কেনা দুটি ড্রিমলাইনার উদ্বোধন করার কথা আগামী ২৮ ডিসেম্বর। উড়োজাহাজ দুটি আনবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। ৪৫ জনের এই দলে রয়েছেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিবও। ইতিমধ্যে দলের অনেকেই চলে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে। সব মিলে তাদের পেছনে বিমানের খরচ পড়বে অন্তত পৌনে ৩ কোটি টাকা। বিষয়টি নিয়ে খোদ বিমানেই চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, এই মুহূর্তে উড়োজাহাজ ক্রয়ের কোনো পরিকল্পনা ছিল না সরকারের। তবে ‘বাণিজ্যযুদ্ধের’ জটিলতার কারণে চীনের হেইনান এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার বাতিল করে। পরে বোয়িং ঘোষণা দেয় সেগুলো অর্ধেক দামে বিক্রির। সেই সুযোগ নেয় বাংলাদেশ। প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসলে তিনি বিশেষ উদ্যোগ নেন। দ্রুত সময়ের মধ্যেই বিমান কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রে যোগাযোগ করে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করে দুটি উড়োজাহাজ আনার। অবশ্য এর মাঝে বিমানের প্রকৌশলী শাখার

লোকজন উড়োজাহাজগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসেন।

জানা গেছে, একেকটি বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজের বর্তমান বাজারমূল্য ২৯২ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ২ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। এতে দুটি উড়োজাহাজে দাম পড়ে ৪ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। চীনা কোম্পানিটি অর্ডার বাতিল করায় বিমান কর্তৃপক্ষ বোয়িংয়ের সঙ্গে দর-কষাকষি করে তা অর্ধেক দামে নামিয়ে আনে। সব মিলিয়ে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কমে কেনা হয় ড্রিমলাইনার দুটি। যার একটি সম্প্রতি দুবাই এয়ার শোতে অংশ নেয়।

উড়োজাহাজগুলো ক্রয় করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সহায়তা করে। এজন্য সোনালী ব্যাংক ১০ বছর মেয়াদে দিয়েছে ৩১ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ২ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, টানা প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার উড়তে সক্ষম একেকটি ড্রিমলাইনার ৩০০ যাত্রী বহনে সক্ষম। তিনি বলেন, বিমানের বহরে বর্তমানে চারটি ড্রিমলাইনারসহ ১৬টি উড়োজাহাজ আছে। তার মধ্যে ১০টি নিজস্ব অর্থ দিয়ে কেনা; বাকিগুলো লিজে নেওয়া। নতুন ড্রিমলাইনার দুটিতে মোবাইলে কথা বলা, টিভি চ্যানেলের লাইভ স্ট্রিমিংসহ অত্যাধুনিক নানা সুবিধা পাবেন।

বিমানের আরেক কর্মকর্তা বলেন, নতুন দুটি উড়োজাহাজের জন্য ৪০টি নাম ঠিক করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে তিনি ‘সোনার তরী’ ও ‘অচিন পাখি’ নাম পছন্দ করেছেন। উড়োজাহাজ দুটি ২০ ও ২২ ডিসেম্বর আসবে। উদ্বোধন করা হবে ২৮ ডিসেম্বর।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে আরও ভালো প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে সরকার নানা চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর। প্রধানমন্ত্রীর একান্ত প্রচেষ্টায় আরও দুটি ড্রিমলাইনার আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়, বিমান ও বেবিচকের কর্মকর্র্তারা বিমান আনতে যুক্তরাষ্ট্র গেছেন। তিনি বলেন, বিমানের ফ্লাইটগুলো যাতে নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়ে যায় সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। বিমানে কোনো দুর্নীতিবাজদের স্থান নেই। যারা সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের অব্যশই মূল্যয়ন করা হবে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানের বহরে নতুন নতুন উড়োজাহাজ আসছে এটাই অবশ্যই ভালো লক্ষণ। আগে উড়োজাহাজের সংখ্যা ছিল কম। এখন বিমানে যাত্রী বাড়ছে। ২৮ ডিসেম্বর নবনির্মিত থার্ড টার্মিনালের পাশাপাশি দুটি উড়োজাহাজও উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

বিমান সূত্র জানায়, নতুন দুটি ড্রিমলাইনার আনতে ৪৫ কর্মকর্তার বেশিরভাগই ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে পৌঁছেছেন। এই প্রতিনিধি দলে আছেন বিমানের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) এনামুল বারী, বিমান বোর্ডের সদস্য মফিদুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব ইকলাসুর রহমান, কবিরুল ইজদানী খান, যুগ্ম সচিব মোশারফ হোসাইন, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পরিচালক-১০ আনিসুর রহমান, ডেপুটি সেক্রেটারি এসএম সাফিয়াত হোসাইন, বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ এ জলিল, ডেপুটি সেক্রেটারি ফারহানা রহমান, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা তানভীর আহম্মেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাজী সাইদুর রহমান, ফ্লাইট অপারেশন ক্যাপ্টেন এ বি এম ইসমাইল, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এআরএম কিশোর জামান, প্রিন্সিপাল সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার শরীফ রুহুল কুদ্দুস, হুমায়ুন কবীর, ইঞ্জিনিয়ার অফিসার নুরুউদ্দিন আহম্মেদ সেলিম, হিরাজাল চক্রবর্তী, মোহাম্মদ গাজীউল ইসলাম, ফকরেজ্জামান, এসএম নাহিনাল হক, মনিরুল ইসলাম, এম মাসুদুর রহমান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জেনালের ম্যানেজার (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকার, জিয়া আহম্মেদ, ক্যাপ্টেন মোনতাসির রহমান, এ কে এম আমিনুল ইসলাম, সিদ্দিকুর রহমান, সাজ্জাদুল হক, তানভীর খুরশিদ ও শেখ আব্বাস হোসাইন, ফাস্ট অফিসার সাদাত জামিল, জেএসএমএম বিল্লাহ, আতিয়াব জুবায়ের জাফর, মিথালী হক দুলালী, মন্দিরা সাদু খান, ফেরদৌসী মাসুদ রিফাত, কাজী তাসমিনা মিশু, ফরিদ মোস্তাফিজ তাহমিদ, শাহনুর হোসাইন, জামাল উদ্দিন আরিয়ান, আহম্মেদ মুনীর চৌধুরী, রাশেদা বেগম দীপ্তি, জোহরা ফাতেমা, সাইফুল হক শাহ ও রাজেশ^র দাস।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যান্ত্রিক পরিবহন হওয়ায় সেখানে প্রকৌশলী যাবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে অন্য কর্মকর্তাদের কাজ কী বুঝতে পারছি না। এর আগে কখনো এতবড় বহর যায়নি। দুটি উড়োজাহাজ আনতে ১৫-২০ জন গেলেই হতো। একেকজনের পেছনে অন্তত ৬ লাখ টাকা করে খরচ হবে; বেশিও লাগতে পারে। কারণ ছয় থেকে সাত দিন তাদের থাকতে হবে, রাখতে হবে উন্নত হোটেলে। সম্প্রতি বিমানের বোর্ড মিটিংয়েও খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত টিকছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত