রাষ্ট্রপতিকে উকিল নোটিস টেলিনরের

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:৪০ এএম

নিরীক্ষা আপত্তির সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার বিষয়টি নিষ্পত্তিতে সালিশ (আরবিট্রেশন) চেয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে উকিল নোটিস পাঠিয়েছে দেশের শীর্ষ টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোনের সিংহভাগ শেয়ারের মালিক টেলিনর।

সালিস না হলে টেলিনর আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করবে বলে নোটিসে জানানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন।

মোস্তফা জব্বার বলেন, গ্রামীণফোন সিঙ্গাপুরের একটি ল ফার্মের মাধ্যমে আমাদের রাষ্ট্রপতিকে উকিল নোটিস দিয়েছে আরবিট্রেশনে যাওয়ার জন্য। আমি মনে করি, এটি খুব দুঃখজনক। বাংলাদেশে ব্যবসা করবে একটি প্রতিষ্ঠান, সেই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের রাষ্ট্রপতিকে উকিল নোটিস দিয়ে সালিসের জন্য চাপ দেবে, এটা বোধ হয় খুব সহজে গ্রহণ করার মতো অবস্থা নয়।

তবে টেলিনরের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটা একান্তই তাদের পদক্ষেপ, গ্রামীণফোনের সঙ্গে এর সম্পৃক্ত তা নেই।

টেলিনর গ্রুপের এশিয়া কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক ক্যাথরিন স্ট্যাং লান্ড এক বিবৃতিতে জানান, বাংলাদেশে টেলিনর গ্রুপের সম্পদের সুরক্ষা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধ মীমাংসার জন্যই টেলিনর একটি নোটিস পাঠিয়েছে এবং সেখানে বাংলাদেশ সরকারকে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে একটি গঠনমূলক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়।

ক্যাথরিন স্ট্যাং লান্ড বলেন, দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তিও আলোচনাকে উৎসাহিত করে। আর টেলিনর এখনো বিশ্বাস করে, নিরীক্ষা আপত্তি নিয়ে অপারেটর ও সরকার যদি বন্ধুত্বপূর্ণ উপায়ে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারে, সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো।

উকিল নোটিসের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা জব্বার বলেন, ‘আমাদের যে উকিল নোটিস দেওয়া হয়েছে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত তা অবহিত করা আছে এবং ফরেন মিনিস্ট্রিসহ সবাই এ বিষয়টি জানে। আমরা আমাদের আইনজ্ঞদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি। এই উকিল নোটিস নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা চাচ্ছে আরবিট্রেশন যেন করা হয়। আরবিট্রেশন করার জায়গা দিয়ে তো আমরা উন্মুক্ত হয়েই আছি। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতে মামলা থাকলে আমার তো আদালতের বাইরে আরবিট্রেশন করার কোনো সুযোগ নেই। আদালত যদি আমাকে আরবিট্রেশন করার জন্য হুকুম দেন, আমি আরবিট্রেশন করতে পারব।’

দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের ৭ কোটি ৬০ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। আর গ্রামীণফোনের মোট শেয়ারের মধ্যে ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ রয়েছে টেলিনরের মালিকানায়। টেলিকম খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে একমাত্র গ্রামীণফোন দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত, যার বাজার মূলধন ৩৯ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। সরকারের পাওনা আদায়কে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিবাদে চলতি বছর ২০ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে কোম্পানিটি।

বিভিন্ন খাতে ১২ হাজার ৫৮০ কোটি (বিটিআরসির ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি ও এনবিআরের ৪ হাজার ৮৬ কোটি) টাকা পাওনা হিসেবে দাবি করে গ্রামীণফোন লিমিটেডকে গত ২ এপ্রিল চিঠি দেয় বিটিআরসি। ওই পাওনা দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে গ্রামীণফোন নিম্ন আদালতে একটি মামলা করে ও পাওনা দাবির অর্থ আদায়ের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চায়। গত ২৮ আগস্ট ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন নামঞ্জুর করে। এর বিরুদ্ধে গ্রামীণফোনের পক্ষে গত ১৬ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়। ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট ওই অর্থ আদায়ের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই আদেশ স্থগিত চেয়ে বিটিআরসি আবেদন করে, যা চেম্বার বিচারপতির আদালত হয়ে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য আসে।

শুনানি শেষে গত ২৪ নভেম্বর গ্রামীণফোনকে তিন মাসের মধ্যে আপাতত দুই হাজার কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। অন্যথায় গ্রামীণফোনের কাছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দাবি করা সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার ওপর হাইকোর্টের জারি করা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়ে যাবে বলেও সতর্ক করে আদালত। এমন পরিস্থিতিতে টেলিনর সালিস চেয়ে রাষ্ট্রপতিকে নোটিস দিল।

টেলিনর আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে কি নাÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা জব্বার বলেন, তারা এমন রকম একটি ধারণা দিয়েছে, যদি আরবিট্রেশন না হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবে। তবে আমরা এটা নিশ্চিত হয়েছি যে, কোনো দেশে ব্যবসা করে সেই দেশের আইন-আদালত অমান্য করে দুনিয়ার কোনো জায়গায় গিয়ে অন্য বিচার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশের আদালতে যে অবস্থা আছে, সেই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, আমরা সঠিক পথে আছি এবং আদালত যে নির্দেশনা দিয়েছে, সেই নির্দেশনা বরং আমরা আরও নমনীয় পর্যায়ে যাওয়ার চিন্তা করছি।

আর গ্রামীণফোন যতক্ষণ না আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করছে, ততক্ষণ তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসা সম্ভব নয়। দেশের জনগণের অর্থ জাতীয় সম্পদ, এটি আদায় করতেই হবে। এ টাকা দেওয়ার পর আদালত নির্ধারণ করবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত