বিভ্রান্তিমূলক রাজাকার তালিকার পেছনে কারা

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৩৭ এএম

রাজাকারের তালিকা নিয়ে একটি ভুয়া খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় শুধু ভাইরালই হয়নি, বরং মানুষের মুখে মুখে ফিরছে নানা কথা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মনে করেন, এ খবর প্রকাশের ফলে মন্ত্রণালয় বা তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে প্রবলভাবে। আমরাও তাই মনে করি। অসত্য খবর প্রকাশ পেলে প্রশ্নবিদ্ধ হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। সামাজিকভাবে শুধু ব্যক্তিই নয়, তার পরিবার-পরিজনও হেয় প্রতিপন্ন হয়। সে কারণেই যেসব গণমাধ্যম এমন সংবাদ প্রচার করেছে, তাদের নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়াসহ প্রকাশিত সংবাদটি প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলো ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ক্ষমা চেয়ে সংবাদটি প্রত্যাহার না করলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলে জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে।

মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে অসত্য খবর প্রকাশের পক্ষে আমরা নই। একটা মিথ্যা বা অসত্য খবর প্রকাশের ফলে মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের মানসিক অবস্থা কী হতে পারে সেটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকেই অনুমান করা যায়। কিন্তু যাচাই ছাড়া রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও স্বাধীনতাকামী মানুষদের নামসহ তালিকা প্রকাশ করলে ওই মুক্তিযোদ্ধা বা তার পরিবারের লোকদের মানসিক অবস্থা কতটা কষ্টের হতে পারে, সেটি কি মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয় অনুভব করতে পারছেন?

রাজাকারের তালিকায় যেসব মুক্তিযোদ্ধার নাম এসেছে তাদের কাছে ওই তালিকা অসত্য সংবাদের চেয়েও শত শত গুণ বেশি মারাত্মক। কেননা, তারা জীবন-যৌবন-পরিবার-পরিজন সবকিছু তুচ্ছ করেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বিভ্রািন্তকর তালিকায় নাম প্রকাশ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনের শ্রেষ্ঠতম সেই সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করার দায়ে কি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ক্ষমা চেয়েছেন? উত্তরটি কিন্তু ‘না’। তিনি শুধু দুঃখ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। এছাড়া তিনি বিবৃতি দিয়ে রাজাকারের তালিকায় আসা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম কাটাতে আবেদন করার কথা বলেছেন। অসত্য তথ্য দিয়ে তালিকা প্রকাশ করলে তা ঠিক করার দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু তার জন্য আবেদন চাওয়ার বিবৃতিতে মন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন আছে বলে মনে করি না। একইভাবে ওই তালিকাটি এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি, স্থগিত হয়েছে মাত্র!

তাড়াহুড়ো করে বিজয় দিবসের আগেই রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ওই তালিকা নিয়ে অস‡ন্তাষ ও ড়্গোভও প্রকাশ করেছেন তিনি। এমন খবর উঠে এসেছে গণমাধ্যমে।

যেসব মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের নাম তালিকায় এসেছে তাদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ঠিক এভাবে– ‘যারা মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, যারা শহীদ পরিবার তারা সব সময় আমাদের কাছে সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তারা জাতির কাছে সব সময় শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবেই থাকবেন। এটা খুব স্বাভাবিক একটা মানুষের কষ্ট লাগবে। যার পরিবারের মানুষ শহীদ হলো, যারা এত কষ্ট করল, যারা মুক্তিযুদ্ধ করল তাদের যদি রাজাকার বলা হয়, এর থেকে দুঃখের কষ্টের আর কিছু থাকে না।’

প্রকাশিত তালিকা কোনোভাবেই রাজাকারের তালিকা নয় মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেছেন– ‘কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার খেতাব দেওয়া হবে না, হতে পারে না। এটা অসম্ভব। অন্তত আমার সময় না। এটা কোনো দিন আমরা হতে দেব না। যারা রাজাকার তাদের তো আলাদা গেজেট করাই আছে। কাজেই কোনো মতে এই তালিকা রাজাকারের তালিকা না। আমি বলেছিলাম। কিন্তু কেন এটা দিয়ে দিলেন আমি জানি না। এটা দেওয়ার কথা ছিল না। বিশেষ করে বিজয় দিবসের আগে না। আমি আগেই বলেছি, রাজাকারের তালিকা এবং রাজাকার, আল বদর, আল শামস কিন্তু গেজেটেড। আপনারা যদি সেই সময়ের পত্রিকাও দেখেন সেই পত্রিকাতেও কিন্তু এগুলো ছাপা আছে। ট্রাইব্যুনাল যখন হয় করাচি থেকে অনেক পত্রিকার কাটিং আমরা নিয়ে এসেছিলাম। সেগুলো আমরা সংগ্রহ করেছিলাম।’

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ১০ হাজার ৭৮৯ জনের রাজাকারের তালিকাকে প্রকৃত রাজাকারের তালিকা বলছেন না। পাশাপাশি রাজাকারের তালিকাকরণে সহায়ক প্রমাণ্য ও যাচাইয়ের কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। তবুও ওই তালিকা বাতিল না করে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কেন কেবল ‘স্থগিত’ করেছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একটি বিষয় আমাদের ভাবিয়ে তুলে। তিনি নিষেধ করা সত্ত্বেও কেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করলেন? স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর রাজাকারদের একটি বিভ্রািন্তমূলক তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি যে শুধু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করেছেন তা নয়, সরকারের কার্যক্রম, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। রাজাকারদের এই তালিকা প্রকাশের উদাহরণটিকে স্বাধীনতা বিরোধীরা একাত্তরের ইতিহাসকে বিতর্কিত করার কাজে ব্যবহার করবে বহুদিন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। এই দায় নিয়ে সরকার, দেশ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বার্থে তার পদত্যাগ করাটাই বরং যুক্তিযুক্ত ছিল।

পাশাপাশি বর্তমান সরকার টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও কীভাবে রাজাকারের এ তালিকা প্রণীত হলো, কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের নাম সেখানে লেখা হলো, কেন অনেক চিহ্নিত রাজাকারের নাম তালিকায় নেই, কেন যাচাই ছাড়াই বিতর্কিত তালিকা প্রকাশ করা হলো, এ তালিকা প্রকাশের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন কারা– সেটি বের করে তাদের বিরুদ্ধেও শািস্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু সে রকম উদ্যোগ ও প্রক্রিয়ার কোনো ঘোষণা সরকার এখনো দেয়নি।

কারা সরকারের ভেতর ঘাপটি মেরে আছে? রাজাকারের তালিকায় কারা যুক্ত করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম? তারা কারা কোন আদর্শের লোক সেটি স্পষ্ট করার দায়িত্বও সরকারকেই নিতে হবে। অন্যথায় সরকারের মন্ত্রী ও কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্বহীনতার সুযোগকে পুঁজি করে তারা বড় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে। সরষের ভেতরের ভূত কারা– এটা সরকারকেই বের করতে হবে। তদন্ত করে রাজাকারের বিভ্রািন্তমূলক তালিকা প্রকাশের পেছনে ‘রাজাকারদের’ তালিকাটিও আমরা দেখতে চাই। নিশ্চয়ই সরকার সেটি করবে। এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, স্থানীয়ভাবে যাচাই-বাছাই করে এবার রাজাকারের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। কিন্তু যারা এই বিভ্রািন্তমূলক তালিকা প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের মাধ্যমেই সঠিক তালিকা হবে বলে আমরা মনে করি না। কেননা তাদের ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই একটি ভালো উদ্যোগ শুধু মুখ থুবড়েই পড়েনি, বরং সরকার বিতর্কিত হয়েছে প্রবলভাবে। তাই তালিকা যাচাইয়ের আগে দায়িত্বশীলদের যাচাই-বাছাই করতে হবে। তা না হলে সরকার এ তালিকা নিয়ে আবারও প্রশ্নের মুখে পড়বে।

অনেক আগে শুরু হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটিই এখনো বিতর্কমুক্ত করতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোকেও কাজে লাগানো যেতে পারে।  

স্বাধীনতা লাভের পরপরই যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারসহ এদের তালিকা চ‚ড়ান্ত করা যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু সেটি করতে না পারার ব্যর্থতায় বাঙালি জাতিকে এখনো মূল্য দিতে হচ্ছে নানাভাবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলন ও শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ থেকেও উচ্চারিত হয়েছিল রাজাকারদের তালিকার দাবিটি। দেরিতে হলেও সে দাবির কিছুটা আলোর মুখ দেখবে–এমনটাই আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু এ কাজে যারা যুক্ত থাকবেন তারা নির্মোহ ও দায়িত্বশীল থেকে ইতিহাসের দায়মুক্তির জন্য কাজ করবেন– তেমনটাই সবার প্রত্যাশা। তাড়াহুড়ো করে বিভ্রািন্তমূলক তালিকা আমরা চাই না। রাজাকারের তালিকা হোক তথ্য-প্রমাণ ও সঠিক যাচাইয়ের ভিত্তিতে।    

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত