আমি ভাবছি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) কেন এত ক্ষোভ উসকে দিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার তা সত্যিই বুঝতে পারছে কি না। কারণ, কোনো একটি দেশ কীভাবে তার নাগরিককে সংজ্ঞায়িত করে তা সেটি কেমন দেশ সে বিষয়টিকেও তুলে ধরে। নাগরিকত্ব বলতে বোঝায় অন্যান্য অধিকার থাকার অধিকারকে। এটি থেকেই সবকিছু উৎসারিত হয়।
এখন ১৪ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিকতার প্রশ্নটি আবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। প্রথমত, এটি কি আমাদের সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী, যা কি-না সংবিধানের মুখবন্ধে দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষতার অঙ্গীকারের মধ্যে বিধৃত হয়েছে? সুপ্রিম কোর্ট ওই চেতনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন, তার ওপরই এ প্রশ্নের জবাব নির্ভর করছে। একেকজন বিচারক একেকরকম মতামত দিতে পারেন। দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কি ভারতীয় সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক? এ অনুচ্ছেদে আইনের চোখে প্রত্যেক ব্যক্তির সমান হওয়া বা আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আইনটি ১৪ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না– তা নির্ভর করবে এটির সুবিধাভোগীদের একটি যৌক্তিক শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হয়েছে কি না, তার ওপর। এ ব্যাপারটি সহজেই যাচাই করা যায়। ভারত সরকারের বিশ্বাস, আইনটির ‘স্টেটমেন্ট অব অবজেক্টস অ্যান্ড রিজন্সের (এসওআর-উদ্দেশ্য ও কারণবিষয়ক বিবৃতি) মধ্যে যৌক্তিক শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের সংবিধানে একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রধর্মের বিধান রয়েছে। এর ফলে ওইসব দেশে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ ধর্মের ভিত্তিতে নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছে।’ সরকারের এই শ্রেণিবিন্যাসের দুটি সুস্পষ্ট অংশ রয়েছে এবং দুটিকেই সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের পরীক্ষায় দাঁড়াতে হবে।
প্রথমত, শুধু কি পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশই নির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্রধর্ম রয়েছে, এমন প্রতিবেশী দেশ? এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে : ‘না’। ভারতের প্রতিবেশী ভুটানেরও একটি রাষ্ট্রধর্ম রয়েছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ নিয়ে একটি শ্রেণিবিন্যাস গঠনের একমাত্র উপায় ছিল এসওআরে যদি রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম ধর্মের নাম উল্লেখ করা হতো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। এটি কেবল ‘একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রধর্মে’র কথা বলেছে। এদিক থেকে দেখলে এটি অন্য তিন রাষ্ট্রের মতো ভুটানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে শুধু কি হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ই ধর্মের ভিত্তিতে নিপীড়নের মুখোমুখি? মনে রাখবেন এখানে ব্যবহৃত শব্দটি হচ্ছে ‘সম্প্রদায়সমূহ’। এ ছয়টিকে ধর্ম হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। সম্প্রদায় শব্দটিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষকে অন্তভুক্ত করা হয়ে থাকে।
সুতরাং দ্বিতীয় প্রশ্নটির জবাবও হচ্ছে, ‘না’। পাকিস্তানে আহমদিয়া, বাহাই ও শিয়াদের ওপর নিয়মিত নির্যাতন চালানো হয়। আফগানিস্তানেও নির্যাতিত হচ্ছে শিয়া হাজারারা। এখন, আপনি প্রশ্ন করতে পারেন যে, এগুলো পৃথক ধর্ম কি না। তবে এগুলো যে পৃথক সম্প্রদায়, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তারা ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়েছে তা-ও সন্দেহাতীত বিষয়।
আলোচনার এই পর্যায়ে কয়েকটি বাড়তি তথ্য আরও কিছু আলোকপাত করতে পারে। পাকিস্তানে ১৯৭৪ সালে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছিল। এর অর্থ হচ্ছে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে তারা নিজস্ব একটি ধর্মের অধিকারী। ওই ঘোষণার ফলে আনুমানিক চল্লিশ লাখ আহমদিয়া পাকিস্তানের বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া আহমদিয়ারা ‘ধর্মত্যাগী’ বলে গণ্য হওয়ায় দেশটিতে তারা যে বৈষম্যের মুখোমুখি হয়, তা হিন্দু ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের চেয়েও অনেক খারাপ। বিবিসির ‘রিয়ালিটি চেক’ টিমের মতে, ২০১৮ সাল অবধি সবচেয়ে বেশি ধর্ম অবমাননার মামলা করা হয়েছে আহমদিয়াসহ অন্যান্য মুসলমানের বিরুদ্ধে। খ্রিস্টান ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়। তবু আহমদিয়াদের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতাভুক্ত করা হয়নি।
পাকিস্তানের হিন্দুদের সম্পর্কে বিবিসি সরকারের এ দাবিকে ‘চ্যালেঞ্জ’ করেছে যে, ১৯৪৭ সালের ২৩ শতাংশ থেকে তাদের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। ‘১৯৯৮ সালের আদমশুমারির তথ্য থেকে দেখা যায়, পাকিস্তানে (যার নাম একসময় ছিল পশ্চিম পাকিস্তান) হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা ১৯৫১ সালের প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ হার থেকে উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি। বরং বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এটি ১৯৫১ সালের ২৩ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে ৮ শতাংশ হয়েছে। তবে ২০১৭ সালে আবার বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপরও কিন্তু উভয় দেশেই হিন্দুরা প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য হয়েছেন। ১৯৭৪ সালের পর আহমদিয়াদের ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটি ঘটেনি।
যাই হোক, এসওআরে শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে আরও একটি সমস্যা রয়েছে। এতে উল্লিখিত ছয়টি সম্প্রদায়ের ‘অনেক লোকের’ কথা বলা হয়েছে। স্পষ্টতই এতে প্রত্যেকের কথা বলা হয়নি। কিন্তু এই আইনের দ্বিতীয় ধারায় ছয়টি সম্প্রদায়ের ‘যেকোনো ব্যক্তি’র কথা বলা হয়েছে। তাহলে কি এই স¤প্রদায়গুলোর প্রত্যেকেই ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার? ওই সব সম্প্রদায় থেকে আসা সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং মন্ত্রীরাসহ?
আমি বলব– যদিও আমি আইনজ্ঞ নই, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের উদ্দেশ্য ও কারণবিষয়ক বিবৃতিতে শ্রেণিবিন্যাসের খামখেয়ালিপূর্ণ ভাষা এবং এ বিবৃতি ও আইনটির মধ্যে যে অসামঞ্জস্য, একে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার ভিত্তি হতে পারে।
লেখক : ভারতের বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং আলোচিত স্মৃতিকথা ‘ডেভিল’স অ্যাডভোকেট : দি আনটোল্ড স্টোরি’র লেখক। হিন্দুস্থান টাইমস থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ
