শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক পদে পদোন্নতির এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) বিকৃতির জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে পারেনি তদন্ত কমিটি। গোপনীয় প্রতিবেদনে ঘষামাজার কাজে সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করতে অন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুয়েক দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তদন্ত কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানান। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের দ্বিতীয় শ্রেণির ৪৮ জন শ্রম পরিদর্শককে (সাধারণ) প্রথম শ্রেণির সহকারী মহাপরিদর্শক
পদে পদোন্নতির দিতে গত ২৪ জুন পিএসসিতে একটি প্রস্তাব পাঠায় শ্রম মন্ত্রণালয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিএসসির সুপারিশ নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে পিএসসি দেখতে পায় ১৯ জনের এসিআরে অনুবেদনকারী কর্মকর্তার নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের এসিআরেও ঘষামাজা রয়েছে। কার এসিআরে কী সমস্যা তা উল্লেখ করে পিএসসি গত ২৪ জুলাই সংশোধনের জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়।
তদন্ত কমিটির প্রধান শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ করতে পারিনি। অতিরিক্ত সময় নিয়েছিলাম। তবে অনুমোদিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত শেষ করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।’
এ কে এম রফিকুল ইসলাম ছাড়াও তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক জয়নাল আবেদীন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রুহুল আমীন।
তদন্ত কমিটি কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পদোন্নতির প্রস্তাবে যাদের নাম ছিল তাদের প্রত্যেককে আলাদা ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে তারা এ পদোন্নতির জন্য কাদের টাকা দিয়েছেন এবং কী পরিমাণে টাকা দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তারা এসব ঘটনা জানতে চাওয়ার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে কীভাবে এ সংক্রান্ত সংবাদ গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে গেল তাও জানতে চেষ্টা করেছে।
তদন্ত কমিটি শ্রম মন্ত্রণালয় ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের করেনি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় পিএসসির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। পিএসসির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার জন্য তদন্ত প্রতিবেদন দুয়েক দিনের মধ্যেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে এসিআর ঘষামাজার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে কি না।
তদন্ত কমিটি সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে শ্রম মন্ত্রণালয়ে এসিআরে ঘষামাজা করা হয়েছে কি নাÑ তা নিশ্চিত হতে পারেনি। পদোন্নতির প্রস্তাব প্রায় এক মাস শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পড়ে ছিল। সুপারিশের জন্য যেদিন পাঠানো হবে তার আগের দিন সংশ্লিষ্ট শাখার উপসচিব দিল আফরোজ ওই শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা জসিম উদ্দীনকে প্যাকেট সিলগালা করে পদোন্নতির প্রস্তাব পিএসসিতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। দিল আফরোজ তদন্ত কমিটিকে জানান, ওই সময় পর্যন্ত এসিআরে কোনো ঘষামাজা তিনি দেখতে পাননি। কিন্তু পরের দিন পিএসসিতে পাঠানোর সময় তিনি পুনরায় প্যাকেট খুলে এসিআর দেখেননি। পরের দিন না দেখে এসিআর প্যাকেট করার কারণে তদন্ত কমিটি তাকে ভর্ৎসনা করেছে। তিনি নিজেও কমিটির কাছে পাঠানোর দিন না দেখে এসিআর প্যাকেট করার কারণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
মতামতের জন্য এসিআর পাঠানোর প্রায় এক মাস পর পিএসসি শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ঘষামাজার কথা জানান। তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশ্ন হচ্ছে, এসিআরে ঘষামাজা হলে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই পিএসসির কর্মকর্তারা কেন দেখলেন না। বিষয়টি ধরতে তাদের কেন এক মাস সময় লাগবে। এই এক মাসে পিএসসিতেই এসিআর ঘষামাজা হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। পিএসসিকে যেহেতু জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি তাই তারা অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি চেয়েছেন।
পিএসসির সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় না আনতে পারলেও সাংবিধানিক ওই সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে তদন্ত কমিটি। ওই সময় শীর্ষ পর্যায়ের ওই কর্মকর্তাও তদন্ত কমিটিকে বলেছেন পিএসসি থেকেও এসিআর ঘষামাজা হতে পারে। এ কারণেই তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে কর্মরত ৩৪তম বিসিএসের এক ননক্যাডার কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ৪৮ জন কর্মকর্তাকে সহকারী মহাপরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য মনোনীত করা হয়। ৩৪তম বিসিএস দিয়ে চাকরিতে প্রবেশকারী কর্মকর্তাদের যোগ্যতা থাকার পরও তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ কারণে তারা আদালতে মামলা করেছেন।
কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দ্রুত পদোন্নতি পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টরা এসিআরে ঘষামাজা করে নম্বর বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। বিষয়টি একদিকে তদন্তাধীন অন্যদিকে আদালতে বিচারাধীন। সব মিলিয়ে এসব বিষয়ের সুরাহা না হলে কারও কপালেই পদোন্নতি জুটবে না। এ অবস্থায় অনেক যোগ্য কর্মকর্তা পদোন্নতি না নিয়েই চাকরি থেকে অবসরে যাবেন।
তিনি আরও জানান, শুরু থেকেই শ্রম মন্ত্রণালয় বিষয়টি তদন্ত করতে গড়িমসি করেছে। পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ পড়া কর্মকর্তারা বিষয়টি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারকদের জানান। কিন্তু অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিষয়টি আমলে না নিয়ে এসিআর সংশোধন করার কাজ এগিয়ে নিতে থাকেন। এ অবস্থায় বঞ্চিত কর্মকর্তারা ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে বেনামে চিঠি দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। এর প্রায় এক মাস পর তদন্ত কমিটি গঠন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। শ্রম মন্ত্রণালয় জালিয়াতকারীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা না করে সংশ্লিষ্ট এসিআর সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। শেষ পর্যন্ত দুর্বল তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সংশ্লিষ্ট শাখার যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে কমিটি গঠন করায় বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তদন্তে ওই কমিটি দায়ীদের খুঁজে বের করতে না পারায় সেই প্রশ্নবিদ্ধের বিষয়টি পুনরায় সামনে এসেছে। এ ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উচিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের চিহ্নিত করা এবং ফৌজদারি আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা।
