বিদায় নিতে চলেছে ২০১৯ সাল। বরাবরের মতো এ বছরও নানা ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে বিশ্বে আলোচনায় থেকেছে দক্ষিণ এশিয়া। এ অঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল সবার আগ্রহে। ভালো-মন্দের সঙ্গে আশাবাদী হওয়ার এমন কয়েকটি ঘটনা উঠে এসেছে ফরেন পলিসির প্রতিবেদনে। বিশ্বব্যাংকের বরাতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্ণনায় এ অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে সবচেয়ে ভালো বলা হয়েছে। সঙ্গে উচ্চশিক্ষার জন্য ২১৫ শতাংশ বেশি বাংলাদেশির যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়াকে আশাবাদী হওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘুষ, দুর্নীতি ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাবে কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়নি বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ অঞ্চলে ২০১৯ সালে সবচেয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ (৮ দশমিক ১ শতাংশ) ও নেপাল (৭ দশমিক১ শতাংশ) । ভারত (৬ শতাংশ), পাকিস্তান (৩ দশমিক ৩ শতাংশ), মালদ্বীপ (৫ দশমিক ২ শতাংশ), ভুটান (৫ শতাংশ), শ্রীলঙ্কা (২ দশমিক৭ শতাংশ) ও আফগানিস্তানের (২ দশমিক ৭ শতাংশ) অর্জন ছিল শ্লথ।
দ্বিতীয় আলোচিত ভারতের অর্থনৈতিক অশনিসংকেত। বিশ্বের অন্যতম অর্থনীতির দেশ হলেও, ২০১৬ সালের পর থেকে প্রবৃদ্ধি পড়তি। ৯ দশমিক ৩ শতাংশ উঠলেও, সবশেষ প্রান্তিকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে এবং কয়েক বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমালেও ব্যবসার পরিবেশ ফেরেনি। উল্টো সংশোধিত নাগরিক আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে ভারত গণবিক্ষোভের মুখোমুখি হয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের কীভাবে স্বাগত জানানো হয়, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ওপরই দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির সাফল্য ও ব্যর্থতা নির্ভর করে। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসায়িক র্যাঙ্ক বলছে, এই অঞ্চলের কোনো দেশই মান অর্জন করতে পারেনি। ভারত একলাফে ৬৩তম অবস্থানে এলেও, তা উন্নত অর্থনীতির মান থেকে বহু পেছনে। এতে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের অবস্থান নিচের দিকে।
এই অঞ্চলের অর্থনীতির পিছিয়ে থাকার জন্য দুর্নীতিকে অন্যতম নিয়ামক বলা হয়েছে। ঘুষের ঝুঁকি বিষয়ে ট্রেস ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক সূচকে দেখানো হয়েছে, এ অঞ্চলের দেশগুলোর কোম্পানিকে ঘুষ ছাড়াও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। সূচকে একমাত্র নেপাল বিশ্বের শীর্ষ ৫০টি দেশের মধ্যে এসেছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
বিগত বছরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও বিক্ষোভের মুখে ইন্টারনেট বন্ধ করার প্রবণতা এ অঞ্চলে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। ডিসেম্বরে ভারতের মোদি সরকার পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যে ইন্টারনেট বন্ধ ছাড়াও একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার পর গত ৪ আগস্ট থেকে উপত্যকাটি জিজিটাল ব্লাকআউটে। এ অঞ্চলের একমাত্র ভারতই কয়েক বছর ধরে বিশ্বে ইন্টারনেট বন্ধ করা দেশগুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। বাকি কোনো দেশ আসেনি।
আশার দিক হলো, ২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়া থেকে বড়সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। ২০০৯ সাল বিবেচনায় ভারতে এ বৃদ্ধির হার ৯২ দশমিক ৬ শতাংশ। পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের এ বৃদ্ধির হার ২১৫ শতাংশ। এদের অনেকেই শ্রমভিসা ও গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও, তারা ডিগ্রি অর্জন করছেন।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো সোচ্চার হলেও, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বিদ্যুতের জন্য কয়লার মতো পরিবেশ বিধ্বংসী উপাদানে ঝুঁকতে দেখা গেছে। চীন কয়লানির্ভরতা কমালেও, ভারত ও বাংলাদেশ এটির ব্যবহার অব্যাহতভাবে বাড়িয়েছে। অবশ্য আশার দিক হলো, এ অঞ্চলের ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে দ্রুত সৌর, বাতাস ও পরমাণু বিদ্যুৎ ব্যবহারে সন্তুষ্ট থাকছে।
এ অঞ্চলের দেশ আফগানিস্তান নিয়ে সব সময় নেতিবাচক খবর আসে। কিন্তু আশার কথা হলো, ২০১৭ সালে দেশটির মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়ে ৬৪ দশমিক ১ বছর হয়, সেটি তারা ধরে রেখেছে। সঙ্গে ২০০২ সালে যেখানে মেয়েশিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার হার ছিল ৪৪ দশমিক ৫, সেটি বেড়ে ২০১৭ সালে হয় ৮৪ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এ ধারা তারা অব্যাহত রেখেছে।
