চিনির দাম ৪-৬ টাকা বাড়াতে চায় আমদানিকারকরা

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:১৫ এএম

আমদানি করা চিনির দাম বাড়াতে চায় বাংলাদেশ সুগার রিফাইনারস অ্যাসোসিয়েশন। এজন্য গত সোমবার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসতে চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন। সুগার রিফাইনারস অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

এ বিষয়ে দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববাজারে চিনির দাম বেড়েছে। এছাড়া বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রায় এক কোটি টন চিনি কম আছে। আমাদের ধারণা, পেঁয়াজের মতো চিনির সংকট তৈরি হতে পারে। তাই আগে থেকেই মজুদ বাড়াতে চাই। এজন্য হয় আমাদের দাম বাড়াতে হবে, অন্যথায় শুল্ক কমাতে হবে। এজন্য আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসতে চাই। সরকারের সঙ্গে বসেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এমনও হতে পারে– দাম বাড়াতে হবে না, শুল্ক কমে যেতে পারে।

চিনি আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রতি কেজি চিনিতে ৪-৬ টাকা দাম বাড়াতে চায়। অন্যথায় তারা শুল্ক প্রত্যাহার চায়। বর্তমানে বিশ্ববাজারে চিনির দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। আবার গত বাজেটে আমদানিকৃত অপরিশোধিত চিনির ড়্গেত্রে প্রতি টনে দুই হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার টাকা করা হয়। পাশাপাশি সম্পূরক শুল্ক (আরডি) ২০ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে বিশ্ববাজারে চিনির টনপ্রতি ৭ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন আমদানিতে বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে, সেই সঙ্গে অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় চিনির দাম পুনমূল্যায়ন করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসতে চান তারা।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশেস্নষণ সংস্থা বিজনেস ইনসাইডারের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিশ্ববাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত চিনির দাম ছিল ৩০৯ ডলার। এক মাস আগে এর দাম ছিল ২৮৭ ডলার। বিগত দুই সপ্তাহ ধরে পণ্যটির দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। তবে বছরজুড়েই চিনির দাম ওঠানামার মধ্যে থাকলেও এতটা বাড়েনি। বরং বেশিরভাগ সময়েই কমেছে। তবে ইনসাইডারের তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর এই সময়ে চিনির দাম একটু বাড়তি থাকে।

চিঠির বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘আমি আজকে (বৃহস্পতিবার) বাইরে ছিলাম। তবে গত সোমবারের বৈঠকে আমরা এই বিষয়ে আলোচনা করেছি। বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেছি। তখন ট্যারিফ কমিশনকে বলেছিলাম এই বিষয়ে একটি চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন করতে। হয়তো তারা ইতিমধ্যে করেছেও। চিনির দামের বিষয়ে আগামী সপ্তাহেই আমরা আরেকটি বৈঠক করব। তখন সিদ্ধান্ত নেব দাম বাড়নোর প্রয়োজন আছে কি না?’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে দেশে বছরে চিনির চাহিদা ১৬ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ টন চিনি সরকারি মিলগুলো উৎপাদন করে থাকে। তারা দেশীয় আখ থেকে এসব চিনি উৎপাদন করে। চাহিদার বাকিটা অপরিশোধিত আকারে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে থাকে বেসরকারি পাঁচটি চিনি পরিশোধন কারখানা। তবে দেশের চিনি আমদানির সিংহভাগই তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, পরস্পর যোগসাজশে তারা বাজারে কারসাজি করে। যদিও প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বন্দরের হিসাবে, আমদানিকৃত চিনির ৩৫ শতাংশ আনছে মেঘনা গ্রুপ, ৩১ শতাংশ সিটি গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ ও আবদুল মোনেম গ্রুপ আনছে ১০ শতাংশ করে। বিগত কয়েক বছর ধরেই চিনি আমদানির শীর্ষে অবস্থান করছে মেঘনা, সিটি ও এস আলম গ্রুপ।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া না হলেও বাজারে গত এক মাস ধরে চিনির দাম বেড়েই চলছে। সরকারে বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্যমতে, গত এক মাসে চিনির দাম কেজিতে ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি আমদানিকৃত চিনি খুচরায় বিক্রি হয়েছে ৬৫ টাকা পর্যন্ত। গত বছর  এই সময়ে প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগের চেয়ে পাইকাররা কেজিতে দাম বাড়িয়েছে। এ কারণে খুচরায়ও দাম বেড়েছে। অন্যদিকে পাইকাররা বলছেন, বিপণন কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোয় তারা দাম বাড়িয়েছেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা সোহাগ বলেন, আগের চেয়ে তাদের কেজিতে ৩-৪ টাকা বেশি দামে কিনতে হয়। এজন্য তাদেরকেও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, গত বাজেটে চিনির ওপর শুল্কারোপের কারণ ছিল দেশের শিল্পকে উৎসাহিত করা। বর্তমানে দেশের সবগুলো চিনিকল উৎপাদনের রয়েছে। এসব কলের সঙ্গে জড়িত রয়েছে লাখো আখচাষি। তাই চাষিরা যাতে ন্যায্য দাম পায় এবং কলগুলো যাতে লাভজনক অবস্থায় থাকে সেজন্য আমদানির ওপর শুল্কারোপ করা হয়। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলেন, গত কয়েক দিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম কিছুটা বাড়তি থাকলেও বাজেটের পর থেকে বেশিরভাগ সময়ই দাম ছিল নিম্নমুখী।

চিনি বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববাজারে চিনির দাম বৃদ্ধি ও সম্পূরক শুল্কের কারণে তাদের খরচ আরও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্যই তারা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।

চিনির দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বিষয়টি আমি দেখছি না। সবাই মিলে এর দায়িত্ব বাংলাদেশ সুগার রিফাইনারস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফাকে দেওয়া হয়েছে।’

বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারের কাছে বর্তমানে পর্যাপ্ত চিনি মজুদ রয়েছে। অবিক্রীত চিনির পরিমাণও অনেক। তবে আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোয় অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত চিনির চাহিদা বেড়েছে। করপোরেশনের বিপণন বিভাগের প্রধান তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে চিনি মজুদ আছে। সবগুলো চিনিকল এখন উৎপাদনে। সুতরাং দেশের চিনির কোনো ঘাটতি নেই। আমরা দামও বাড়াইনি। আপাতত বাড়ানোর কোনো সম্ভাবনাও নেই।’

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যদি কোম্পানিগুলো চিনির দাম বাড়াতে চায় সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাদের যৌক্তিক ব্যাখ্যা করতে হবে। ট্যারিফ কমিশনকেও ভালো করে এটি যাচাই করে দেখতে হবে। কোনো ভোক্তাই চায় না কোনো পণ্যের দাম বাড়ূক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত