শিক্ষাঙ্গনে গুণ্ডাতন্ত্রের রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:০৩ পিএম

বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কেন গুণ্ডাতন্ত্রের হাতে জিম্মি? কেন শাসকরা শিক্ষার্থীদের কথা বলবার ন্যূনতম স্বাধীনতা দিতে চায় না? গোটা ছাত্রাবাসগুলো কেন এক একটা কারাগারে পরিণত হয়েছে? একটা দেশের শাসক গোষ্ঠী কখন এবং কেন তার গোটা ছাত্র সমাজকে বন্দি করে রাখতে চায়? গণরুম-গেস্টরুম কি শুধুই ‘রাজনৈতিক বড়ভাই’দের স্বেচ্ছাচারিতা? কোন গোপন ভয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তরুণ শিক্ষার্থীটিকে প্রথম দিন থেকে প্রায় সামরিক শৃঙ্খলায় আদব-কায়দা শেখানো হয়? এই বন্দিশালার রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণের উদঘাটনটা খুব জরুরি। 

২. জনপ্রিয় বিশ্বাস এই যে, বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল ছাত্র আন্দোলন। এই ধারণার পেছনে ঐতিহাসিক সত্যতা অনেকখানিই আছে, জাতীয় মুক্তির লড়াইতে সমাজের শিক্ষিত অংশ অগ্রসর ভূমিকা রাখে, পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্ররা তা রেখেছিল। পাকিস্তানি হানাদারদের প্রতিহিংসার অন্যতম একটা লক্ষ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। ছাত্র সমাজের বিরুদ্ধে তাদের রাগ ছিল দুটি, প্রথমত ছাত্ররা জনগণের ক্ষোভকে ভাষা দিয়েছে, বিকল্প একটা স্বপ্ন জাতির সামনে হাজির করেছে; এবং দ্বিতীয়ত, ছাত্রদের মধ্য দিয়েই এই ক্ষোভের প্রথম উদগিরণটি ঘটেছে ’৬৯ এর অভ্যুত্থানে; এরপর ঢলের মতোই শ্রমিক-কৃষক-জনতা রাস্তায় নেমে এসেছিল।  অর্থাৎ, ছাত্ররা মতাদর্শও নির্মাণ করেছে, জানবলও জুগিয়েছে।  ছাত্ররাজনীতি বাংলাদেশকে মুক্ত করেছে শাসকদের প্রবল এই বিশ্বাসটাই বাংলাদেশ পর্বে ছাত্ররাজনীতির দুর্যোগ ডেকে এনেছিল।

ইতিহাসের যে কোনো একটি বৃহৎ পালাবদলের একটা সর্বনাশা বৈশিষ্ট্য হলো, যাদের শক্তির ওপর ভিত্তি করে তা গড়ে ওঠে, তাদের স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে নতুন শাসকরা বহুগুণ বেশি শক্তি নিয়ে সেই মানুষগুলোরই ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, যাদের বাহুবলে তারা মসনদ পেয়েছেন। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই অর্থেই আহমদ ছফা ‘বেহাত বিপ্লব’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন।

ফলে, যে ছাত্র সমাজ পাকিস্তানের বিলয়ের কারণ হয়েছিল বলে বাংলাদেশের শাসকরা নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছেন, সেই শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বাত্মক বন্দোবস্তটা নিশ্চিত না করে তাদের পক্ষে শান্তিতে ঘুমানোই সম্ভব না। ফলে তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সহযোগিতার দ্বারস্থ হয়েছেন। ওদিকে, রাষ্ট্রযন্ত্রও ১৯৭১ এর আগের দশায় নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটা ব্যক্তিত্ব থাকে, তার ক্রমবিকাশ ঘটে। নিপীড়ক একটি দেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্মৃতি সংরক্ষণ ও অভিজ্ঞতা পুঞ্জীভবনের পদ্ধতি বিশেষভাবে মারাত্মক, প্রজন্মান্তরে তা ছড়িয়ে দিয়ে যান আগের প্রজন্মের ঝানু করিৎকর্মারা।  শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের সেই আতঙ্কগ্রস্ত সহস্র চক্ষু কোনোদিনই এক মুহূর্তের জন্য বিশ্রাম নেয়নি।

৩. একটা বিষয় আবারও মনে করিয়ে দেওয়া যাক, বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা মানুষগুলোর সঙ্গে বিপ্লবীদের এই দ্বন্দ্বটা তৈরি হয় তখনই, যখন তাদের আকাক্সক্ষা পূরণে ‘বিপ্লব’ ব্যর্থ হয়। সব বিপ্লবই তার সমর্থকদের কারও না কারও আকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ।  কিন্তু অধিকাংশ মানুষের আশা পূরণে ব্যর্থ হলে বিপর্যয় ঘটে। তখন দেখা যায়, ক্ষমতাটা যারা হাতে পেলেন, তারা যথাসম্ভব পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্র, তার আইনকানুন এবং আমলাতন্ত্রকেই পুনঃস্থাপন করেন নতুন রাষ্ট্রে। এমন একটা পরিস্থিতির কথা তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে শেখ মুজিবুর রহমানই উল্লেখ করেছেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রসঙ্গে। কেন পাকিস্তান ব্যর্থ একটি জাহান্নামে পরিণত হলো, তার কারণ উদঘাটন করতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের যারা ছিল স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীÑ ন্যাশনাল গার্ড, তারা যতদিন কর্র্তৃত্বে ছিল নানান প্রতিষ্ঠানের, ততদিন সেগুলো ঠিকঠাক মতোই চলছিল। কিন্তু মুসলিম লীগ নেতারা যখন দেখলেন, এই স্বেচ্ছাসেবীরাই যদি পুলিশ থেকে শুরু করে রেলওয়ে পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাক মতো চালায়, তাহলে তাদের খায়েশ পূরণ সম্ভব হয় না। ফলে হাজার হাজার সদস্যের এই ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী ভেঙে দেওয়া হলো, তাদের নেতাদের জেলে পোরা হলো এবং অসমাপ্ত আত্মজীবনীর বর্ণনা অনুযায়ীÑ ‘ন্যাশনাল গার্ড ও মুসলিম লীগ কর্মীদের মধ্যে যে প্রেরণা ছিল পাকিস্তানকে গড়বার জন্য তা ব্যবহার করতে নেতারা পারলেন না।’

সহস্রগুণ বেশি রক্তাক্ত সংগ্রামের ফলে জন্ম বলেই পাকিস্তানের সেই ‘ন্যাশনাল গার্ডের’ চাইতেও সংখ্যা ও গুণগত দিক দিয়ে সহস্রগুণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, দেশপ্রেমিক এবং আগুনে পোড়া মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছিল। সে কারণেই, জনতার স্বপ্নভঙ্গ করার অপরাধে অপরাধী পাকিস্তানের চেয়েও বহুগুণ বেশি রক্তপাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে; ক্রুদ্ধ তরুণদের দমনে আরও বহু সহস্রগুণ বেশি শক্তিও ব্যয় করতে হয়েছিল বাংলাদেশের শাসকদের; তৎকালীন জাসদ ছিল সেই বিদ্রোহের নাম।   

৪. বাংলাদেশে প্রথম শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনাটি ঘটে ১৯৭৩ সালের পয়লা জানুয়ারি। ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংহতি জানাতে চাওয়া ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে গুলিবর্ষণে মতিউল-কাদের নিহত হন, গোটা ঢাকা শহর ক্রোধে এবং বিস্ময়ে ভেঙে পড়েছিল সেদিন। কেননা ছাত্রদের মিছিলে গুলি পাকিস্তান আমলে চলত, স্বাধীন বাংলাদেশেও তা অব্যাহত থাকবে, সেটা অবিশ্বাস্য ঠেকেছিল। এরপর ১৯৭৩ সালেই ছাত্র ইউনিয়ন ও মুজিববাদী ছাত্রলীগের যৌথ প্যানেল ডাকসুতে পরাজিত হয় জাসদ ছাত্রলীগের কাছে। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বহু বছর পর প্রকাশ্যে স্বীকার করেন সেই পুরনো অন্যায়টির কথা, জাসদ ছাত্রলীগের বিজয় ঠেকাতে সরকারি গুণ্ডারা ব্যালট বাক্স ছিনতাই করেছিল।  বাংলাদেশে ভোট-ডাকাতির সেই সূচনা।

কিন্তু ছাত্র সমাজ যে প্রত্যাখ্যানের বার্তাটি শাসকদের দিয়েছিল ওই ডাকসু নির্বাচনে, সেটি শাসকরা ভালোভাবেই পাঠ করতে পেরেছিলেন। ফলে এরপর আর ডাকসু আয়োজনের প্রশ্নই আসেনি এই আমলে। বরং শাসক সংগঠনটির একচেটিয়া দুর্বৃত্তপনার চূড়ান্ত পরিণতি পায় মহসিন হলের সাত খুনের ঘটনায়, এছাড়া নৈমিত্তিক চলেছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর নির্যাতন পরিচালনা। এরপর, জিয়াউর রহমানের শুরুতে জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন না থাকায় রীতিমতো গোয়েন্দা বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় তার বন্দোবস্ত করা হলো। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের একটা সহিংস ভারসাম্য দশা এলো, কেননা এরশাদের কোনো জনপ্রিয় সমর্থন ছাত্র সমাজের ভেতর ছিল না। ’৯০-উত্তর নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সময়ে এলো একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ।  যে ধারা পরবর্তী সরকারগুলোর সময়েও অব্যাহত থেকেছে।    

৫. ডাকসু ভিপির ওপর সর্বশেষতম নৃশংস হামলার প্রতিবাদ জানাতে অভিভাবক এবং রাজনৈতিক নেতাদের একটা প্রতিনিধিদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, এবং রাজু ভাস্কর্যে একটি প্রতিবাদ সমাবেশেও তারা বক্তব্য রেখেছেন। সেখানে বক্তারা যেটা বলেছেন, ‘মওলানা ভাসানী একদিন আহ্বান জানিয়েছিলেন, পিণ্ডির জিঞ্জির ভেঙেছি দিল্লির গোলামি করবার জন্য নয়’, এই কথাটা আবারও উচ্চারিত হয়েছে বলেই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই হামলা হয়েছে এই বিশ্লেষণটি তাই খুবই যথাযথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ যদি প্রথম বর্ষ থেকে নিছিদ্র নিয়ন্ত্রণ আর শাসনের মাঝে শিক্ষার্থীদের না রাখা হতো, সুন্দরবন বিনাশী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করাটা সরকারের পক্ষে অসম্ভব হতো, নিশিরাতের নির্বাচন তো কল্পনাতীত। ব্যাংক খাতের অবিশ্বাস্য লুণ্ঠন নিয়ে শিক্ষার্থীরা কি উদ্বিগ্ন না? বেকারত্ব, ভুল শিল্পনীতি, অর্থপাচার নিয়ে শিক্ষার্থীদের কি কোনো ভাবনা নেই? এমনি হাজারো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হতো, তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে হতো।  যেমন জবাব খানিকটা দিতে হচ্ছে আজ ভারত রাষ্ট্রকে।

এর চেয়ে অনেক সহজ গোটা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কারাগার বানিয়ে ফেলা, মুক্তচিন্তাকে নির্বাসনে পাঠানো এবং এমন ব্যক্তিদের উপাচার্য বানানো যারা হবেন খাঁটি মোসাহেব। পুঞ্জীভূত স্মৃতি আকারে রাষ্ট্রযন্ত্র তার ভীতি ও স্মৃতিকে জমা করছে, জাবর কাটছে এবং সেই কারণেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অকল্পনীয় পতন আমরা দেখছি। খুব সংক্ষেপে, খোকা-পাঁচপাত্তুরের এনএসএফীয় দুঃশাসনের বহুগুণ বর্ধিত রূপ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে দেখছি সংগঠিত গুণ্ডাতন্ত্র আকারে, কেননা শিক্ষার্থীদেরই এই শাসকরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, কেননা লুণ্ঠনজীবী শাসকদের প্রজন্মান্তরে সঞ্চিত ভীতি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে  কোনো শোভন, কোনো মানবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আরও বেশি হারে অসমর্থ হচ্ছে। এটা তার শক্তির জায়গা না, বরং দুর্বলতার জায়গা। এটা করতে গিয়ে সে শিক্ষার বারোটা বাজায়, গবেষণার সর্বনাশ করে, তারুণ্যের বিপর্যয় ঘটায়, একদলকে মেরুদণ্ডহীন, আরেক দলকে হিংস্র লাঠিয়াল এবং বিপুল অংশকে অসহায় বানায়। জাতির ভবিষ্যৎ এই তরুণ প্রজন্মকে বিকলাঙ্গ বানানোই গুণ্ডাতন্ত্রের গর্হিততম অপরাধ। 

তারুণ্যকে সর্বক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখার বিপুল অপচয় আর শক্তিক্ষয়টা তাকে করতে হয় নিজেরই প্রবলতম ভীতিটাকে ঢেকেঢুকে রাখবার জন্য; বিশ্ববিদ্যালয়ের কারাগার হয়ে উঠবার এটাই হলো রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট।

লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত